অধিকার ও সত্যের পক্ষে

জাতীয় রাজনীতির চরিত্রের অংশীদার শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি

 আবুল কাসেম ফজলুল হক ॥

কিছুদিন আগে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী একটি প্রশ্ন নিয়ে আমার কাছে আসে। প্রশ্নটি হল “বাংলাদেশের গত তিন দশকের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সদর্থক দিকগুলো বর্ণনা কর।” তারা জানায়, তাদের একজন শিক্ষক মিডটার্ম পরীক্ষার জন্য প্রশ্নটি তাদের দিয়েছেন। তারা বলল, সদর্থক দিক (positive side) বলতে কী বোঝায়, তা তিনি তাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সদর্থক দিকের কথা তিনি বলে দেননি। ছাত্র-ছাত্রীদের তিনি দায়িত্ব দিয়েছেন, আন্দোলনের ঘটনাবলি পর্যালোচনা করে সদর্থক দিকগুলো খুঁজে বের করতে। তারা আমাকে বলল, অনেক খোঁজ করেও, অনেকের সাথে কথা বলেও, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কোনো সদর্থক দিক তারা বের করতে পারেননি।

তাদের একজন সরাসরি আমাকে বলল, স্যার রাজনীতি বিষয়ে আপনি লেখেন, কথা বলেন। আপনার লেখা আমরা পড়ি। সেজন্য আপনার কাছে এসেছি । আমি বললাম, আমি লিখি বটে তবে প্রচলিত রাজনীতিতে আমার আস্থা নেই। আব্রাহাম লিঙ্কনের উক্তি উদ্ধৃত করলাম- Government of the people, by the people, for the people|। আমি বললাম, আমি নতুন রাজনীতি চাই, জনগণের রাজনীতি। নতুন গণতন্ত্র চাই। নয়াগণতন্ত্র। এ গণতন্ত্র তো শতকরা পঁচানব্বই ভাগকে বাদ দিয়ে শতকরা পাঁচ ভাগের। পাঁচ ভাগের বেলায়ও এটা গণতন্ত্র নয়। এটা ওটা জিজ্ঞেস করে বুঝতে পরলাম জানবার কৌতূহল তাদের আছে- যা এই বয়সের ধর্ম। তাদের প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করলাম এবং বিব্রত বোধ করলাম। তাদের মতো আমিও বাংলাদেশের গত তিন দশকের কথিত রাজনৈতিক আন্দোলনে- সেই ১৯৮০র দশকের সরকার উৎখাতের ও ক্ষমতা দখলের আন্দোলন, মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন, সংসদ নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন অরাজনৈতিক নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন- ইত্যাদিতে জনগণের জন্য গণতন্ত্রের কোন সদর্থক দিক খুঁজে পাই না। যে প্রচেষ্টা দরকার তা থেকে এসব আন্দোলনকে অনেক দূরবর্তী বলে মনে হয়। এইসব আন্দোলনের সঙ্গে আমি একাত্মতাও অনুভব করিনি। নিজেকে আমি এসব থেকে সরিয়ে রেখেছি। এসব আন্দোলন কি জনপ্রিয় আন্দোলন। জনপ্রিয় আন্দোলন থেকে বিবেকের তাড়নায় যিনি নিজেকে সরিয়ে রাখেন তাঁর জীবন তো ট্রাজেডি।

আমার মনে প্রশ্ন জাগল, দেশের ধনিক শ্রেণীর কিংবা শাসক শ্রেণীর লোকদের জন্যও কি এই আন্দোলনে গণতন্ত্রের সদর্থক দিক কিংবা সম্ভাবনাময় কোনো মহান বৈশিষ্ট্য আছে? মনে হল, কথিত এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কোনো রকম গণতন্ত্রের লক্ষণ নেই। সেই ১৯৮০র দশকের লাগাতার আন্দোলনের সময় থেকেই আমার ক্রমাগত মনে হয়েছে, আন্দোলন কোনো রকম গণতন্ত্রের ধারাতেই চলছে না। সেই ৮০র দশক থেকে অনুভব করে আসছি আন্দোলন চলছে নিশ্চিত পরাধীনতার ধারায়। বাংলাদেশের পরাধীনতা। একদিনের জন্যও আমার মনে এই আন্দোলনের প্রতি আস্থা জাগেনি। মনে হয়েছে আমার যে, নেতৃত্বে বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার গণতন্ত্র-বিরোধী। রাজতন্ত্র, জমিদারতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, আত্মীয়তন্ত্র ইত্যাদির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই গণতন্ত্রের আদর্শ বিকশিত হয়েছে এবং গণতন্ত্রের সাধনা এবং সংগ্রাম চলেছে। অথচ বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নামে এর প্রায় সবই কায়েম আছে এবং জোরদার হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সর্বত্রই এখন নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার। বাস্তবে, কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় যে, জনমতও এর অনুকূলে। জনগণ এই ব্যবস্থার পক্ষেই ভোট দেয়। টক শোতে বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া, সিভিল সোসাইটি সমূহের বুদ্ধিজীবীরা এই ব্যবস্থাকেই অচলতা কাটিয়ে সচল করার জন্য গলদঘর্ম হয়ে উপদেশ খয়রাত করছেন। কয়লা যত করেই ধোয়া হোক না কেন, কালো যায় না। টক শোতে রাজনীতিবিদদের যতই হেদায়েত করা হোক, তাদের প্রতি যতই উপদেশ খয়রাত করা হোক, তাদের স্বভাব বদলায় না। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের মন, বুদ্ধিজীবীদের মন, জনগণের মন কি গণতান্ত্রিক? চলমান ধারার রাজনীতি দিয়ে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রীপরিষদ, প্রশাসনব্যবস্থা বিচারব্যবস্থা এবং শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত হবে? কৃষি ও কৃষক, শিল্প ও শ্রমিক, পেশাজীবী মধ্যবিত্ত ও জাতীয় পুঁজি, জাতীয় চরিত্র ও জাতীয় সংস্কৃতি কি উন্নত হচ্ছে? আমার মনে কোনো আস্থা তৈরি হয় না যে, চলমান ধারার রাজনীতি দিয়ে কোনোদিন কোনোটার উন্নতি হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেটুকু উন্নতি হচ্ছে সে তো শ্রমিক-কৃষকদের কাজ, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা কী? তাতে ধনী ও গরীবের বৈষম্য, শ্রমজীবী ও বুদ্ধিজীবীর বৈষম্য, ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীনের বৈষম্য কমছে না, দ্রুত গতিতে বাড়ছে। শাসক শ্রেণীর লোকদের মতই সাধারণ মানুষও ন্যায়-অন্যায়বোধ হারাচ্ছে। দাসত্বমূলক মনোভাব ব্যাপ্তি ও গভীরতা লাভ করছে। গণতন্ত্রে যা হওয়া উচিত, তার বিপরীতটা হচ্ছে। সব কিছু দুর্বিত্তায়িত হয়ে চলছে। জুলুম-জবরদস্তি, শোষণ-পীড়ন-প্রতারণা, আত্মহত্যা, হত্যা-গুম, সাম্রাজ্যবাদী দূতাবাসের দালালি, ক্ষমতাশীলদের সংযমহীন প্রবৃত্তিবশকতা আর সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান অসহায়ত্ব- এসবই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির মূল পরিচায়ক। এ অবস্থায় কী করে এই আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বলি। সরকারি দল বিরোধী দল কোনটা আগে গণতন্ত্রের পথে? বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য অ আ ক খ থেকে আরম্ভ করতে হবে। গণতন্ত্র একটি বিকাশমান আদর্শ। তার রূপ ও প্রকারভেদ আছে। আমরা যে গণতন্ত্র চাই তা জনগণের গণতন্ত্র বা নয়া গণতন্ত্র। তার মর্ম হবে জনগণের সম্প্রীতিময় পারস্পরিক সহাবস্থান ও সম্পর্কায়ন। এবং তার জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতি দরকার।

আমি ওই ছাত্র-ছাত্রীদের বললাম, এই তো গত তিন দশকের গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পর্কে আমার ধারণা। আমার ধারণাকে কি তোমরা ভুল বলবে? কী বলতে পারি, তোমাদের প্রশ্নের উত্তরের জন্য? তারা সমস্বরে বলল, সবইতো স্যার আপনি কেবল নেতিবাচক দিক নিয়ে বললেন। ইতিবাচক দিকের একটি কথাও তো বললেন না! আমি বললাম, ইতিবাচক কিছু ঘটলে তো বলতাম। যা বললাম তা কি তোমরা ভুল মনে কর? ইতিবাচক দিক তোমরা কীভাবে দাড় করাবে? আমি নৈরাশ্যবাদী নই। আমি কেবল প্রচলিত চিন্তাধারা ও কর্মধারার প্রতিই অনাস্থা প্রকাশ করছি। কিন্তু বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, তাও অনুভব করি। বাংলাদেশে আবার নতুন রেনেসাঁস দেখা দেবে। নতুন গণজাগরণ দেখা দেবে। মানুষ পরিবর্তন চাইবে। ছাত্র-তরুণেরা সবচেয়ে বেশি করে চাইবে। যুগ যুগ ধরে তরুণরা নতুন পৃথিবীর স্রষ্টা। আমাদের দেশে বৃটিশ শাসনবিরোধী আন্দোলন, জমিদারতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের আন্দোলন, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদিতে ছাত্র-তরুণেরাই বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। তখন আন্দোলনগুলোর লক্ষ্য ছিল মহান, অথচ এখন আন্দোলনের মাঝে মহান কোনো লক্ষ্য খুঁজে পাই না।

গণতন্ত্রকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। জনগণের গণতন্ত্রকে সুনির্দিষ্ট করতে হবে। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বায়নের নামে যে কর্মকাণ্ড বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, জি এইট, ন্যাটো বাহিনী, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা বাহিনী চালাচ্ছে তাতে আমি গণতন্ত্র কিংবা গণতন্ত্রের সম্ভাবনা খুঁজে পাই না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ যেভাবে যে গণতন্ত্র কায়েম করছে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়ায় তাতে গণতন্ত্র কোথায়? আরব বসন্তের নামে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা কী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে? মিয়ানমারে তারা কী রকম গণতন্ত্র কায়েম করতে চাচ্ছে? বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সাম্রাজ্যবাদী দূতাবাসমুখী যে উদ্যোগ-আয়োজন, তা দিয়ে তো গণতন্ত্র হবে না।

আমি কথা আর না বাড়িয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের বললাম, তোমরা অনাচ্ছন্ন সত্যসন্ধানী মন নিয়ে জানতে চেষ্টা কর, তারপর সিদ্ধান্ত নাও। আমি বললাম, আমার কাছে পর্যন্ত যখন তোমরা এসেছ, তখন সাহস করে বলতে চাই, আমার “বিশ্বাস ও সভ্যতার ভবিষ্যত” এবং “গণতন্ত্র ও নয়াগণতন্ত্র” এই দুইটি বই তোমরা পড়। “আটাশ দফা: আমাদের মুক্তি ও উন্নতির কর্মসূচি” পুস্তিকাটি তোমরা পড়। আমার কথায় তারা আগ্রহ দেখাল। তখন আমি এ কথা থেকে সরে গিয়ে বললাম, তোমাদের প্রশ্নের উত্তরে গণতন্ত্রের সদর্থক দিক খুঁজতে গিয়ে তোমরা আমাদের দেশের সেই পাল আমল, সেন আমল, পাঠান সুলতানদের আমল, মোগল আমল, ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান আমলের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসন পদ্ধতির সঙ্গে গত তিন দশকের অবস্থার তুলনা কর এবং যেসব উন্নতি ও সম্ভাবনা তোমরা খুঁজে পাও সেগুলো উলে­খ কর। সামরিক শাসন এবং সিভিল সোসাইটির শাসন (জরুরি অবস্থা ২০০৭-২০০৮) ইত্যাদির সঙ্গে গত তিন দশকের কথিত গণতান্ত্রিক শাসনের তুলনা কর এবং সম্ভাবনা খোঁজ কর। কোনো কথায় আটকে না থেকে সত্যানুসন্ধান করো, নিজের চোখ, নাক ও কানের উপর নির্ভর কর। রাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র ও ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে তুলনা করে বাংলাদেশের প্রচলিত ব্যবস্থার এবং গণতন্ত্রের নামে কথিত আন্দোলনসমূহের চরিত্র বিচার কর। জেনে-বুঝে সিদ্ধান্ত নাও।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি, গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও গণতন্ত্রের সম্ভাবনা সম্পর্কে দেড় ঘণ্টা ধরে আমি যে আলোচনা সেদিন করেছিলাম তা এই রকম। আমার ধারণা আমি লিখে প্রকাশ করার চেষ্টা করি। প্রতিকূল পরিবেশে পেরে উঠি না। আমার চিন্তার অনুকূলের কোনো শক্তি কি সমাজে আছে?

বাংলাদেশে শিক্ষক রাজনীতি জমে উঠেছে। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তান আমলে, ব্রিটিশ আমলে শিক্ষক রাজনীতি বলে এ ধরনের কিছু ছিল না। তবে কোনো কোনো শিক্ষক সেকালে গৌরবজনক রাজনৈতিক ভ‚মিকা পালন করেছেন। সেকালে কখনো কখনো সম্মিলিতভাবেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গৌরবোজ্জ্বল রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গৌরবজনক কী ভূমিকা পালন করেছেন তা এখন খুঁজে দেখতে হবে। খোঁজ-খবর না করে তা হঠাৎ তা বলা সম্ভব নয়।

এখন এতটুকু বলতে পারি যে, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষকদের রাজনীতি বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোর অনুসারী হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, বিভিন্ন বামপন্থী গ্রুপ ইত্যাদির শাখা হিসেবে বাইরের রাজনীতির মতোই সক্রিয় আছে শিক্ষকদের বিভিন্ন গ্রুপ। প্রচলিত অভ্যাস, জনপ্রিয় হুজুগ, বিচার বিবেচনাহীন আবেগ, নগ্ন স্বার্থসন্ধান ইত্যাদি শিক্ষক রাজনীতিতে পুরো মাত্রায় আছে। বিভ্রান্ত, বিকারগ্রস্ত জাতীয় রাজনীতির তুলনায় শিক্ষক রাজনীতিতে কোনো উৎকৃষ্টতা কি খুঁজে পাওয়া যায়? ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে স্বায়ত্তশাসনের সম্ভবপর সর্বাধিক ব্যবস্থা আছে বলে মনে করি। তবে বাস্তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার যে অবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনেরও সেই অবস্থা। সেই ১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যেসব সরকার বাংলাদেশ শাসন করেছে তাদের কোনোটিই কার্যত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসিত রাখেনি। প্রতিটি সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষোভ এবং ভয়ের জাল বিস্তার করা হয়েছে। কিছু শিক্ষককে বাইরে বড় রাজনৈতিক পদে নিয়ে গিয়ে তাদের দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষাকে সার্টিফিকেট সর্বস্ব ব্যাপার করে ফেলা হয়েছে। জ্ঞান, চরিত্রবল ও সৃষ্টিশীলতার কোনো মূল্য দেয়া হয় না এই ব্যবস্থায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষার আদর্শ ও ছাত্র-শিক্ষকদের জ্ঞানানুশীলন বিনষ্ট হয়েছে। কোনো কোনো বিদেশী শক্তির কালো হাতও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিস্তৃত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন আত্মপরিচয় ও জাতীয় মানের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে, সাধনা ও আত্মশক্তির কথা ভুলে গিয়ে কেবল বিশ্বমান অর্জনে তৎপর আছে। সবকিছু বিকারগ্রস্ত রয়েছে, স্বাভাবিক অবস্থায় সবকিছুকেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সরকার, ডানপন্থী-বামপন্থী রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি ও এনজিও ইত্যাদির দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে বহুমুখী চাপের মাঝে রয়েছে তাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাভাবিক থাকে কী করে? প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে বলব, সেগুলোর কোনোটাই বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠেনি। অদূর ভবিষ্যতে হবে কি?

ছাত্র রাজনীতিতেও স্বাভাবিকতা নেই। আমার ধারণা হয়েছিল যে, পাকিস্তান আমলে ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন (এনএসএফ) বহু নিন্দিত যেসব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে তার উত্তরাধিকার বহন করার মতো কোনো ছাত্রসংগঠন আর কোনদিন হবে না। কিন্তু চরম দুঃখের সঙ্গে অচিরেই দেখলাম, কোনো কোনো ছাত্রসংগঠনের মাধ্যমে তার চেয়েও খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে লাগল। এক একটি ছাত্রসংগঠন সরাসরি পরিচালিত হয় এক একটি রাজনৈতিক দল দ্বারা। জাতীয় রাজনীতির যে চরিত্র, ছাত্র রাজনীতি তারই অংশীদার। শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও মোটামুটি একই কথা প্রযোজ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ন্ত্রিত হয় সরকার দ্বারা যেমন, তেমনি সব বিরোধীদল, সিভিল সোসাইটি ও প্রচারমাধ্যম দ্বারাও। তারা কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভালো করতে চায়। অবস্থা এমন খারাপ হলো কেন? জাতীয় রাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতি, ছাত্র রাজনীতি সবই পতনশীল, চরম অবক্ষয়ে ক্লিষ্ট, পড়তির ধারায়।

খারাপ অবস্থার কথা স্বীকার করে নিয়ে, সম্ভাবনা বিচার করে অবস্থার উন্নতি করতে হবে। একদিকে আমাদের রাষ্ট্রকে জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। অন্যদিকে জনগণতান্ত্রিক কর্মসূচি দিতে হলে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য, জাতীয়তাবোধ ও জাতীয় সংস্কৃতি উন্নত করার কর্মসূচি। বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদের গ্রাস থেকে মুক্ত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বায়ন নয়, আমরা চাই জনগণের আন্তর্জাতিক বিশ্বরাষ্ট্র। জাতি থাকবে, জাতিরাষ্ট্র থাকবে, রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি থাকবে; এগুলো হবে বিশ্বরাষ্ট্রের সাংগঠনিক উপাদান। জাতিরাষ্ট্রসমূহকে নিয়ে বিশ্বরাষ্ট্র হবে এক কনফেডারেশন। জাতিসংঘের বিশ্বরাষ্ট্রে রূপ নেয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু তা হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন সংঘে।

রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতি, ছাত্র রাজনীতি আবর্তিত হতে হবে। শিক্ষা ও গবেষণাকে প্রধান্য দিয়ে শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি হওয়ার কথা। সেটিই হতে হবে। তাহলেই রাজনীতি নতুন অর্থ লাভ করবে। শিক্ষাকে পরীক্ষামুখী না করে জ্ঞানমুখী করতে হবে।

লেখক: অনারারি অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

একই ধরনের আরও সংবাদ