অধিকার ও সত্যের পক্ষে

গুড বাই গুড অ্যাডমিনিস্ট্রেটর

 মুসতাক আহমদ॥

অধ্যাপক মাহাবুবুর রহমান। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক। আপাদমস্তক একজন শিক্ষক। আপনাকে সংগ্রামী সালাম ও অভিবাদন। আপাদমস্তক শিক্ষক হলেও আপনাকে মেনশন করতে চাই একজন অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে।

এটা এ জন্য নয় যে, আপনি অামৃত্যু শিক্ষা বিভাগের সর্বোচ্চ পদ অলঙ্কৃত করেছেন। এটা এজন্য যে, ৩১বছর কর্মকালের মধ্যে আপনি শিক্ষক হিসেবেই কাটিয়েছেন সাড়ে আটাশ বছর। মাত্র আড়াই বছর শিক্ষা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন একবছর ৮ মাস। বাকিটা সময় মহাপরিচালক। কিন্তু আপনি গুড অ্যাডমিনিস্ট্রেটর।

মাত্র আড়াই বছরে আপনি প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন যে, শিক্ষক হিসেবে নয়, আপনার মুখ্য পরিচয় শিক্ষা প্রশাসক। আড়াই বছরের কীর্তি কিছুতেই অনুজ্জ্বল নয় সাড়ে আটাশ বছরে গড়ে আসা র্কীতির কাছে।

১২ কুতুবের ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে দায়িত্বপালন, বৈধভাবে অবৈধ লুটপাট বন্ধ, সেবাপ্রার্থীর সেবা নিশ্চিত, কুতুবদের ক্ষমতার অবৈধ অপব্যবহার বন্ধ, তাদের পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরার সাহস আপনার আগে কোনো চেয়ারম্যান করেছেন বলে আমাদের জানা নেই।

বরং গা ভাসিয়ে টেন্যুর পার করার মানসিকতা দেখেছি। আর আপনি কেবল দুঃসাহসই (!) দেখাননি, সফলও হয়েছেন। আপনার সৃষ্টিশীল, কৌশলী, সাবধানী, দেশপ্রেমমূলক, নির্লোভ ও সৎ পদক্ষেপ সফল করেছে আপনাকে।

যে কারণে মাহাবুবুর রহমান মানেই ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে শির-উঁচু করা এক ব্যক্তিত্বের নাম।

আপনার সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব আবিষ্ট করেছিল চারপাশকে। এতে উদ্দীপ্ত হয়ে নিমগ্ন হয়েছি আমরা অনেকে; কেবল অসৎ পথে অর্থ উপার্জনে লিপ্ত কিছু ব্যক্তি ছাড়া; যাদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আপনি। যদিও ওইসব দুর্জনের অপপ্রচার আর ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছিল আপনাকে।

মাহাবুবুর রহমান মানেই, সাংবাদিকদের কাছে, নিউজের শুদ্ধ উৎস। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর হতে আপনাকে কেউ দ্বিধান্বিত হতে দেখেনি। দৃষ্টান্ত স্থাপনে দুষ্টকে শায়েস্তা করার ক্ষেত্রে আপনার জুড়ি ছিল না। জনসম্পদ লুণ্ঠনকারীর মুখোশ উন্মোচনে আপনার সাহস আমাদেরকে উৎসাহিত করে।

আপনি প্রায়ই ম্যাকিয়াভ্যালিকে কোট করে বলতেন, মানুষ তার পিতৃহন্তারককে ক্ষমা করে, কিন্তু সম্পদ লুণ্ঠনকারীকে নয়। ঘুষসহ অবৈধ অর্থ উপার্জনকারীরা ওই অর্থকে নিজের মনে করে। পাপাচারে লিপ্তরা আপনাকে ছাড়বে না- সেই আশঙ্কার কথা সবসময় বলতেন আপনি। তবু দায়িত্ববোধ আপনাকে নিবৃত্ত করতে পারেনি।

কৌশলকে হাতিয়ার করে সমান গতিতে এগিয়ে গেছেন আপনি।

তাইতো, দেশপ্রেম সামনে রেখে কোনো বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার আগে উর্ধ্বতনের মানসিকতা টেস্ট করার লক্ষ্যে তা সংবাদপত্রে আগে প্রকাশের যে কৌশল আপনার ছিল, সেটা এক অনন্য পন্থা।

ব্যক্তি মাহাবুবুর রহমান বিনয়েরও এক আধার। উঁচু পদে থেকেও নিজের অবস্থান বজায় রেখে কী করে অধঃস্তনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হয়, সে কৌশল কেবল আপনার কাছ থেকেই ভালভাবে জানা সম্ভব।

সদা তারুণ্যই ছিলো আপনার ধ্যান। তাইতো বয়সের ব্যবধানও ভুলে যেতে হতো আপনার সান্নিধ্যে। সর্বসাধারণের মনের আবেগটাও যেন আপনার ভাল জানা ছিল। তাইতো ঘুষ দেয়ার পরও বছরের পর বছর ধরে সেবা না পাওয়া ব্যক্তির পাওনা কী করে কয়েক মিনিটে চুকিয়ে দেয়া যায়, সেটা জানতে আপনার বিকল্প আছে কী?

শুধু কাজে নয়, ব্যক্তিজীবনে আপনি অপত্যস্নেহ আর ভালোবাসায় সিক্ত করে গেছেন স্বজন, অনুরাগী ও গুণমুগ্ধদেরও।

দীর্ঘ কর্মজীবনের মাত্র ৩ শতাংশ সময় জাতীয় পর্যায়ে ব্যয় করেছেন। তথাপি আপনি কর্মগুণে যেভাবে সকলের মনজয় করেছেন, পরিণত হয়েছেন জাতীয় ও বরণীয় ব্যক্তিত্বে- সেটা বিরল।

লোভ সংবরণ, পরিশ্রমের দৃষ্টান্ত আর মোহিত আচরণে জনসেবার যে আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে গেছেন, তা আপনার অবর্তমানে প্রজ্বলিত রাখা যে কতটা দুঃসাধ্য তা কেবল আপনরার উত্তরসুরীই জানবে, আর টের পাবে মহাপরিচালকের আশপাশের জনেরা।

তবু জীবনে বাস্তবায়ন করে আপনি প্রশাসনিকভাবে শিক্ষক সেবা ও বিভাগের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার যে চ্যালেঞ্জ রেখে গেছেন, তা উচ্চকিত রাখার দায়িত্ব অবলীলায় বর্তে উত্তরসুরীর উপর।

আপনার অনুপস্থিতি বড় বেশি বিষাদের। মানুষ বাঁচে কর্মে, বয়সে নয়। কাজই মানুষকে দেয় অমরত্ব। অমরত্বের সাধনা আপনি করেননি। কিন্তু কর্মই আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে। নিজের শ্রম ও কর্মের ফসলে সীমার মাঝে অসীম হয়ে বেঁচে থাকুন প্রিয় মাহাবুব স্যার। আগামী দিনগুলোয় আরও বেশি অনুভূত হবে আপনার শূন্যতা।

গুড বাই গুড অ্যাডমিনিস্ট্রেটর।

পরিশেষে রবী ঠাকুরের ভাষায়-
সব চেয়ে সত্য মোর সেই মৃত্যুঞ্জয় –
সে আমার প্রেম।
তারে আমি রাখিয়া এলাম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশ্যে।
পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
কালের যাত্রায়।
হে বন্ধু বিদায়।

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক যুগান্তর এবং সাবেক সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি

একই ধরনের আরও সংবাদ