অধিকার ও সত্যের পক্ষে

সুরা আল-ইমরান : নাজিলের কারণ পরিচয় ও ফজিলত

 ধর্ম ডেস্ক ||

সুরা আল-ইমরান (سُوْرةُ الَ عِمْرَان)। কুরআনুল কারিমের তৃতীয় ফজিলতপূর্ণ সুরা। কুরআনুল কারিমের ধারাবাহিক অনুবাদ ও ফজিলত প্রকাশে সুরা ফাতেহা ও সুরা বাকারা ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন সুরা আল-ইমরানের অনুবাদ ও আয়াত নাজিলের ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনাসহ ফজিলত উপস্থাপনার পালা।

সুরা আল-ইমরানের অনুবাদ ও ঘটনার বর্ণনার শুরুতেই সুরার পরিচিতি ও ফজিলত সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-

সুরার তথ্য
সুরা আল-ইমরান সর্বসম্মতভাবে মাদানি সুরা। সুরার আয়াত সংখ্যা ২০০। রুকু সংখ্যা ২০।

নামকরণ

ইমরান হলেন হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের নানা এবং হজরত মারইয়াম আলাইহিস সালামের পিতা। এ সুরার ৩৩ ও ৩৪নং আয়াতে তাঁর (ইমরানের) পরিবারের কথা ও বর্ণনা রয়েছে। একেই আলামত হিসেবে এ সুরার নাম আল-ইমরান হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এ সুরার আরেক নাম আজ-জাহ্রাহ্ বা আলোকচ্ছটা।’ (মুসলিম)

এছাড়াও এ সুরার অনেক সুরা তাইবাহ, আল-কানুয, আল-আমান, আল-মুজাদালাহ, আল-ইসতেগফার, আল-মানিয়াহ ইত্যাদি নাম দেয়া হয়েছে। এ সুরার অনেক নাম দেয়া হলেও সুরাটি ‘আল-ইমরান’ নামেই গ্রহণযোগ্য ও পরিচিত।

সুরাটি নাজিলের কারণ

> হজরত ইবনু আবি হাতেম রাবি বর্ণনা করেন, হিজরি নবম বর্ষে নাজরানের এক খ্রিস্টান প্রতিনিধি দল মদিনায় প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে আগমন করে হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তাদের জিজ্ঞাসার জবাবে এ সুরার প্রথম থেকে ৮৩ আয়াত পর্যন্ত নাজিল হয়।

> হজরত ইবনে ইসহাকের বর্ণনা করেন, আমাকে মোহাম্মদ ইবনে যাহাল ইবনে আবি উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন য, নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধি দল প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে হজরত ঈসা আলাইহি সালাম সম্পর্কে জানতে চায়, তখন তাদের সম্পর্কে এ সুরার প্রথম ৮০টি আয়াত নাজিল হয়।

> আল্লামা বগবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি হজরত রবি ইবনে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর এক কথার উদ্ধৃতি দিয়ে দীর্ঘ এক ঘটনা বর্ণনা করেন। আর তাহলো-
প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে আসা খ্রিস্টান প্রতিনিধি দলের সংখ্যা ছিল ৬০। এদের মধ্যে ১৪জন ছিল উপনেতা আর ৩জন ছিল নেতা। আর দলীয় প্রধানের নাম ছিল আহকেব, তার প্রকৃত নাম ছিল আবদুল মাসিহ। তার পরামর্শ ব্যতিত কেউ কোনো কাজ করতো না। তারা অত্যন্ত মূল্যবান এবং সুন্দর পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে উটের ওপর আরোহন করে মদিনায় এসেছিল।

যখন তারা মসজিদে নববিতে আগমন করে তখন সময়টি ছিল আসরের নামাজের আর প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন নামাজ পড়ছিলেন।

তাদের নামাজের সময় হওয়ায় প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে অনুমতি পেয়ে তারা কেবলার বিপরীত দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করে।

প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানালে তারা বলে, আমরা আপনার আগমনের আগেই ইসলাম কবুল করেছি।

প্রিয়নবি তাদের কথা জবাবে বললেন, তোমরা অসত্য কথা বলছ। তোমাদেরকে যে বিষয়টি ইসলাম থেকে বিরত রাখছে, তাহলো- তোমরা হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহর পুত্র বলে দাবি করে থাক। তোমরা ক্রসেডের পূজা কর এবং শুকরের গোশত খাওয়াকে হালাল বলে মনে কর।

তখন খ্রিস্টান প্রতিনিধি দল বলল, যদি আল্লাহ পাক ঈসা আলাইহিস সালামের পিতা না হন তবে তাঁর পিতা কে?

প্রিয়নবি ইরশাদ করেন, তোমরা কি জান না যে, আমাদের প্রতিপালক চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই।। আর ঈসা আলাইহিস সালাম মৃত্যুমুখে পতিত হবেন।

খ্রিস্টান প্রতিনিধরা বলল, এ কথা সত্য।

তখন প্রিয়নবি বললেন, তোমরা কি জান না, আমাদের প্রতিপালক সব কিছুর নিয়ন্ত্রণকর্তা, সবার নেগাহবান এবং রিজিকদাতা।

খ্রিস্টান প্রতিনিধরা বলল, হ্যাঁ, এ কথা সত্য।

তখন প্রিয়নবি জিজ্ঞাসা করলেন, এ সব কাজের কোনোটি কি ঈসা আলাইহিস সালামের নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে কি?

খ্রিস্টান প্রতিনিধরা বলল, না।

তখন প্রিয়নবি ইরশাদ করলেন, তোমরা কি জান না যে, আল্লাহর কাছে আসমান ও জমিনের কোনো কিছু গোপন নেই।

খ্রিস্টান প্রতিনিধরা বলল, জানবো না কেন? (জানি)

তখন প্রিয়নবি বললেন, তাহলে তোমরা বল ঈসা আলাইহিস সালামকে যে খাস ইলম আল্লাহ দান করেছেন তা ছাড়া এসব বিষয় তিনি কিছু কি জানতেন।

খ্রিস্টান প্রতিনিধরা বলল, না।

তখনি প্রিয়নবি বর্ণনা করলেন, আমাদের প্রতিপালক তাঁর ইচ্ছা মোতাবেক ঈসা আলাইহিস সালামকে মাতৃগর্ভে আকৃতি দান করেছেন। আমাদের প্রতিপালক পানাহার করেন না।

তখনও খ্রিস্টান প্রতিনিধরা প্রিয়নবির সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

প্রিয়নবি ইরশাদ করলেন, ‘তোমরা কি একথা উপলব্ধি কর না যে ঈসা আলাইহিস সালামকে তাঁর মা এভাবেই গর্ভে ধারণ করেছেন, যেভাবে মায়েরা ধারণ করেন।

আর এভাবেই ঈসা আলাইহিস সালাম ভূমিষ্ঠ হয়েছেন যেভাবে সাধারণত শিশু ভূমিষ্ঠ হয়। ঈসা আলাইহিস সালামে সেভাবেই আহার প্রদান করা হয়েছে যেভাবে অন্য শিশুদেরকে আহার প্রদান করা হয়। আর ঈসা আলাইহিস সালাম খাবার খেতেন, প্রশ্রাব-পায়খানা করতেন।

খ্রিস্টান প্রতিনিধরা তখন বলল, ‘হ্যাঁ’, এসব কথা আমরাও জানি।

তখন প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিনিধি দলকে প্রশ্ন করে স্বীকৃতি চাইলেন, তোমরাই বল তোমাদের দাবি মোতাবেক ঈসা আলাইহিস সালাম কি আল্লাহর পুত্র হতে পারেন?

প্রিয়নবির এ জিজ্ঞাসায় খ্রিস্টান প্রতিনিধরা নিরব হয়ে যায়। আর তখনই আল্লাহ তাআলা এ সুরার প্রথম ৮০ আয়াত নাজিল করেন।’ (তাফসির মাজহারি, খোলাসাতুত তাফসির, তাফসিরে কাবির)

সুরার ফজিলত
– হজরত কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, সুরা বাকারা এবং সুরা আল-ইমরান উভয়ে নিজ নিজ পাঠকদের সম্পর্কে বলবে, হে প্রতিপালক! এ ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’ (দুররে মানসুর)

– রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কেয়ামতের দিন কুরআন ও যারা কুরআন অনুযায়ী আমল করতো তাদেরকে নিয়ে আসা হবে। (এর মধ্যে) সুরা বাকারা ও সুরা আল-ইমরান (তেলাওয়াতকারীরা) আগে আগে চলবে। মেঘের ছায়া বা পাখির মতো। এরা জোরালোভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে সুপারিশ করবে।’ (মুসলিম)

– প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি সুরা বাকারা এবং সুরা আল ইমরান জুমআর রাতে তথা বৃহস্পতিবার দিবাত রাতে পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে সাত আসমান ও সাত জমিন পর্যন্ত সাওয়াব দান করবেন।’ (খোলাসাতুত তাফসির)

– রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ, তা পাঠকারীর জন্য কেয়ামতের দিন সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দু’টি আলোকচ্ছটাময় ‘সুরা বাকারা ও সুরা আল-ইমরান পড়; কেননা এ দুটি সুরা কেয়ামতের দিন এমনভাবে আসবে যেন দুটি মেঘখণ্ড অথবা দুটি ছায়া অথবা দু’বাক পাখির মতো। তারা এসে এ দু’সুরা পাঠকারীদের পক্ষ নেবে।’ (মুসলিম)

– অন্য হাদিসে এসেছে, ‘কেয়ামতের দিন কুরআন আসবে যারা কুরআনের ওপর আমল করেছে তাদের পক্ষ হয়ে। তখন সুরা বাকারা ও সুরা আল-ইমরান থাকবে সবার আগে।’ (মুসলিম)

সর্বোপরি সুরা বাকারাতেও সুরা আল-ইমরানের ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে।

যে কথায় শুরু হয়েছে সুরা আল ইমরান

এ সুরাটিও মুকাত্তায়াত হরফ আলিফ, লাম, মীম দ্বারা শুরু হয়েছে। অতঃপর মহান আল্লাহর ওয়াহদানিয়াত ও একক ক্ষমতার বিষয়ে ঘোষণা এসেছে। আল্লাহ বলেন-
‘আল্লাহ ব্যতিত কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সব সময় বিরাজমান।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১-২)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সুরা আল-ইমরানের মর্মার্থ ও সংক্ষিপ্ত ঘটনা জেনে সে অনুযায়ী আমল ও ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। কুরআন অনুযায়ী জীবন-যাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

একই ধরনের আরও সংবাদ