অধিকার ও সত্যের পক্ষে

ভূমিকম্পের ইংরেজি ভুলে গিয়েছিলাম

 সাবিনা ইয়াসমিন ||

চাকরির জন্য সাক্ষাৎকার। অম্ল-মধুর এক অভিজ্ঞতা। রায়হান রহমানকে ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হওয়ার গল্প শুনিয়েছেন সিনিয়র সহকারী সচিব সাবিনা ইয়াসমিন

তিন গোয়েন্দা সিরিজের ভক্ত ছিলাম। ভাবতাম সুযোগ পেলে গোয়েন্দা হব। অনার্সে পড়া অবস্থায়ই জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দার (এনএসআই) ফিল্ড অফিসার পদের জন্য ভাইভা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। এনএসআইতে ভাইভা! প্রচণ্ড নার্ভাস ছিলাম। ভাইভা বোর্ডে প্রবেশ করে দেখি, পরিবেশ খুবই গুরুগম্ভীর। এতে ভীতি আরো বেড়ে যায়। প্রথমে আমার নাম, জেলা—এসব কমন প্রশ্ন করায় ধীরে ধীরে সব কিছু সহজ হতে থাকল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী হওয়ায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়েও কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন ম্যাক্স ওয়েবারের থিওরি সম্পর্কে। উত্তরে বলেছিলাম, ম্যাক্স ওয়েবারের থিওরি মতে, ‘রাষ্ট্র হচ্ছে এমন একটি সংগঠন, যার নির্দিষ্ট একটি ভূখণ্ড থাকবে এবং এই ভূখণ্ডের মধ্যে নাগরিক, সশস্ত্র বাহিনী, সমাজ, আমলা, আদালত ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকবে। এসবের ওপরে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকবে রাষ্ট্রের।’ পরে তাঁরা আমাকে দেশের অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ বিষয়, মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। আমি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক দিয়েছিলাম। এখানে আমার চাকরি হয়েছিল। জয়েনও করেছিলাম।

যদিও চাকরির জন্য প্রথম ভাইভা দিয়েছিলাম বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কমিশন্ড অফিসার পদে। সবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি, তখনই এই সুযোগটি আসে। ভাইভা বোর্ডে প্রবেশ করে দেখি মাত্র একজন প্রশ্নকর্তা। প্রথম ভাইভা বলে এমনিতেই ছিলাম নার্ভাস, তার ওপর ইংরেজিতে ভাইভা! বিমানবাহিনীতে কেন এসেছি? প্রথমেই এমন প্রশ্ন শুনে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘বাবা বলেছে, তাই।’ উত্তর শুনে তিনি হাসতে হাসতে শেষ! কিছুক্ষণ পরে তিনি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমি কী হতে চাও?’ তখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলাম, ‘ম্যাজিস্ট্রেট হতে চাই।’ পরে ভূমিকম্প সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। ভূমিকম্প শব্দের ইংরেজি ভুলে গিয়েছিলাম। শেষে তিনি আমাকে বললেন, বিমানবাহিনীতে এখন যোগ দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা ছাড়তে হবে। আমি উত্তর দিয়েছিলাম, ‘স্যার, আমি তা পারব না।’ বিমানবাহিনীতে চাকরি করা হয়ে ওঠেনি।

ভাইভা দেওয়ার তৃতীয় অভিজ্ঞতা হয়েছিল জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে। মাত্র দুটি প্রশ্ন করেছিল ভাইভা বোর্ডে। কেন চাকরি করতে এসেছি এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার জেলা কোন সেক্টরের অধীনে ছিল? এর পরই জানতে চেয়েছিলেন আমি কোথায় যোগদান করতে ইচ্ছুক। সোজাসাপটা উত্তর দিয়েছিলাম, ‘ঢাকার মধ্যে হলে সুবিধা হয়।’ এটি শুনে প্রশ্নকর্তা বলেছিলেন, এই মুহূর্তে ঢাকায় পোস্টিং দেওয়া সম্ভব নয়। ধরে নিয়েছিলাম, চাকরিটি হবে না। মজার বিষয় হলো, আমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাঠিয়েছিল। যদিও যোগদান করিনি।

সর্বশেষ ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হয়েছিলাম ৩০তম বিসিএসে। প্রায় ৩০ মিনিট রাখা হয়েছিল। সব প্রশ্ন ইংরেজিতে করা হয়েছিল। আমিও ইংরেজিতে উত্তর দিয়েছিলাম। প্রথমেই জানতে চেয়েছিলেন, অ্যাডমিন ক্যাডার কেন প্রথম পছন্দ? উত্তরে বলেছিলাম, ‘সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে থেকে তাদের জন্য কাজ করার ইচ্ছা আছে। আর আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি, তখন একজন ম্যাজিস্ট্রেট এসেছিলেন পরিদর্শনে। মূলত তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হই। তাই বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার আমার প্রথম পছন্দ।’ জানতে চেয়েছিলেন ফিল্ডে কাজ করতে সমস্যা হবে কি না? পরিবার সমর্থন দেবে কি না? বলেছিলাম, ‘পরিবারের সমর্থন আছে বলেই এখানে আসতে পেরেছি। ফিল্ডের কাজেও আমার কোনো আপত্তি নেই।’  এরপর মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমসাময়িক বিষয়াবলি ও বাংলা সাহিত্য থেকে প্রশ্ন করেছিলেন। শেষে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। যেমন—বাংলাদেশ কবে এর সদস্য হয়? এর ভবিষ্যৎ কী? ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের যুদ্ধে ওআইসির ভূমিকা যথাযথ ছিল কি না? তখন এই বিষয়গুলো খুব আলোচিত ছিল।  ঠিকঠাক উত্তর দিয়েছিলাম। চূড়ান্ত ফলাফলে অ্যাডমিন ক্যাডার পেয়ে দারুণ খুশি হয়েছিলাম।

নতুনদের উদ্দেশে বলব, আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে। জীবনের লক্ষ্য স্থির করে সেভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। ভাইভা বোর্ডে নিজেকে ইতিবাচকভাবে মেলে ধরতে হবে। তবেই আসবে সফলতা।

একই ধরনের আরও সংবাদ