আগামী বছরই প্রকল্পভিত্তিক শিখন

প্রকাশিত: ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ, শনি, ২৯ মে ২১

নিউজ ডেস্ক।।

আগামী বছর মাধ্যমিক স্তরে ‘প্রকল্পভিত্তিক শিখন পদ্ধতি’ প্রবর্তিত হচ্ছে। পরীক্ষার মোট নম্বরের মধ্যে ২০ শতাংশ থাকবে এই মূল্যায়নের জন্য। বাকি ৮০ শতাংশ নম্বরের ওপর আগের মতোই পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে।

এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মূলত প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমের রূপরেখার বাস্তবায়ন পর্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। ঈদের পরে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই পদ্ধতি প্রবর্তন করা হলে ছাত্রছাত্রীরা গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষকের দেওয়া সমস্যা বাস্তবজীবন ও পারিপার্শ্বিকতা থেকে সাক্ষাৎকার ও সরেজমিনর গ্রুপভিত্তিক কাজের মাধ্যমে চিহ্নিত করে এর সমাধান প্রস্তাব তৈরি করবে। এরপর তা শ্রেণিকক্ষে উপস্থাপন করবে। এভাবে তাদের হাতে-কলমে শেখানো হবে।

এনসিটিবি সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মশিউজ্জামান  জানান, পুরোনো শিক্ষাক্রমে ধারাবাহিক মূল্যায়ন (সিএ) নামে ২০ শতাংশ নম্বরের একটি মূল্যায়ন ব্যবস্থা যুক্ত আছে। যদিও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। আগামী বছরও পুরোনো শিক্ষাক্রমে পাঠ্যবই যাচ্ছে। সেই হিসাবে সিএ বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। কিন্তু এর পরিবর্তনে প্রকল্পভিত্তিক শিখন পদ্ধতিটা শুধু যুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া পুরোনো শিক্ষাক্রমের নির্দেশনামতো শিক্ষার্থীর শিখনফল মূল্যায়নে আর সব পদ্ধতি আগের মতোই থাকছে। অর্থাৎ আগের মতোই ক্লাস টেস্ট, অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষা ইত্যাদি থাকছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পুরোনো পাঠ্যক্রমে প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমের রূপরেখায় বর্ণিত মূল্যায়ন ব্যবস্থার একটি অংশ প্রবর্তনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অন্তর্বর্তীকালীন প্যাকেজ’। প্রস্তাবিত রূপরেখায় সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ এবং সর্বনিু ৫০ শতাংশ পর্যন্ত প্রকল্পভিত্তিক শিখন পদ্ধতিতে মূল্যায়নের প্রস্তাব আছে। এছাড়া মাধ্যমিকে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা না রাখাসহ আরও কিছু যুগান্তকারী প্রস্তাব আছে।

জানা গেছে, আগামী বছর যে প্রকল্পভিত্তিক শিখন পদ্ধতি প্রবর্তন হবে সেটির একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, বাংলা, ইংরেজি, গণিত, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ছাত্রছাত্রীরা যেসব বিষয় পড়ে সেগুলো (আন্তঃবিষয়) সমন্বয়ের মাধ্যমে দশটি মূল সূরের (থিমে) ওপর ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রকল্প ঠিক করে দেবেন শিক্ষক। এগুলো হচ্ছে, আমার পরিবার, প্রকৃতি ও পরিবেশ, আমাদের উৎসব, সব কাজই গুরুত্বপূর্ণ, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত স্থানীয় সমস্যার সমাধান, খাদ্য ও পুষ্টি, সম্পদের টেকসই ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আমার এলাকার মুক্তিযুদ্ধ, কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং কোভিড-১৯ : সমস্যা ও সম্ভাবনা।

জানা গেছে, এই পদ্ধতি প্রবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, শিক্ষাক্রমের প্রস্তাবিত রূপরেখার সঙ্গে শিক্ষক এবং যারা এসএসসি ও এইচএসসি দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে তাদের সঙ্গে নতুনটির সাক্ষাৎ বা পরিচয় এবং অভ্যস্ত করা। সফল পরীক্ষামূলক প্রয়োগের জন্য শিক্ষক গাইড করা হবে এবং শিক্ষকদের অনলাইনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

এনসিটিবির এক কর্মকর্তা জানান, শিক্ষক তার শ্রেণিকক্ষের ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে দেবেন। উল্লিখিত বিষয়ের শিক্ষক প্রত্যেক গ্রুপকে কাজ দেবেন। শিক্ষার্থীরা বাস্তবসম্মত, অপেক্ষাকৃত জটিল প্রশ্ন, সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ অনুসন্ধান, সমাধান বা মোকাবিলা করার জন্য নির্ধারিত সময় ধরে হাতে-কলমে কাজ করে এ সংশ্লিষ্ট জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবে। এছাড়া প্রকল্পভিত্তিক শিখনে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সূক্ষ্মচিন্তন, সৃজনশীল, সহযোগিতা ও যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদি দক্ষতা অর্জন করবে।

এ সংক্রান্ত দলিলে মূল্যায়ন সম্পর্কে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পভিত্তিক শিখন কার্যক্রমটির মূল্যায়ন হবে শিখনকালীন। মূল্যায়নের ৫০ শতাংশ করবেন শিক্ষক। বাকিটা করবে প্রকল্প তৈরিকারী শিক্ষার্থীর সহপাঠীরা, যখন উন্মুক্ত উপস্থাপনা করা হবে। অর্থাৎ সহপাঠীরাই ভালো-মন্দ বিচার করবে, যার ভিত্তিতে নম্বর দেওয়া হবে।

এছাড়া কোর্সের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়ন করা হবে রুবিক্স এবং বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে। যেমন- কুইজ, লিখিত অ্যাসাইনমেন্ট, উপস্থাপনা ইত্যাদি। কোর্স সমাপ্তির পর নয়, বরং শিক্ষক এই মূল্যায়ন করবেন কোর্সের সময়জুড়ে বিভিন্ন পর্যায়ে। চার্ট, রেটিং স্কেল ইত্যাদির মাধ্যমে শিখনকালীন মূল্যায়নের ফলাফল প্রকাশ করা হবে। এর ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত প্রোফাইল তৈরি করা হবে।

অধ্যাপক মশিউজ্জামান জানান, এই প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষাকেই ‘অভিজ্ঞতামূলক শিখন’ বলা হয়। বর্তমানে শিক্ষার্থীরা পরস্পরে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে পড়ে। এতে রেষারেষিও তৈরি হয়। আর অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনে যখন গ্রুপ ওয়ার্ক বা প্রকল্প দেওয়া হবে তখন চার-পাঁচজনে একসঙ্গে কাজ করবে। এটা করতে গিয়ে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে পরমতসহিষ্ণুতা, নিজের মতো অপেক্ষাকৃত ভালোটির কাজে বাতিল করার গণতান্ত্রিক চর্চা শেখা, গ্রুপবদ্ধভাবে চলা এ রকম ‘সফট স্কিল’ বা সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ ও গুণাবলিগুলো শিক্ষার্থীর চরিত্রে প্রতিফলিত হবে। এতে একজন শিক্ষার্থী পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার দিকে ধীরে অগ্রসর হবে। প্রকল্পভিত্তিক কাজ মূল্যায়নে বিদ্যালয় পুরোপুরি স্বাধীনতা ভোগ করবে।

নতুন শিক্ষাক্রম ও এর রূপরেখার কাজে জড়িত আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এম তারিক আহসান। জানতে চাইলে তিনি   বলেন, সার্বিক মূল্যায়নের ২০ শতাংশ এই অন্তর্বর্তীকালীন পেডাগজির (শিক্ষাতত্ত্ব) জন্য ধরা হয়েছে। প্রকল্প ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন ভবিষ্যৎ পৃথিবীর পেডাগজি হিসাবে ধরা হয়। মূলত এই পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা আন্তঃবিষয় সমন্বয়ের মাধ্যমে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন অর্জন করবে। এতে একদিকে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য অভিযোজন দক্ষতা অর্জন করতে সহায়তা করবে, বিশেষ করে নতুন শিক্ষাক্রমের প্রস্তুতিতে সাহায্য করবে এবং এই কোভিডকালীন পরিস্থিতিতে শিখন-শিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি করবে।

উল্লেখ্য, সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন শিক্ষাক্রম ২০২৩ সালে বাস্তবায়িত হবে। এর আগে আগামী বছর কিছু স্কুলে এটির আলোকে তৈরি পাঠ্যবই পাইলটিং বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হবে। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী বছর কেবল প্রাথমিকের প্রথম এবং মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমে তৈরি পাঠ্যবই পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে। আর প্রকল্পভিত্তিক শিখন পদ্ধতি প্রবর্তিত হলে মূল্যায়নেরও একটি দিকের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয়ে যাবে।সুত্র যুগান্তর

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.