অধিকার ও সত্যের পক্ষে

দেশে বিজ্ঞান-শিক্ষার্থী কমিতেছে !!

 আমিনুল ইসলাম ||

‘সমৃদ্ধ অতীত সত্ত্বেও গুপ্তযুগের পর ভারতীয় উপমহাদেশে বিজ্ঞানচর্চার আর প্রসার ঘটেনি।’ বাঙালির বিজ্ঞানসাধনা সম্পর্কে এ কথা লিখেছেন অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা। তিনি আরও লিখেছেন, ‘শিল্পবিপ্লবোত্তর ইউরোপে যখন বিজ্ঞান বিকশিত, আমাদের দেশে তখন মধ্যযুগের অন্ধকার। ইউরোপে অন্ধকার যুগ অর্ধ-সহস্র বৎসর স্থায়ী হলেও আমাদের দেশে তার পরমায়ু ছিল প্রায় দ্বিগুণ।’ এ
দেশে আধুনিক বিজ্ঞানের চর্চা শুরু ব্রিটিশ শাসনকালে, উনিশ শতকে। সমুদ্রপার থেকে তা আমদানি করে যে জোড়কলম বাঁধা হয়েছিল,
তা যে আজও ঠিকমতো জোড়া লাগেনি তা বোঝা যায় বাংলাদেশে তরুণ শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানশিক্ষায় অনীহা দেখে।

একটি দেশ বা জাতির উন্নতির সহিত বিজ্ঞান-শিক্ষার বিষয়টি জড়িত অঙ্গাঙ্গীভাবে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে টিকিয়া থাকিতে হইলে বিজ্ঞান-শিক্ষার বিকল্প নাই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হইল, দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিতেছে ক্রমশ। শিক্ষা পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ১৯৯০ সালে মাধ্যমিকে মোট এসএসসি পরীক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞানের পরীক্ষার্থী ছিল ৪২.৮১ শতাংশ। এই সংখ্যা ২০১৮ সালে নামিয়া আসিয়াছে ২৯.০৩ শতাংশের একটু বেশী। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা চলিয়া যাইতেছে ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিকে।

ইহা ঠিক যে, বিজ্ঞান পঠন-পাঠন অপেক্ষাকৃত কঠিন। একজন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষাবাবদ খরচও কিছুটা বেশি। এই ব্যাপারে একটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, অভিভাবকদের আর্থিক সক্ষমতা কিংবা শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমবিমুখ মনমানসিকতার কারণে কমিয়া যাইতেছে বিজ্ঞান-শিক্ষার্থী। তবে এইক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলা যাইতে পারে যে, আমাদের তো অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছে, তাহা হইলে তিন যুগ পূর্বে কী করিয়া এখনকার তুলনায় বিজ্ঞান-শিক্ষার্থীর হার অধিক ছিল? বিজ্ঞান-শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহের ক্ষেত্রে বাণিজ্য বিভাগের বিভিন্ন বিষয়ের বাজারমূল্যই অধিক দায়ী বলিয়া অনুমিত হয়। চাকুরির বাজার কিংবা পেশাগত জীবনে যেই সকল বিষয় লইয়া অধ্যয়ন করিলে অধিক সুযোগ পাওয়া যাইবে, অধিকাংশ শিক্ষার্থী সেই দিকেই ছুটিবে বটে। মেডিক্যাল, প্রকৌশলজাতীয় কয়েকটি ব্যবহারিক বিজ্ঞান বিষয় ব্যতীত তাত্ত্বিক বিজ্ঞান লইয়া পড়ালেখা করিলে দেশের প্রচলিত চাকুরির বাজারে খুব বেশি সুবিধা পাওয়া যায় না। তাই কেবল বিজ্ঞানের প্রতি অধিক নিষ্ঠাবান শিক্ষার্থী ব্যতীত বিজ্ঞান বিষয় লইয়া পারতপক্ষে কেহ পড়ালেখা করিতে চাহে না। আরেকটি সমস্যা হইল, শিক্ষালয়সমূহে বিজ্ঞান শিক্ষার অবকাঠামোর অভাব। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো ‘ব্যানবেইস’ জানাইয়াছে, দেশের শতকরা ৩৭ ভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার নাই। অথচ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় সকল স্কুলেই বিজ্ঞান বিভাগ চালু রহিয়াছে। শহরের স্কুলসমূহে কাজ চালাইয়া লইবার মতো ল্যাবরেটরি থাকিলেও গ্রামাঞ্চলে বিজ্ঞান শিক্ষা পরিস্থিতি মোটেও সন্তোষজনক নহে। অবশ্য মাধ্যমিক স্কুলের তুলনায় কলেজসমূহের পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। তবে যেইসকল স্কুল ও কলেজে বিজ্ঞানাগার আছে, সেইখানেও ইহার সদ্ব্যবহার হইতেছে কিনা—সেই প্রশ্নও উত্থাপন করা যাইতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানাগার থাকিলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণের অভাব দেখা যায়। এমনকী অভাব রহিয়াছে ছেলেমেয়েদের হাতে-কলমে শিখাইবার মতো দক্ষ শিক্ষকেরও। সুতরাং সব মিলাইয়া বিজ্ঞান শিক্ষা পিছাইয়া পড়িতেছে ক্রমশ।

শিক্ষানীতিতে বিজ্ঞানশিক্ষার অগ্রগতির জন্য প্রাথমিকে চারটি, মাধ্যমিকে চারটি, উচ্চশিক্ষায় ছয়টি কৌশল গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হইয়াছিল। কিন্তু এখন অবধি তাহার বাস্তবায়ন হয় নাই। সত্যিকার অর্থে, বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্ব ব্যতিরেকে জাতি হিসাবে আমরা বিজ্ঞানমনস্ক হইয়া উঠিতে পারিব না। পৃথিবীর প্রায় সকল উন্নত দেশের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখিতে পাইব—তাহারা বিজ্ঞানশিক্ষায় সবচাইতে বেশি অগ্রগামী। সুতরাং এই দেশকে আগাইয়া লইতে হইলে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানশিক্ষার প্রতি আগ্রহী করিয়া তুলিতে হইবে।

লেখক || আমিনুল ইসলাম,শিক্ষক ও সাংবাাদিক ||

একই ধরনের আরও সংবাদ