অন্ধত্বকে জয় করে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন হিরা

অন্ধত্বকে জয় করে বগুড়ায় প্রথম এক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মিফতাহুল জান্নাত হিরা সরকারি চাকরিতে যোগদান করেছেন। হিরা বিহার কলেজপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন।

মিফতাহুল জান্নাত হিরা বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়া এলাকার আব্দুস ছাত্তারের মেয়ে। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার ও রাজনীতি বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যায়নরত।

তিনিই প্রথম কোনো প্রতিবন্ধী নারী যিনি বগুড়ায় স্বাধীনতার পর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেন।

মঙ্গলবার (২৪ জানুয়ারি) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে মিফতাহুল জান্নাত হিরা চাকরিতে যোগদান করেলেন।

শিক্ষায় সফলতার কারণে ২০২১ সালে তিনি জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা পদকেও ভূষিত হয়েছেন।
এদিকে চাকরিতে যোগ দিতে গেলে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আজমল হোসেনসহ অন্যান্য শিক্ষকরা মিফতাহুল জান্নাত হিরাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন এবং তাকে শুভেচ্ছা উপহার দেন।

জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত হিরা ২০১৮ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরকার ও রাজনীতি বিষয়ে অনার্স পাস করেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে অনার্স পাস করায় ২০২১ সালে জাতীয়ভাবে জয়ীতা নির্বাচিত হলে প্রধানমন্ত্রী তাকে পুরস্কৃত করেন।

শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার পশ্চিম পাড়ার আব্দুস সাত্তার ও নূর জাহান বেগম দম্পতির চার ছেলে ও পাঁচ মেয়ের মধ্যে সবার ছোট হিরা। তার বড় আরও দুই বোন লাভলী খাতুন ও রেশমা খাতুন জন্মের পর থেকেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। চোখে না দেখলেও কারো ওপর নির্ভরশীল হননি তারা। লাভলী খাতুন স্নাতক পাস করে একটি প্রকাশনী সংস্থায় ব্রেইল পদ্ধতির বই লিখে দেন।

মিফতাহুল জান্নাত হিরা জানান, ২০১২ সালে গাজীপুরের সালনা নাছির উদ্দিন মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন।

২০১৪ সালে বগুড়া সরকারি মজিবুর রহমান মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন জিপিএ ৫ পেয়ে। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার ও রাজনীতি বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন। অনার্স পাস করার পর একই বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করছেন হিরা।

২০২০ সালে তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরির আবেদন করেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে বিশেষ ব্যবস্থায় (শ্রুতি লেখক নিয়ে) লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর মৌখিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত নিয়োগ পেয়ে চাকরিতে যোগদান করেন।

তিনি জানান, মাধ্যমিক পর্যন্ত তার লেখাপড়ায় এবিসি নামে একটি বেসরকারি সংস্থা সহায়তা করলেও উচ্চ শিক্ষায় তারা এগিয়ে আসেনি। পারিবারিক উদ্যোগেই তিনি এইচএসসি ও অনার্স পাস করে এখন মাস্টার্সে অধ্যায়নরত।

চাকরি পাওয়ার পর মিফতাহুল জান্নাত হিরা বলেন, শুধুমাত্র সহায়তার অভাবে অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের যদি যথাযথ সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া যায় তাহলে অনেকেই স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী হতে পারে।

চাকরি পাওয়ার আনন্দে হিরা বলেন, ‌দৃষ্টিহীন মানুষ বলে যদি কোনো অবহেলার শিকার না হই, তাহলে শিক্ষকতা করা সম্ভব।

তিনি চাকরিক্ষেত্রে সবার সহযোগী মনোভাব কামনা করেন।

বগুড়ার সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাভেদ আক্তার বলেন, বগুড়া জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে মিফতাহুল জান্নাত হিরাই একমাত্র দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষক। তিনি মঙ্গলবার (২৪ জানুয়ারি) সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করেছেন।

বগুড়া জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এস এম কাওসার রহমান বলেন, বগুড়ায় সরকারি কোনো অফিসে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কর্মকর্তা-কর্মচারী এতদিন কেউ ছিলেন না। হিরা নামে ওই নারীই প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছেন।