অধিকার ও সত্যের পক্ষে

শিক্ষকদের শেখাবেন কে?

 নিজস্ব প্রতিবেদক ॥

শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, শিক্ষকদেরও মানসিক কাউন্সিলিং প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন উচ্চ আদালত। ভিকারুনিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার পরের দিন গত ৪ ডিসেম্বর আদালত এ কথা বলেন। কেন এসব আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে, তা এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন আকারে দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।

অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনার পর অনেকেই ওই স্কুলের শিক্ষকদের দায়ী করছেন। গত ৪ ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রী ভিকারুননিসা স্কুলে গেলে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা স্কুল ও প্রিন্সিপাল সম্পর্কে নানা অভিযোগের কথা তুলে ধরেন। এতে বোঝা যায়, ওই স্কুল সম্পর্কে তাদের কতটা ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু সুযোগ না পাওয়ায় তারা কাউকে কিছু বলতে পারেন না।

অরিত্রীর আত্মহত্যার জন্য যে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা দায়ী, দেশের পুরো শিক্ষাকাঠামো ও চাকরিব্যবস্থা দায়ী-তা আমরা বলতে চাচ্ছি না। কেননা সেটা বললে, পুরো শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে কথা উঠতে পারে। আবার পুরোনো দিনের সেই শিক্ষা আন্দোলনের মতো নতুন কোনো বিপ্লব ঘটার প্রয়োজন অনুভূত হতে পারে। সেই প্রয়োজন যে অনেক আগেই তৈরি হয়েছে, সেটা হয়তো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বা বেসরকারিভাবে শিক্ষার মান নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা অনুধাবন করেছেন। কিন্তু দেশের পুরো ব্যবস্থার কারণে তারা হয়তো কিছু করতে পারছেন না।

স্কুলের একজন শিক্ষক তার ছাত্রীর সঙ্গে অপমানসুলভ কথা বলেছেন, তার বাবা-মাকে অপমান করেছেন, আর সেই অপমান সইতে না পেরে অরিত্রী গলায় ফাঁস দিয়েছে। সেই সঙ্গে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আঙ্গুল দিয়ে সে দেখিয়ে দিয়েছে, এই শিক্ষাব্যস্থায় গলায় ফাঁস ছাড়া আর কিছুই সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের যে ‘সম্মানবোধ’ রয়েছে, তাদের যে নিজস্ব অহংবোধ আছে-এটা অনেক শিক্ষক বুঝতে চান না। কিন্তু শিক্ষকদের যে সেটা বোঝা দরকার, তাই দেখিয়ে দিল ছোট্ট মেয়ে অরিত্রী।

শুধু ভিকারুননিসা স্কুলেই এই অবস্থা নয়

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিভাগের বেশিরভাগ শিক্ষকদের সম্পর্কে কয়েক দিনে যা ধারণা পেয়েছিলাম, সেটা পুরো ক্যাম্পাস জীবনে পরিবর্তন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সম্পর্কে যে উচ্চ ধারণা নিয়ে গিয়েছিলাম, তা পরিবর্তন হয়েছে। অবশ্য ওই বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে এমন কিছু শিক্ষকের সঙ্গে পরিচয় করিয়েয়েছ, যাদেরকে বাবা-মায়ের চেয়ে বেশি সম্মান করতে ইচ্ছা করে কখনো কখনো। তবে পরিচয় হওয়া বেশিরভাগ শিক্ষক সম্পর্কে আমার বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলে বোঝা যাবে।

১.

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে প্রথম বর্ষে আমাদের ইংরেজি বিষয়ে পড়তে হতো। ওই বিষয়টি নিতেন দুজন শিক্ষক। ম্যাডাম আমাদের মোটা একটা ইংরেজি বই প্রতি ক্লাসে আনতে বাধ্য করতেন। কেউ সেই বই ভুলবশত রুমে রেখে আসলে ওই শিক্ষার্থীকে ক্লাস থেকে বের করে দিতেন ম্যাম। পরে এমন হলো, যদি কেউ ভুলবশত ওই বই নিয়ে ক্যাম্পাসে না আসত তাহলে আত্মসম্মানের কারণে ম্যামের ক্লাসে যেতই না। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, মোটা ওই ইংরেজি বইটা বহন করে নিয়ে আসলেও ম্যাম সেটি ক্লাসে খুলতে দিতেন না। শুধু ম্যাম সেই বই খুলে দেখে দেখে পড়াতেন। বই খুলে যদি কেউ সেই পড়া দেখার চেষ্টা করতেন, তাহলে তাকেও ক্লাস থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

২.

প্রথম বর্ষে বিভাগে এমন আরেকজন শিক্ষক ছিলেন। যিনি এখন কোনো প্রকার পিএইচডি ছাড়াই অধ্যাপক হয়েছেন। নিজের পিএইচডি না থাকলেও তিনি এখন অন্যদের পিএইচডি সুপারভাইজার হয়েছেন। ওই শিক্ষকও ক্লাসে বই নিয়ে আসা বাধ্যতামূলত রেখেছিলেন মাস্টার্স পর্যন্ত। শিক্ষার্থীরা বই নিয়ে না এলে স্যার ক্লাসে সবার সামনে, খারাপ ভাষায় কথা বলতেন, সহপাঠীদের বাবা-মা নিয়ে বাজে কথা বলতেন। ভাগ্যিস, অরিত্রীকে ওই ক্লাসে যেতে হয়নি, গেলে সে যে কী করত, তা সে-ই ভালো জানত। প্রিন্সিপাল নিজের কক্ষে তাকে ও তার বাবা-মাকে অপমান করেছিল, সেই অপমানের কারণেই সে আত্মহত্যা করেছে বলে এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। আর দর্শন বিভাগের ক্লাসে সবার সামনে যদি শিক্ষার্থীদের অপমান করা অরিত্রী দেখত, তাহলে বোধহয় সে আর ওই ক্লাসে পড়তেই যেত না। কিন্তু আমরা তারপরও সাড়ে পাঁচ বছর ওই ক্লাসে পড়েছি। কিন্তু শিক্ষকদের মতের বিপক্ষে কোনো কথা বলতে পারিনি। যারা বলার চেষ্টা করেছে, তাদেরকে ক্লাসের সহপাঠী বা শিক্ষকরা দমিয়ে দিয়েছিল।

৩.

প্রথমবর্ষের পরীক্ষা শেষে দায়িত্বরত শিক্ষক জানালেন, সাক্ষাৎকারের সময় অবশ্যই প্রতিটি কোর্সের বই সঙ্গে নিয়ে আসতে হবে। না হলে তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে না। কিন্তু আমাদের অনেক সহপাঠী টাকার জন্য হোক না অন্য যেকোনো কারণেই হোক সব বই কিনতে পারেনি। অন্যদের বই থেকে প্রয়োজনীয় অংশ ফটোকপি করে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিতেন। সেই গরীর শিক্ষার্থীদেরও সাক্ষাৎকারের আগে নতুন বই কিনতে হয়েছিল। অনেকেই সেটা করেছিলেন, শুধু শিক্ষকদের নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তের কারণে।

প্রথমবর্ষের সম্ভবত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন অধ্যাপক এসেছিলেন আমাদের সাক্ষাৎকার নিতে। তিনি এভাবে সব শিক্ষার্থীদের হাতে বিপুল পরিমাণ বই দেখে যারপরনাই আশ্চার্য হয়েছিলেন। যদিও তিনি শিক্ষার্থীদের এই বিষয়ে কিছুই বলেননি। পরবর্তীতে শিক্ষকদের থেকেই শুনেছি, চট্টগ্রামের ওই শিক্ষক নাকি সাক্ষাৎকারে বই নিয়ে শিক্ষার্থীদের আসাটাকে খারাপভাবে নিয়েছিলেন। তারপরও দ্বিতীয়বর্ষে একইভাবে বই নিয়ে সাক্ষাৎকারে আমাদের যেতে হয়েছিল। পরের বছর বাইরের অনেক শিক্ষকদের চাপে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কারণে সেটা বন্ধ করেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষকরা।

৪.

দর্শনের জন্ম হয়েছে ‘প্রশ্ন থেকে’, শিক্ষকদের অনেকেই ক্লাসে এ কথা বলতেন। অনেক শিক্ষক অবশ্য ক্লাসে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করলে খুব খুশি হতেন। আবার হাতে চিরকুট নিয়ে আসা কিছু শিক্ষকের ক্লাসে প্রশ্ন করলেই তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠতেন। ক্লাসে প্রশ্ন করার কারণে অনেক শিক্ষার্থী চূড়ান্ত পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়েছিলেন বলে ক্লাসে অনেকেই বলাবলি করেছে।

একদিন মাস্টার্সের ক্লাসে আমি একটি প্রশ্ন করার জন্য দাঁড়াই। স্যারের অনুমতি নিয়ে প্রশ্নটি করি। প্রশ্নটি ছিল এমন, ‘নোট বই আর মূল বইয়ের মধ্যে ধারণাগত কোনো পার্থক্য আছে কি না?’ আমি ওই দিন ক্লাসের শেষের দিকে বসেছিলাম। স্যার প্রশ্নটি শুনে আমায় দ্বিতীয় ব্রেঞ্চে নিয়ে আসলেন। আবার তিনি সেই প্রশ্নটি শুনলেন আমার থেকে। শোনার পর কোনো উত্তর না দিয়ে রেগে গিয়ে  বললেন, এই ধরনের প্রশ্ন করে আমি নাকি তাকে ক্লাসে অপমান করেছি। তাই তিনি ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলেন। পরে জেনেছি, তিনি নাকি নোটবই থেকে চিরকুট লিখে এনে ক্লাসে পড়াচ্ছিলেন। আমি ওই প্রশ্ন করায় তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি যে নোটবই পড়ে ক্লাসে আসেন, আমি সেটা হয়তো বুঝে গেছি। আবার অন্য কোনো কারণেও তিনি রেগে যেতে পারেন।

ওই শিক্ষক ক্লাস থেকে বের হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সব শিক্ষকের কানে বিষয়টি চলে যায় যে, আমি শিক্ষককে ক্লাসে অপমান করেছি। আসলে যে কে-কাকে অপমান করেছে, সেই বোধ হয়তো ওই শিক্ষকের ছিল না। কিন্তু আমি ঠিকই বুঝেছিলাম। পরের দিন এক শিক্ষক আমাদের ক্লাসে গিয়ে বললেন, ‘শোন, বিভাগে যতদিন আছ ততদিন শিক্ষকরা যদি গরুকে ছাগল বলেন-তাহলে তোমরা তাই মেনে নিও। কারণ তোমাদের সার্টিফিকেট নিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে!’

ক্লাসে আমার ওই প্রশ্ন নিয়ে পরবর্তীতে বিভাগীয় সভাপতির কক্ষে বৈঠক বসে। আমার সব সহপাঠীদের ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে। আমাকেও ফোন করে সেই বৈঠকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন বিভাগীয় সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক আক্তার আলী স্যার। বিভাগের কোনো শিক্ষার্থীর মুখে আক্তার স্যার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য শুনিনি। স্যার সবার প্রিয়, আমারও।

বৈঠকে ওই স্যার আমাকে বললেন, ‘তোমার যদি ভালো না লাগে, তাহলে তুমি অন্য জায়গায় গিয়ে মাস্টার্স শেষ করো।’ আমি উত্তরে বললাম, ‘ঠিক আছে স্যার, ক্লাসে আমার প্রশ্ন করা ভুল হয়েছে, আর প্রশ্ন করব না।’

অরিত্রী বেঁচে গেছে

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য বিভাগ সম্পর্কেও এমন নানা অভিযোগের কথা শুনেছি। আবার অনেক ভালো শিক্ষকের কথাও শুনেছি। কিন্তু শিক্ষকদের একটি বড় অংশ যে নিজেদের জ্ঞান ও আচরণবোধ সম্পর্কে ধারণা রাখেন না সেটা হয়তো তারা জানেন না। তাই হয়তো আদালত সেই প্রয়োজন অনুভব করেছেন যে, শিক্ষকদেরও মানসিক কাউন্সিলিং দরকার। কিন্তু সেটা করাবেন কে? স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেশির ভাগ তো এখন সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাই তাদের বিরুদ্ধে কথা বলাটা মোটেও সহজ কিছু নয়। কেননা, শিক্ষা নিয়ে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠালেও তাকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

অরিত্রী হয়তো মরে বেঁচে গেছে। বড় হলে তাকে আবার হয়তো বাবা-মায়ের অপমান দেখতে হতো। কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সামনে নিজেকে অপমান হতে হতো। কিন্তু সে সেটা চায়নি। তর্কের জন্য অনেকেই বলতে পারেন, অরিত্রী ফোনে নকল করছিল, কিন্তু সেই নকলের শাস্তি হিসেবে তাকে ও তার বাবা-মার সঙ্গে শিক্ষকরা যে আচরণ করেছেন-তা কি মোটেও শোভনীয় ছিল?

আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়

গত কয়েক মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত নয়জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তারা যে কারণেই এই পথ বেছে নিক না কেন, এটা মোটেও সঠিক কোনো সমাধান নয়। সমাজের এই ‘দুষ্টুচক্র’ ভেঙে পৃথিবীকে ‘শৃঙ্খলমুক্ত’ করাই প্রকৃত মানুষের কাজ। সেই কাজ করতে হবে তরুণদেরকেই। তাদের ভাবতে হবে, জীবনে সবার থেকে শিক্ষা নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তা বিশ্ববিদ্যালয় বা স্কুলের শিক্ষক হোক না কেন। শিক্ষার দ্বার এখন খুলে গেছে। অনলাইনে শিক্ষার অবারিত ধারা সূচিত হয়েছে। সেই ধারায় নিজেকে অবগান করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। নিজের জ্ঞানের দরজা উন্মুক্ত করে সামনে আগাতে হবে। তাহলেই হয়তো একদিন এই বাংলাদেশ সোনার দেশে পরিণত হবে। যে দেশ মুক্তিকামী মানুষরা চেয়েছিল, আমরা সেই দেশ পাব। সেই সোনালী দিনের অপেক্ষায় আরও পথ পাড়ি দিতে হবে আমাদের।

একই ধরনের আরও সংবাদ