অধিকার ও সত্যের পক্ষে

‘নির্বাচনের আগে এবং পরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে’

 মিথুন মন্ডল॥

জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ভোট একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা চায় ভোটাধিকারের মাধ্যমে একটি ভালো দল নিয়ে সরকার গঠিত হোক। তাই নির্বাচন কমিশনারকে অনুরোধ করেছেন, নির্বাচনের আগে এবং পরে সংখ্যালঘুদের যেন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।

নির্বাচনের ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টিয়ান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও খ্রিষ্টান এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্মল রোজারিও।

 আগামী ডিসেম্বরে যেহেতু নির্বাচন, এই নির্বাচন কে আপনি কিভাবে দেখছেন?

নির্মল রোজারিও: ‘জাতীয় নির্বাচন সবার জন্য প্রত্যাশিত, সবাই চাই একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন। আমাদের প্রত্যাশা একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও পক্ষপাতহীন জাতীয় নির্বাচন।  সেটা সকল দলের অংশগ্রহনের মধ্য দিয়ে হলে তো বেশি ভালো। নির্বাচন একটি দেশের পট পরিবর্তনের একমাত্র মাধ্যম।’

‘২০১৪ সালের নির্বাচনে সকল দল অংশগ্রহন করেনি। তখনকার বিরোধী দল জ্বালাও পোড়া করেছিল। আমরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এমন বিশৃঙ্খলা পরিবেশ আর দেখতে চাই না। আমরা চাই সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচন। সংখ্যালঘুরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চাই। আমরা তো অভিবাসী না, এই দেশে আমাদের, এই দেশে আমাদের জন্ম, এ দেশের জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন করেছি।’

‘বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে আমাদের ভোট দেয়ার নাগরিক অধিকার রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে এলে ভয়ে-আতঙ্কে ভুগতে থাকে। তারা নিজেদের সংখ্যালঘু সমাজের দুর্বল অংশ মনে করে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কিছু ভাবে এই সমাজের সামান্য সংখ্যক ধনী ও বিত্তবানরা।’

নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ভোট বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সে দিকটি আপনি কিভাবে দেখছেন?

নির্মল রোজারিও: ‘আমার ভোট আমি দিব, যাকে খুশি তাকে দেব- এটাই তো গণতন্ত্রের রীতিনীতি। যাদের অধীনেই নির্বাচন হোক- সুষ্ঠু-আদর্শ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পুরো দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। স্বাধীন, নিরপেক্ষ, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন যে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, তার প্রমাণ ইতিপূর্বে দেখা গেছে। একাধিক নির্বাচনে।’

‘আগে দেখেছি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারত না। ২০০৮ সালের পর থেকে এ ধরনের ঘটনা আমাদের আর দেখতে হয়নি। আমরা চাই ভোটাধিকারের মাধ্যমে একটি ভালো দল নিয়ে সরকার গঠিত হোক। সাধারণত দেখেছি নির্বাচন মানেই নির্যাতন। পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি নির্বাচন আগে বা পরে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন করা হয়। তাই আমরা নির্বাচন কমিশনের প্রধানকে অনুরোধ করেছি যেন নির্বাচনে আগে এবং পরে সংখ্যালঘুদের যেন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।’

‘এ নিয়ে আমরা কিছু দিনের ভেতর তাঁর সাথে মিটিং করেছি। এই নির্বাচনে ৭ দফা দাবি দিয়েছি। আমাদের আহ্বান, যাতে গণতন্ত্রী ও অসাম্প্রদায়িক দলগুলো থেকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো সম্প্রদায়বাদী ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া না হয়। এ দাবি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত এবং তা শুদ্ধ জাতীয়তাবাদী ও মানবতাবাদী চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তাই মনোনয়নে এ রাজনৈতিক আদর্শের যেন প্রতিফলন ঘটে- এমনটি আমাদের প্রত্যাশা।’

বর্তমান সরকার আমলে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা হয়েছে, এটাকে কিভাবে নিয়েছেন?

নির্মল রোজারিও: ‘বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার নির্যাতনে নির্বাচন ইস্যু একটি অন্যতম বিষয়। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। এ সময় পেট্রোল বোমার ব্যবহার ছিল অন্যতম একটি আতঙ্কিত বিষয়। বাংলাদেশ আঞ্চলিক ব্যাপ্টিষ্ট চার্চ রংপুরের পালক প্রধানের নামে হত্যার হুমকি সংবলিত চিঠি ছাড়াও মোবাইল ফোনে বাংলাদেশ ইন্টারচার্চ পাস্টরস এন্ড লিডারস ফেলোশিপের খুলনা বিভাগের নির্বাহী সচিব এবং চার্চ অব গড এর বাংলাদেশ প্রধানসহ খুলনা বিভাগ ক্যাথলিক চার্চের বিশপকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। শুধু ডিসেম্বরে বড়দিন উদাযাপনের পূর্বে দুইজন খ্রিষ্টান ধর্মযাজকসহ সারাদেশে ৩৭জন খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীকে হত্যার হুমকি আসে। আমাকেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।’

‘নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে গৃহীত সরকার বিরোধী আন্দোলনেও অনুরূপভাবে অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এদেশের সংখ্যালঘুরা। এ মাসে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে; যার পরিমাণ ৮৩টি।’

‘হলি হার্টিজন ও শোলাকিয়া ঈদের জামাতে হামলার ঘটনা পর থেকে সরকার জিরো টলারেন্স এ গেছেন। আমরা লক্ষ্য করেছি সেই সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং বঙ্গবন্ধুর বিচার কাজ সম্পন্ন করতে বাধা দেয়া ছিল সন্ত্রাসীদের মূল লক্ষ। জঙ্গিদের মূল টার্গেট ছিল সরকারকে অস্ততিশীল করা। বর্তমান সরকার দক্ষতার সহিত জঙ্গি দমন করেছেন।’

নির্যাতনের পর সরকার মামলা নিয়েছিল এবং বেশ ভূমিকা দেখিয়েছিল, সেটাকে কিভাবে দেখছেন?

নির্মল রোজারিও: ‘বর্তমান সরকার সংখ্যালঘুদের প্রতি অনেক উদার। সরকার প্রধান সব সময় আমাদের সমস্যায় সমাধানের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সরকারের চাইনি কখনও সংখ্যালষুদের উপর নির্যাতন হোক। এক গোষ্ঠির মূল টার্গেট ছিল সরকারকে অস্থিতিশীল করা। ২০০১ সালে আমরা যখন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম তখন চার দলীয় সরকার প্রধানের কাছে ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে কোন সহযোগিতা পায়নি। সাহায্যের জন্য গিয়ে আমরা উপহাসের পাত্র হয়েছি।’

‘কিন্তু বর্তমান সরকার সংখ্যালঘুদের প্রতি অনেক উদার। ব্যাপক সাহায্য সহযোগিতা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিপদে পড়লে তিনি আমাদের আশ্রয়স্থল হয়ে আমাদের পাশে দাঁড়ান। বর্তমান সরকার সংখ্যালঘু বান্ধব সরকার। বিএনপি-জামাত সরকারের সময় ২০০১ সালে বানিয়ার চর গীর্জাতে বোমা হামলা হয়ে ছিল কিন্তু এখনও সেই মামলার চার্জশীট জমা হয়নি।’

আপনারা কেমন সরকার গঠনে আশাবাদী?

নির্মল রোজারিও: ‘আমরা এই দেশের নাগরিক হিসেবে নির্বাচনে আমরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চাই৷ আমদের দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে নির্বাচনে এমন একটি সরকার যেন আসে যে দেশ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। আমরা আর যেন পিছিয়ে না পড়ি। তাই সঠিক বিবেচনা করে আমাদের ভোটধিকার প্রয়োগ করতে হবে। বর্তমান সরকার দেশকে উন্নয়নশীল দেশে নিয়ে গেছে। তাই আমরা কোন দলের কথা না চিন্তা না করে দেশের জন্য চিন্তা করব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এগিয়ে যাচ্ছে তাই আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে। বর্তমান সরকার অনেক মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সেগুলোর বাস্তবায়ন অবশ্যয় দরকার আছে; না হলে আমরা পিছিয়ে পড়ব। বঙ্গবন্ধু বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্ব যেমন বাংলার মানুষকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে তেমনি শেখ হাসিনা ও তার সেই বলিষ্ঠ নেত্রীতে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করেছে।’

 নতুন সরকার গঠন হলে আপনাদের দাবি দাওয়া কি থাকবে নতুন সরকারের কাছে?

নির্মল রোজারিও: ‘আমরা চাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিক সমান সুযোগ সুবিধা পাবে। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি, গোষ্ঠী, বা সম্প্রদায় যা-ই হোক না কেন, আইন যেমন সবার জন্য সমান হবে, রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, সংগঠন করার স্বাধীনতা, উৎসব করার স্বাধীনতা সবার বেলায় সমান হবে। এখানে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না এটাই প্রতিটি নাগরিকের কাম্য।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা আশানুরূপ নয়। আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও সামাজিক অনুশাসনে বহুত্ববাদের (Pluralism) স্বীকৃতি ও চর্চার বিষয়টি বরাবরই উপেক্ষিত হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে এদেশের সংখ্যালঘুরা নিজদেশেই ঐতিহাসিক কাল ধরে বসবাস করা সত্ত্বেও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অবহেলা ও বঞ্চনা শিকার হচ্ছে। যে সরকারি ক্ষমতায় আসুক না কেনো সংখ্যালঘুদের যেনো মন্ত্রী পরিষদে রাখা হয়। বতর্মান সরকার অসম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। তাই আমরা চাই যে সরকারি ক্ষমতায় আসুক না কেনো  সে জেনো অস্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী হয়।’

সংখ্যালঘুর সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা?

নির্মল রোজারিও: এই দেশ আমাদের, সংখ্যালঘুরা মুক্তিযুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছে। তাই আমাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা উচিত। কারণ দেশ গড়ার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে রাজনীতি। তাই আমাদেরও এই দেশ গড়ার কাজে অংশগ্রহন করতে হবে। হিন্দু বোদ্ধ খ্রিষ্টায়ান তরুণরা অনেকে এখন রাজনীতি করছে। তারাও ধীরে ধীরে রাজনীতিতে নিজেদেরকে সক্রিয় করে তুলছে। দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করছে। প্রত্যাশা করি আগামী প্রজন্মের কাছে একটি সুন্দর দেশ ‘উপহার হিসেবে’ রেখে যেতে পারি।’

একই ধরনের আরও সংবাদ