অধিকার ও সত্যের পক্ষে

আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের উদারতা যে কারণে নিষ্ফল

 ধর্ম ডেস্ক ||

আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন ইবনে কাব। উদারতায় যার সীমা ছিল না। চরম দুর্ভিক্ষের সময়ও যিনি গরিব ও অসহায় মানুষকে ঘোষক দ্বারা আহ্বান করে নিঃশর্ত খাবার দান করতেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক যথাযথ বজায় রাখতেন। হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, তার এ সব কাজও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন ইবনে কাব আত্মীয়তার সম্পর্কের দিক থেকে হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র চাচা এবং হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার দাদা ছিলেন। জাহেলিয়াতের যুগে যখন মানুষ দখলদারি ও অত্যাচার নির্যাতনে নিমজ্জিত ছিল তখন তিনি মানুষের আদর-আপ্যায়নে প্রথম কাতারের লোক ছিলেন।

প্রাথমিক জীবনে তিনি তিনি খুবই গরিব ছিলেন। অভাবের কারণে খারাপ আচরণ করা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। পাপ ও নাফরমানিমূলক কাজে জড়িত থাকা তার স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। খারাপ আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে তার বংশের লোকেরা তাকে চরম খারাপ দৃষ্টিতে দেখতো।

এক সময় সে স্বচ্ছলতা লাভ করে এবং নিজেকে ভালো কাজে আত্মনিয়োগ করে। তার সম্পর্কে প্রিয়নবি জানান-

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! ইবনে জুদআন জাহেলিয়াতের যুগে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করত, মিসকিনকে খাবার খাওয়াতো, এগুলো কি তার কোনো উপকারে আসবে?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘না’, এগুলো তার কোনো উপকারে আসবে না। কেননা সে কখনো আল্লাহর কাছে বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে এ কথা বলেনি যে, ‘হে আমার প্রভু! কেয়ামতের দিন তুমি আমার ভুলসমূহকে ক্ষমা করে দিও।‘ (মুসলিম)

আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের সংক্ষিপ্ত ঘটনা
বংশ ও আত্মীয়-স্বজনের খারাপ দৃষ্টি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে একদিন সে মক্কার অজানা গিরিপথে বেরিয়ে পড়ে। চলতে চলতে এক পাহাড়ের চূড়ায় তার দৃষ্টি পড়ে।

তার ভাবনা হলো
এখানে হয়তো কোনো বিষাক্ত প্রাণী আছে, যার বিষাক্ত আক্রমণে সে নিজেকে আত্মীয়-স্বজনের কৃদৃষ্টি থেকে মুক্ত করতে পারবে। ফলে তার বংশ এবং আত্মীয়-স্বজনও অত্যাচার-নির্যাতন থেকে আরাম লাভ করতে পারবে।

পাহাড়ের চূড়ায় আরোহন করে সে এক বিশাল অজগর দেখতে পেল। অজগরটি দেখে তার মনে হলো তা তার দিকেই এগিয়ে আসছে। আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে অজগরের দিকেই এগিয়ে যেতে লাগলো।

এ সাপটির ঠিক পেছনেই ছিল একটি গুহা। গুহায় প্রবেশ করেই আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের চোখ ছানাবড়া! এ গুহায় ছিল জমহুর কাবিলার শাসকদের কিছু কবর। যার মধ্যে হারেস বিন মিজাজের সমাধিও একটি।

হারেস বিন মিজাজ বহু আগে নিখোঁজ হয়েছিল। কেউ জানত না যে সে কোথায় গিয়েছে। তাকে আসমানে ওঠিয়ে নেয়া হয়েছে নাকি মাটিতে খেয়ে ফেলেছে।

আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন কবরগুলোর পাশে একটি সিংহাসন পেল। সে সিংহাসনটিতে বাদশাহদের শাসনকালও মৃত্যুর তারিখ লিখিত ছিল। এ ছাড়াও ওই গুহাটি হিরা, জহরত, সোনা-চাদিতে পরিপূর্ণ ছিল।

আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন প্রয়োজনমতো হিরা-জহরত, সোনা-চাদি নিয়ে গুহার মুখে একটি চিহ্ন দিয়ে আবার জনপদে ফিরে আসে।

স্বজাতির কাছে ফিরে এসে আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন কাওমের লোকদেরকে যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ দান করে। ফলে লোকেরা তাকে ভালোবাসতে লাগলো।

এভাবে আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন লোকদের ধন-সম্পদ দান এবং খাবার খাওয়াতে লাগলো। আর যখনই সম্পদ শেষ হতো তখনই আবার পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে প্রয়োজন মতো সম্পদ নিয়ে ফিরে আসতো।

আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন লোকদেরকে খাদ্য হিসেবে খেজুর ও ছাতু আর পাণীয় হিসেবে দুধ দিতো।

একবার আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন শাম দেশ থেকে দুই হাজার উট পাঠিয়ে গম, মধু ও ঘি মক্কায় নিয়ে আসে। তারপর সে এক আহ্বানকারী নিয়োগ করে। ঘোষক প্রতি রাতে কাবা ঘরের ছাদে ওঠে সাধারণ মানুষকে এভাবে দাওয়াত দিতো যে-
‘আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের পাতিলের দিকে আস।’

পাতিলের বর্ণনা
– হজরত ইবনে কুতইবা বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের খাবার তৈরির পাতিল এত বড় ছিল যে, উটের ওপর আরোহন করে পাতিলের ভেতর থেকে খাবার সংগ্রহ করতে হতো।

– অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের পাতিলের ছায়ায় আমি ছায়া গ্রহণ করতাম।’

– এমনকি এ কথাও বর্ণিত আছে যে ওই পাতিল থেকে খাবার সংগ্রহ করতে সিড়ি ব্যবহার করা হতো।’

এতো বড় উদার মানসিকতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন আল্লাহর কাছে নতশির হতে পারেনি। বরং আল্লাহর কাছে নতশির হওয়ার যে ফর্মুলা তা থেকে সে সম্পূর্ণ বিমুখ ছিল।

এতো মহান হওয়া সত্ত্বেও, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা সত্ত্বেও, গরিব-দুঃখীর সাহায্য সহযোগিতা করা সত্ত্বেও ঈমান না থাকার কারণে, আল্লাহর কাছে নতশির না হওয়ার কারণে তার সব উদার আয়োজন নিষ্ফল হয়ে গেল।

সুতরাং আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন হতে পারে বিশ্ব মানবতার জন্য শিক্ষা লাভের অনুপ্রেরণা। যিনি উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সত্ত্বেও নিজেকে আল্লাহর কাছে বিনয় ও নম্র এবং আত্মসমর্পন করতে না পারায় সব ভালো কাজ নিষ্ফল হয়ে গেল।

তাই মুসলিম উম্মাহর উচিত, গরিব-দুঃখী, অসহায় মানুষের মাঝে সহায়তা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার পাশাপাশি মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি অগাধ আস্থা এবং বিশ্বাস স্থাপন করা। তবেই পরকালের নাজাত সম্ভব।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে পরকালের সফলতায় সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সঠিক ঈমান লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।

একই ধরনের আরও সংবাদ