অধিকার ও সত্যের পক্ষে

  মানসম্পন্ন শিক্ষায় বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করার বিকল্প নেই 

 লেখক মো: হায়দার আলী:

 মহান ও নিবেদিত পেশা হিসেবে শিক্ষকতা সর্বজন স্বীকৃত। মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবেই মনে করা হয় শিক্ষকদের। পাঠদানে আত্ম-নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিহিত থাকা সুপ্ত মেধা জাগ্রত করা, দুঃস্থ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিজের অর্থ ব্যয়ে দেশ সেরা হিসেবে গড়ে তোলা শিক্ষকও দেশে বিরল নয়। এ জন্যই সমাজে শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি সম্মানিত, শিক্ষার্থীরাও যুগে যুগে স্মরণ রাখেন তাদের। তবে কিছু শিক্ষকের অনৈতিকতা ও অর্থলিপ্সায় ভূলণ্ঠিত হতে চলেছে গোটা শিক্ষক সমাজের মর্যাদা।

প্রশ্ন উঠেছে তাদের দায়িত্ববোধ, আন্তরিকতা ও নৈতিকতা নিয়ে। শিক্ষকতার প্রতি চিরাচরিত অঙ্গীকার ভুলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত কোচিং সেন্টারে পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। নির্দেশ না মানলেই নম্বর কমিয়ে দেয়া, নানা ক্ষেত্রে নিগৃহীত করা এমনকি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটাচ্ছেন কোন কোন শিক্ষক। প্রবীণ শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষকদের নিজেদের কারণেই তাদের সম্মান কমছে। এখান থেকে শিক্ষকদের যে কোন মূল্যে বেরিয়ে আসতে হবে।

সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী ও সরকারী স্কুল কলেজ  মাদ্রাসার শিক্ষক কর্মচারীদের পূনাঙ্গ ঈদ বোনাস প্রদান করা হলেও বেসরকারী শিক্ষক কর্মচারীদের সে সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয় না। এ যেন সরকারের একচোখে লবণ অন্য চোখে তেল দেওয়ার মত অবস্থা। অথচ দেশের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব করেন বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক কর্মচারীগন। তাই সরকারী ও বেসরকারী দু ধারা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সরকারীতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, কর্মচারীদের সুযোগ সুবিধা বেশী থাকায় তারা পাবলিক পরীক্ষায় ফলাফল ভাল করছে। তাই ভাল ফলাফলের জন্য বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বিকল্প নেই।

তার পরেরও বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলি পাবলিক পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন বিষয়টি কারো অজানা নেই। এ নুন আন্তে পান্তা ফুরায় অবস্থা অবহেলিত শিক্ষক সমাজের দাবী বৈশাখী ভাতা, ৫ ভাগ বেতন বৃদ্ধি, আলাদা বেতন স্কেল, পূনাঙ্গ ঈদ বোনাস। সে দাবীর একটিও পূরণ হয় নি। এ ব্যাপরে শিক্ষক সমাজ আন্দোলন করছেন, সাংবাদিক সন্মেলন, প্রতিবাদ করছেন। বিষয়টি সুযোগ্য প্রধান মন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিবেচনা করবেন বলে শিক্ষক সমাজ মনে করেন।

বেসরকারী শিক্ষক কর্মচারীদের জাতীয় পেস্কেল এর অন্তভুক্তি করায় প্রধান মন্ত্রীসহ সরকারকে অভিন্দন ও ধন্যবাদ জানাতে ভুল করেন নি শিক্ষক সমাজ। এদিকে অর্থ মন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মহিত প্রায় বলে থাকেন বেসকারী শিক্ষকদের বেতনভাতা দেয়া হয় না তাদের মাসিক অনুদান দেয়া। অনুদান যদি দেয়া হয় তবে শিক্ষকদের ইনকাম ট্যাক্স দিতে হবে কেন? এ বিষয়টিও ভেবে দেখবেন। শিক্ষাবন্ধব সরকার শিক্ষক সমাজের যৌক্তিত দাবীগুলি বিবেচনা করবেন অবশ্যই। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় পর গত বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার পাসের হার কমেছে।

২০০১ সালে পাসের গড় হার ছিল ৩৫.২২ শতাংশ। এই হার বাড়তে বাড়তে ৯১.৩৪ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। শিক্ষাবিদদের অভিযোগ ছিল, উদারভাবে খাতা মূল্যায়নের নির্দেশের মাধ্যমে পাসের হার বাড়িয়ে সংশ্লিষ্টদের কৃতিত্ব নেয়ার চেষ্টা ছিল। এ নিয়ে কম আলোচনা-সমালোচনা হয়নি। বেশিরভাগ শিক্ষাবিদদের মত, পাসের হার বাড়লেও শিক্ষার মান কমে গেছে। এতে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় এক নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে এসএসসির ফলাফল প্রকাশের পরপরই এ ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অবশ্য এ অভিযোগ বরাবরই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোর পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে।

এ অভিযোগের মধ্যেই এ বছর এসএসসির পাসের হার কমে গেছে। দশ বোর্ড মিলিয়ে পাসের গড় হার ৮০.৩৫ শতাংশ। গত বছর ছিল ৮৮.২৯ শতাংশ। পাসের হার কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি ও একটি নীতিমালা করে দেয়া। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে কোনো পদ্ধতি ছিল না। শত শত বছর ধরে এভাবেই চলে আসছে। আমাদের খাতা দেখা ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এবার একটা মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করেছি।

পরীক্ষকদের খাতার সঙ্গে মডেল উত্তরও দেয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী খাতা মূল্যায়নের নির্দেশনা দেয়া হয়। এছাড়া এতদিন প্রধান পরীক্ষকরা খাতা না দেখেই মতামত দিতেন। এবার প্রধান পরীক্ষককেও ১২ শতাংশ খাতা দেখতে হয়েছে। শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, দেরিতে হলেও পাসের হার বৃদ্ধি দেখানোর প্রবণতা থেকে বের হয়ে খাতার যথাযথ মূল্যায়ন করে ফলাফল প্রকাশ করা ইতিবাচক। এতে কিছুটা হলেও শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, বিগত বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে পাসের হারের যে উলম্ফন, তা যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বোর্ডগুলোর মধ্যে পাসের হার বৃদ্ধি দেখিয়ে এক ধরনের কৃতিত্ব নেয়ার প্রবণতা প্রবল হয়ে উঠে। খাতা দেখার ক্ষেত্রে উদার নীতি অবলম্বন এমনকি কাউকে ফেল করানো যাবে না-এমন একটি অলিখিত নির্দেশনা ছিল বলে অভিযোগ উঠে। এর ফলে পাসের হার প্রতি বছরই হু হু করে বেড়েছে। প্রতি বছরই মেধার বিস্ফোরণ ঘটেছে। অন্যদিকে দেশের সচেতন শ্রেণী ও শিক্ষাবিদরা একে শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে অশনি সংকেত হিসেবে গণ্য করেছেন।

শিক্ষার্থীরা এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ  ৫ পেয়েও ভাল কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। এসএসসি ও এইচ এসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ৫ পেয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনকি মেডিক্যাল কলেজ গুলিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় নি আনেক মেধাবী শিক্ষার্থী। ফলে ওই সব শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মাঝে হতাশা কাজ করে। দেশের অক্সফোড খ্যাত, ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষা খুব কম নম্বর পেয়েছিল এমনকি অনেক শিক্ষার্থীরা পাস নম্বরও পায় নি এ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের মধ্যে বির্তক বেঁধে গিয়ে ছিল।

এ বির্তক চলে বেশ কিছু দিন। শিক্ষার গুনগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে শিক্ষাবিদগণ এবং পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা সমালোচনার ঝড় তুলেন টিভি টক শো তে। যখনই পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয় তখনই এক শ্রেণীর তথাকথিত বুদ্ধিজীবি শিক্ষাবিদগন শিক্ষার গুনগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এতে প্রধান মন্ত্রী বিরক্ত হয়ে বলেছেন আমরা শিক্ষা সংখ্যাগত মান বৃদ্ধি করেছি, শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন করেছি আপনার বিরোধীতা সমালোচনা না করে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার গুনগত মান বৃদ্ধি করুণ না কেন? আপনাদের কে নিষেধ করছে। স্বেচ্ছায় শ্রম দেন অসুবিধা কোথায় ?। দেখা গেছে, যেসব শিক্ষার্থীরা জিপিএ-৫ পেয়েছে, ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তাদের অধিকাংশই ঝরে পড়েছে। অথচ স্বাভাবিক বিবেচনায় এসব মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না। সাধারণ ফলাফল নিয়ে যেসব শিক্ষার্থী পাস করেছে, ভাল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি সোনার হরিণ হয়ে পড়ে। এ থেকে শিক্ষার মান এবং পাশের হার বৃদ্ধির বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। শিক্ষাব্যবস্থায় অসুস্থ পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি সামাজিক সমস্যাও সৃষ্টি হয়।

শিক্ষা সার্টিফিকেট সর্বস্ব হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকেরা ওই দিকে এগিয়ে যায়। সার্টিফিকেট সর্বস্ব শিক্ষার্থী যেমন নিজে ব্যর্থ ও হতাশ হয়, তেমনি তারা ধীরে ধীরে দেশের বোঝায়ও পরিণত হয়। শিক্ষাবিদরা বারবারই বলেছেন, উদার খাতা মূল্যায়ন এবং কাউকেই ফেল করানো যাবে না-এমন নীতি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন। তা নাহলে দেশ একদিকে যেমন মেধাশূন্যতার দিকে যাবে, অন্যদিকে হতাশ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, একজন সত্যিকারের মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশাপাশি কম মেধাবী শিক্ষার্থীকেও সমান ফলাফল করতে দেখা গেছে। এতে সংগতকারণেই মেধাবী শিক্ষার্থীর মধ্যে হতাশা দেখা দেয়া স্বাভাবিক।

বিলম্বে হলেও শিক্ষামন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি উপলব্ধি করেছে। তারা বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দেয়ায় এবারের ফলাফল কিছুটা হলেও শিক্ষার মান উত্তরণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পদক্ষেপ হয়ে থাকবে। পরীক্ষার খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করলে যে সত্যিকারের মেধার বিচার হয়, তা পরিলক্ষিত হয়েছে। ২০১৮ ইং সালে এসএসসি পরীক্ষার পাসের হার ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। গত বারের চেয়ে এবার পাসের হার কমেছে। গতবার পাসের হার ছিল ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশ। তবে এবার গতবারের চেয়ে জিপিএ ৫ বেড়েছে। এবার মোট জিপিএ ৫ পেয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৬২৯ জন শিক্ষার্থী। গতবার পেয়েছিল ১ লাখ চার হাজার ৭৬১ জন।

১০ বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২০ লাখ ২৬ হাজার ৫৭৪ জন। এর মধ্যে পাস করেছে ১৫ লাখ ৭৬ হাজার ১০৪ জন। এবার মোট ২৮ হাজার ৫৫৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে এক হাজার ৫৭৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শত ভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। এবার আটটি সাধারণ শিক্ষা র্বোডরে অধীন শুধু এসএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৭৯ দশমিক ৪০। গতবারের চেয়ে পাসের হার কিছুটা কম। গতবার এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৮১ দশমিক ২১ শতাংশ। তবে এসএসসিতে জিপিএ ৫ গতবারের চেয়ে বেড়েছে। এবার জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ ২ হাজার ৮৪৫ জন।

যা গতবারের চেয়ে চার হাজার ৮৮১ জন বেশি। অন্যদিকে এবার পাসের হার মাদ্রাসায় ৭০ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং কারিগরীতে ৭১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। দেখা গেছে, এবার সারা ১০৯ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি। গত বছর এ সংখ্যাটি ছিল ৯৩টি । জিপিএ-৫ এর সংখ্যাও কমেছে। অপর দিকে এবছর এইচএসসি পরীক্ষায় ফলাফলে দেখা যায়, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার ৫৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। আর ৪০০টি প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয়া সব শিক্ষার্থীই পাস করেছে। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে, জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৯ হাজার ২৬২ জন।

এ পরীক্ষায় গত বছর ৭২টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ফেল করে। সেই হিসেবে এবার শতভাগ ফেলের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ১৭টি। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, উল্লেযোগ্য বিষয় হলো, শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবার কমেছে। এবার দিনাজপুর বোর্ডের ১২টি, ঢাকা বোর্ডের ছয়টি, রাজশাহী বোর্ডের ছয়টি, যশোর বোর্ডের চারটি; কুমিল্লা া, বরিশাল ও সিলেট বোর্ডের দুটি করে এবং চট্টগ্রাম বোর্ডের একটি প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। মাদ্রাসা বোর্ডের ১৩টি এবং কারিগরি বোর্ডের সাতটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী এবার পাস করতে পারেনি। অন্যদিকে ৪০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী এ বছর উচ্চ মাধ্যমিকে পাস করেছে, গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৫৩২টি। এ হিসেবে এবার শতভাগ শিক্ষার্থী পাসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩২টি কমেছে।

ঢাকা বোর্ডে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে এমন প্রতিষ্ঠান ৩৯টি। এছাড়া রাজশাহী বোর্ডে ১৯টি, কুমিল্লা ও দিনাজপুরে ১৪টি করে, সিলেটে ১০টি, যশোরে ছয়টি এবং চট্টগ্রাম ও বরিশাল পাঁচটি করে প্রতিষ্ঠানের সবাই পাস করেছে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার ২৮৮টি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। আর কারিগরি বোর্ডে শতভাগ পরীক্ষার্থী পাস করা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। এই ফলাফল বিগত বছরগুলোর তুলনায় কম হলেও এর মাধ্যমে কিছুটা হলেও মেধাভিত্তিক ফলাফলের চিত্র ফুটে উঠেছে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানগুলো শূন্য ফলাফল করেছে, সেগুলোকে ভাল করার সুযোগ সরকারকে দিতে হবে।

ওই সব প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিল না করে প্রতিষ্ঠানের সমস্যা চিহ্নিত করে তা নিরসনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এবারের ফলাফলে বরাবরের মতোই গ্রাম ও শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাসের হারের মধ্যে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা গেছে। অথচ সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। যদি তাদের অধিকাংশই ভাল ফলাফল করতে না পারে, তবে তার কুফলও অনিবার্যভাবে পড়বে। শহর ও গ্রামের শিক্ষার মানের এই ব্যবধান কমিয়ে আনার সর্বাত্মক উদ্যোগ নেয়া অপরিহার্য। তা নাহলে সার্বিক শিক্ষার মান নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এবার যে নীতির মাধ্যমে খাতা দেখা হয়েছে, তা অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। আমরা চাই, সব শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করুক। তবে তা যোগ্যতার মাধ্যমে করুক। যার জিপিএ ৫ পাওয়ার যোগ্যতা নেই, তাকে তা দিয়ে দেয়া হলে, তার জন্য যেমন ক্ষতিকর, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও ক্ষতিকর। আশার কথা, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে আগামীতে শিক্ষার মান বৃদ্ধি ঘটবে। এ কথাও বলা আবশ্যক, শিক্ষার মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের দক্ষ শিক্ষক প্রয়োজন । তাদেরকে দেশে বিদেশে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করার বিষয়টির জন্য প্রকল্প হাতে নিতে হবে। শিক্ষকদের দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা দরকার। তা না হলে, খাতার মূল্যায়ণের ক্ষেত্রে যেমন গলদ থেকে যাবে, তেমনি মান সম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যও অনর্জিত থেকে যাবে। জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় খাতা মূল্যায়নের জন্য শিক্ষা বোর্ড গুলি প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষকদের যে সামান্য সম্মানী দেয়া হয় তার চেক প্রদান করা হয় প্রায় এক চছর পরে।

এমনকি খাতা নেওয়ার সময় শুধুমাত্র গুদামের গেট থেকে বের করে দেয়ার জন্য কর্মরত কর্মচারীরা শিক্ষকদের বাধ্য করে প্রকাশ্যে ২০/৫০ টাকা আদায় করে থাকেন। ফলে পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নে অনিহা থেকে যায়। অনেকে খাতা মূল্যায়ন নিজে না করে যাকে তাকে দিয়ে খাতা মূল্যায়ন, ভরাট করার কাজটি করে থাকেন। মূল্যায়নকৃত খাতা প্রধান পরীক্ষকদের নিকট জমা দেয়ার সময় সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি, বেশী ফেল করিয়েছে, এ প্লাস কম দিয়েছেন বলে পরীক্ষকদের ওই খানে পুণ:মূল্যয়নে বাধ্য করারও অভিযোগ রয়েছে। না করলে পরীক্ষককে ডি গ্রেড করারও হুমর্কী প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। ফলে বেশীর ভাগ অভিজ্ঞ. গৎ যোগ্য শিক্ষকগন পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন থেকে বিভিন্ন অজুহাতে বিরত থাকার চেষ্টা করায় কম অভিজ্ঞতা, কম মেধা ও যোগ্যতার শিক্ষক খাতা মূল্যায়নের সুযোগ পায়। শিক্ষবোর্ড কতৃপক্ষকে সম্মানী বাড়াতে হবে এবং খাতা মূল্যায়নের ২ থেকে ৪ মাসের মধ্যে সম্মানী পরিশোধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মচারীদের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহÑসভাপাতি ও রাজশাহী জেলার ভারপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো: শাহাদুল হক মাষ্টার বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষাবান্ধব সরকার, শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তবধর্মী বৈপ্লাবিক পরিবর্তন এনেছেন, শিক্ষার সংখাগত মানবৃদ্ধি করেছেন, গুনগতমান বৃদ্ধি পায়নি। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকদের সচেতন করেছেন। এ সচেতেনতাকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে শিক্ষার গুনগত মান বৃদ্ধিতে প্রকল্প হাতে নিতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ধারাবাহিকভাবে তদারর্কী করে শিক্ষার গুনগত মান বৃদ্ধি করা সম্ভাব। বেসরকারী শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীকরণ করতে হবে। রাজশাহী জেলার সিসিবিভিওর প্রকল্প সমন্বয়কারী মো: নিরাবুল ইসলাম নিরব বলেন, বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মত এক সাথে জাতীয় করণ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিক্তিক শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানাগার নির্মান করে ব্যবহারিক ক্লাস, তার নম্বর প্রদান নিশ্চিত করতে হবে পাশাপাশি শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান তদারর্কী বাড়াতে হবে।

 লেখক-সাধারণ সম্পাদক, গোদাগাড়ী প্রেস ক্লাব

একই ধরনের আরও সংবাদ