অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক থেকে হোটেল বয় কি নিদারুন নির্মমতা!

প্রকাশিত: ১:১৭ অপরাহ্ণ, শুক্র, ২০ নভেম্বর ২০

 মো. সাইফুর ইসলাম।।

জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার কানুপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক, তিনি ২০১৮ সালে অবসর নেওয়ার পর এক হোটেলে পরিচারকের কাজ করছেন।

১২ নভেম্বর একটি তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানের জন্য জয়পুরহাট শহরে ওয়েস্টার্ন প্লাজা বিল্ডিং এর দ্বিতীয় তলায় রেড প্লেজ রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখা যায় একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি খুঁড়ে খুঁড়ে টিস্যু পেপার কাস্টমারের হাতে দিতে ও থালা বাসন পরিষ্কার করছেন।

রেস্টুরেন্ট মালিকের অনুমতি নিয়ে উক্ত হোটেলের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে তার পরিচয় দেন তার নাম মোঃ রইছ উদ্দিন।

একসময় সহকারি প্রধান শিক্ষক কানুপুর উচ্চ বিদ্যালয়, উপজেলা আক্কেলপুর জেলা জয়পুরহাট এ কর্মরত ছিলেন। যার ইন্ডেক্স নাম্বার ৫৫৩৩৪৫ তাছাড়াও ২০১৮ সালে এসএসসি ইংরেজি প্রথম পেপার রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের একজন পরীক্ষকও ছিলেন, কোড নাম্বার ৬০২৫।

উক্ত শিক্ষাগুরু মোঃ রইছ উদ্দিন চাকরি চলাকালীন কিছু সম্পদ করেছিলেন , ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস রাস্তা দিয়ে সাইকেল নিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ করে এক বাহনের সাথে সংঘর্ষ বাঁধে তাঁতে তাঁর বাম পা কোমরের নিচে হাড় ভেঙ্গে যায়, তখন তাঁর পায়ের চিকিৎসা করতে গিয়ে তার জমাকৃত সম্পদ ও সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়, এখন তার একটা পা বড়, ও একটা পা ছোট, হাটতে গেলে খুঁড়ে খুঁড়ে হাটে।

২৪ শে মে ২০১৮ সালে অবসর নেওয়ার পর সংসারের চাহিদা যোগাতে না পেরে তিনি ঢাকা গমন করেন প্রতিবন্ধী হওয়ায় কারণে কোনো ধরনের কাজ না পেয়ে তিনি নিজ এলাকাতে ফিরে আসেন। তারপর অনেক জায়গাতে কাজ না পেয়ে অবশেষে রেড প্লেস রেস্টুরেন্টে জয়পুরহাট হোটেলে বয় হিসেবে চাকরি নেন।

কাজের মজুরি হিসেবে তিনি প্রতিদিন ২০০ টাকা মজুরি পান, সেই মজুরি দিয়ে দুই মেয়ে স্ত্রীসহ সংসার চলে, খেয়ে না খেয়ে, তাছাড়াও ভাড়া ঘরে, শুধু তাই নয় তার স্ত্রীও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, তার প্রথম মেয়ের বয়স ৮ বছর এবং দ্বিতীয় মেয়ের বয়স দেড় বছর তার নিজস্ব কোন ধরনের জায়গা বাড়ি নেই, তিনি জয়পুরহাট রেললাইনের পাশে একটি টিন সেটের বাড়িতে ৯০০ টাকা মাসিক ভাড়ায় ভাড়া থাকেন, তার বড় মেয়ের শরীরে একটি ছেঁড়া কামিজ দেখে মনে হচ্ছে কতদিন ধরে কামিজটা পরিষ্কার করা হয়নি এবং ছোট মেয়েটা বড় মেয়ের কোলে।

যখন শিক্ষক কে প্রশ্ন করা হয় যে তার বড় মেয়ের বয়স যখন আট বছর তাহলে কেন আপনি স্কুলে ভর্তি করানো হয়নি , তখন সে বলেন চোখে অশ্রু ভরা জল নিয়ে উদাসিন ভাবে বলে আমি একজন সহকারী প্রধান শিক্ষক হয়েও যখন হোটেলে, হোটেল বয়ের কাজ করতে হচ্ছে, তাহলে আমার মেয়েকে স্কুলে দিয়ে লাভ কি।

বেসরকারি শিক্ষক অবসর ভাতা ও কল্যাণ ভাতার জন্য দুইটা আলাদা আবেদন করছেন, একটি বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে, যার নাম্বার ID-S ৮৮৪৮৮৮৯১২ তারিখ ২৪|০৯|২০ইং আর দ্বিতীয়টি বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাষ্টে s- ৫৯৬৭৭২৬৩০ তারিখ ২৪|০৯|২০ ইং।

একজন শিক্ষক কে অবসর নেওয়ার পর হোটেল বয়ের চাকরি করতে হয় তাহলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশাকে উচ্চশিক্ষিত ব্যাক্তিদ্বয় এই পেষায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এবং শক্তিশালী জাতী তৈরী হবে না ও কোন মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় অনুপ্রাণিত হইবে না।

বেসরকারি স্কুল-কলেজ–মাদ্রাসার যেসব অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর ভাতা ও কল্যাণ সুবিধার টাকা না পেয়ে বছরের পর বছর নিদারুণ সংকটে দিন কাটাচ্ছেন, তাঁদের ব্যথা সরকার আদৌ উপলব্ধি করতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

কেননা, তাঁদের কষ্ট উপলব্ধি করতে পারলে বাস্তবোচিত ও কার্যকর উদ্যোগ নিশ্চয়ই এত দিনে গৃহীত হতো। যে মানুষগুলো সারা জীবন মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে সেবা দিয়ে গেছেন, তাঁদেরই এখন জীবনের এই পর্যায়ে এসে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এটি জাতির জন্য লজ্জার।

জয়পুরহাট জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মুঠোফোনে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন আমি যাচাই করে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নিব।

বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী অবসর ভাতা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট বোর্ডের সদস্য, সচিব শরীফ আহমেদ সাদী মহোদয়ের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ও আশ্বাস দেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উক্ত শিক্ষকের ভাতার ব্যবস্থা করা হইবে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.