অধিকার ও সত্যের পক্ষে

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘সামান্য শিক্ষক’

 শাকিলা নাছরিন পাপিয়া ||

শিক্ষক এবং শিক্ষকতা পেশার প্রতি সমাজে এক সময় শ্রদ্ধাবোধ ছিল। কিন্তু সময়ের বিবতের্ন শিক্ষকতা পেশা তার নৈতিকতা হারিয়ে এখন সৃজনশীল ব্যবসায়ে রূপান্তরিত হয়েছে। শিক্ষকতা পেশাকে তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিতে হবে। বিনয়ের সঙ্গে, অনশন করে, হাড় কাঁপানো শীতে শহীদ মিনারে শুয়ে থেকে, পিপার স্প্রে সহ্য করে বলতে চেয়েছি গত সাতচল্লিশ বছরে একটু একটু করে গড়ে ওঠা বিশাল বঞ্চনা আর অপমানের ইতিহাস। কত শত বড় বড় ঘটনার ভিড়ে ‘সামান্য স্কুল’ শিক্ষকের সে ইতিহাস শোনার সময় হয়নি উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত কারো। মিডিয়ার জন্য রয়ে গেছে মুখরোচক, চটকদার হাজারটা খবর। ‘সামান্য শিক্ষকের’ বঞ্চনায় তার আগ্রহ নেই। আমাদের দেশে বারো মাসে তেরো পাবের্ণর মতোই এখন প্রায়ই লেগে থাকে নানা দিবস। এসব দিবসে র‌্যালি, আলোচনা, ফটো সেশনসহ নানা আয়োজনে মুখরিত হয় রাস্তা, প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া।

৫ অক্টোবর। বিশ্ব শিক্ষক দিবস। দায়সারা আলোচনায় শেষ হয় প্রতি বছর দিবসটি। শৈশব থেকে যৌবনে, যৌবন থেকে পৌঢ়তে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঝাপসা হয়ে আসে প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিক্ষক আর সে সময়ের নিষ্পাপ আবেগ। ফলে সাফল্যের উচ্চাসনে পৌঁছে কেউ আর ভাবে না শৈশবের শিক্ষক আর তার বঞ্চনা নিয়ে।

শিক্ষক পিতার সন্তান হিসেবে জন্ম থেকেই নানা বঞ্চনা দেখে দেখে অভ্যস্থ আমি। প্রাথমিক শিক্ষক মানেই যে ছবিটা আমাদের চোখে দৃশ্যমান তা হলো, দরিদ্র, মলিন বস্ত্র, ধীর স্থির, একজন মানুষ। তবে, আজ থেকে পঁচিশ ত্রিশ বছর আগে এই দরিদ্র, ধীর, স্থির মানুষগুলোর মাঝে কোথাও কোথাও ছিল মানুষ তৈরির স্বপ্ন। প্রতিষ্ঠানকে সতিকারের সাফল্য অজের্নর দ্বারে পৌঁছে দেবার প্রচেষ্টা। শিল্পী হয়ে মানব তৈরির প্রচেষ্টায় রত। তবে, এই শিক্ষকদের ছিল সামাজিক মযার্দা। কেউ কেউ এদের দেবতা সমতুল্য জ্ঞান করতো। সমাজ শিক্ষাকদের দিত সম্মান। ফলে, শিক্ষক তার দায়িত্বের প্রতি ছিল নিষ্ঠাবান।

বিরানব্বই-তিরানব্বই সালে খুব সম্ভবত একদিন টিএসসিতে একটা অনুষ্ঠানে একদল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাথীর্র সঙ্গে আমায় পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছিল। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে। তখন ঐ ছাত্ররা উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘আপনি সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত পেশার, একজন। আমাদের মাঝে আপনাকে পেয়ে আমরা গবির্ত।’ শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের পর যত ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ করেছি, শুরুতেই যিনি ট্রেনিং দিতেন তিনি এসে বলতেন ‘আপনারা সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। আপনাদের জ্ঞান দিতে নয়। আমার জ্ঞানটুকু আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে আমি এসেছি।’

কমর্কতার্রা অনেকেই বলেছেন, ‘ভাবতে খারাপ লাগে এত কম বেতনে উচ্চ শিক্ষা শেষে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে একই অবস্থানে কাটাতে হবে সারা জীবন।’

ধীরে ধীরে পরিবতর্ন হয়েছে সমাজ এবং সময়ের। এখন শিক্ষাগত যোগ্যতায় অনেক এগিয়ে পূবের্র তুলনায় প্রাথমিকের শিক্ষকবৃন্দ। নিজেদের অসহায়, দরিদ্র অবস্থানে দেখতে চায় না বলেই অধিকারের ব্যাপারেও তারা সোচ্চায়।

কথায় আছে পেটে খেলে পিঠে সয়। বেতন স্কেল পযাের্লাচনায় দেখা গেছে সুইপারেরও নিচে প্রাথমিকের শিক্ষকের অবস্থান। না, আমি সুইপার পেশাকে অবজ্ঞা করছি না।

উন্নত দেশে যেখানে সবোর্চ্চ পেশা শিক্ষকতা। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের চেয়ে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেতন বেশি সেখানে আমাদের দেশে সবির্নম্ন বেতন এবং সেই সঙ্গে অতীত সম্মান হারিয়ে অসম্মানের শেষ ধাপে অবস্থান এখন প্রাথমিকের শিক্ষকের।

গত বছর দেখা পুরনো এক বন্ধুর সঙ্গে অনেকদিন পর। তার প্রশ্ন, এত পেশা থাকতে শিক্ষক হতে গেলাম কেন? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটাই অজর্ন।

পণ্ডিত মশাইয়ের তিন ঠ্যাংওয়ালা কুকুরের কত পায়ের সমান একজন শিক্ষকের বেতন অথবা তালেব মাস্টার কবিতার চরম দারিদ্র্যের চিত্র শেষে এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিজের অবস্থান পরিবতের্ন সচেষ্ট। ফলে, প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী শিক্ষক মিলে তাদের নানা ধরনের দাবি নিয়ে শুরু করল আন্দোলন। এক পযাের্য় প্রধান শিক্ষকদের হয় শ্রেনির মযার্দার দাবি মেনে নেয়া হলেও সহকারীদের দাবি মেনে নেয়া হলো না। সহকারীদের তীব্র আন্দোলনের সময় প্রতিশ্রুতি দেয়া হলো তাদের দাবি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। অবশেষে সহকারী শিক্ষকবৃন্দ তাদের তীব্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে যা যা পেল, তা হলো:

১। প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির মযার্দার ভাব।

২। দুই ধাপ নিচের বেতন এখন তিন ধাপ নিচে নেমে যাওয়া।

৩। সহকারীদের জন্য প্রধান শিক্ষক এবং কমর্কতাের্দর পরকালের বেহেশত অজের্নর জন্য সততার উপদেশ বজর্ন।

৪। শিক্ষক সংগঠনগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া।

৫। সহকারী শিক্ষকদের ফাঁকিবাজ মনে করা।

প্রাথমিক শিক্ষা একটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভিত্তি প্রস্তর হলে এক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন সবার আগে প্রয়োজন। যত দিন যাচ্ছে ততই জটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পারস্পরিক বিদ্বেষ, অনিয়ম তীব্র আকার ধারণ করছে। জটিলতা নিরসনে কোনো কাযর্কর পদক্ষেপ নেই।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশাকে বলা হয় ভ্যাকেশনাল ডিপাটের্মন্ট। ফলে, অন্যান্য সরকারি কমর্চারী থেকে এ পেশার সুযোগ সুবিধা কম। অথচ ছুটির তালিকা পযাের্লাচনা করলে দেখা যায় একদিন সাপ্তাহিক ছুটি এবং নানা দিবস পালনের মাধ্যমে অন্যান্য পেশাজীবী থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ছুটি কম।

অন্য দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা হয় প্রাথমিকের শিক্ষক। যদি সত্যিই শিক্ষার উন্নয়ন চাই। শিক্ষার মাধ্যমে যদি একটি আত্মমযার্দাবোধ সম্পন্ন জাতি গঠন করতে চাই, তা হলে আমাদের গত ৪৭ বছরের অচলায়তন ভেঙে। পণ্ডিত মশাইয়ের প্রশ্নের সমাধান করে তালেব মাস্টারদের জীবনের পরিবতর্ন ঘটিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

শিক্ষক দিবস শুধু শিক্ষকদের সততার জ্ঞান বিতরণ করে, তাদের পেশা কতটা সম্মানিত সে বিজ্ঞাপন দিয়ে কতর্ব্য শেষ করা হয়। শিক্ষক দিবসে নীতি নিধার্রকের আসনে অধিষ্ঠিত সফল মানুষ তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে গুরু দক্ষিণা নিয়ে ৪৭ বছরের অনিয়ম ভেঙে দঁাড়াতে হবে।

কুড়িগ্রামের শিক্ষক বসুনিয়া তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘শিক্ষকতা যদি এতই সম্মানিত পেশা হয় তাহলে অন্য পেশা বাদ দিয়ে চলে আসুন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায়।’

একটা নাটকের সংলাপ ছিল, ‘খালি মুখের চুমা লাগে ধুমা ধুমা।’ সততা, সম্মানিত এসব শব্দ একজন শিক্ষককে তখন উপহাস করে যখন সন্তানের লেখাপড়া, নিজের চিকিৎসার জন্য স্কুলে স্কুলে সাহায্যের জন্য একজন শিক্ষকের হাত পাততে হয়।

শিক্ষক এবং শিক্ষকতা পেশার প্রতি সমাজে এক সময় শ্রদ্ধাবোধ ছিল। কিন্তু সময়ের বিবতের্ন শিক্ষকতা পেশা তার নৈতিকতা হারিয়ে এখন সৃজনশীল ব্যবসায়ে রূপান্তরিত হয়েছে। শিক্ষকতা পেশাকে তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিতে হবে।

প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির মযার্দায় উন্নীত করার পর তার পরের ধাপে সহকারী শিক্ষকদের উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় এখন প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী শিক্ষক নীরব প্রতিপক্ষ হয়েছে। একদল তেল দেয়া শুরু করে তাদের স্বাথির্সদ্ধির পথ সুগম করছে আবার একদল নিজেদের বঞ্চিত ভেবে মনঃকষ্টে ভুগছে। অথচ একটি বিদ্যালয় পরিচালনা, শিক্ষার বিকাশ, বিদ্যালয়ের সাবির্ক উন্নয়নে প্রয়োজন সুষ্ঠু টিমওয়াকর্। পারস্পরিক বিদ্বেষ এই পরিবেশ নষ্ট করছে। পদোন্নতি নেই, সম্মান নেই, মেধার স্বীকৃতি নেই- এমন পেশায় কেন আসবে মানুষ? প্রতি বছর উন্নত দেশের শিক্ষা পদ্ধতি অনুসরণের চেষ্টা চলছে, কাজের নতুন নতুন বোঝা এনে প্রাথমিকের শিক্ষকদের ওপর চাপানো হচ্ছে, কাগজপত্র, রেজিস্ট্রার ঠিক রাখার জন্য সাবর্ক্ষণিক তাদের ব্যস্ত রাখা হচ্ছে। অথচ শিক্ষকের কাজ করার সামর্থ, তার সৃজনশীল চিন্তা-ভাবনার জন্য পযার্প্ত সময়, একটি সুষ্ঠ সুন্দর পরিবেশ নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। শিক্ষক গুরু না হয়ে জীবনযাপনের প্রয়োজনে কেন ব্যবসায়ী হলো? কেন শিক্ষা ধীরে ধীরে পণ্যে পরিণত হয়ে শিক্ষকের মযার্দা শূন্যে এসে দাঁড়ালো তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

একদিনে এতগুলো বছরের অনিয়ম মুছে ফেলা সম্ভব নয়। আগে শিক্ষার ভিত্তি প্রাথমিক স্তরে কী কী সমস্যা, অনিয়ম তা চিহ্নিত করতে হবে। রাজনৈতিক সুবিধার দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে একটি দেশের স্থায়ী গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রয়োজনে এ অনিয়ম রোধে যার যার অবস্থান থেকে কাযর্করী পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার নেয়ার প্রয়োজন শিক্ষক দিবসে যখন নেয়া হবে তখনই দিবসটি মযার্দা পাবে, সফল হবে।

শিক্ষক দিবসে আমাদের ভাবনা প্রাধান্য পেতে পারে-

(১) ভ্যাকেশনাল ডিপাটের্মন্টের মিথ্যে বলয় থেকে মুক্তি।

(২) প্রধান শিক্ষকদের পরের ধাপে সহকারীদের বেতন স্কেল নিধার্রণ।

(৩) শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো তৈরি।

(৪) শিক্ষক-শিক্ষাথীর্ অনুপাত এবং প্রতিদিন ক্লাসের সংখ্যা ১ থেকে ২টা করা।

(৫) সভাপতির দাপট থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুক্ত করা।

(৬) পাহারাদার বা নৈতিক উপদেশ বষর্ণ নয়, প্রাতিষ্ঠানিক এবং শিক্ষকদের সহায়তায় কমর্কতাের্দর নিয়োগ।

(৭) শিক্ষা অফিসের দুনীির্ত বন্ধে কাযর্কর পদক্ষেপ গ্রহণ।

(৮) শিক্ষকদের নানামুখী ব্যবসা বন্ধে কঠোরতা এবং তাদের উন্নত জীবনমানের নিশ্চয়তা।

(৯) শিক্ষকতা পেশাকে মযার্দাপূণর্ এবং দায়িত্বশীল পযাের্য় নিয়ে আসা।

(১০) সহকারী শিক্ষক থেকে ডিজি পযর্ন্ত পযার্য়ক্রমে শিক্ষকদের পদোন্নতির ব্যবস্থা রাখা।

(১১) শুধু মেধা নয়, শিক্ষক নিয়োগের নৈতিকতা এবং সৃজনশীলতাকে বিবেচনায় রাখা।

(১২) শিক্ষক শব্দের সঙ্গে যে দায়িত্ব এবং নৈতিকতাবোধ জড়িত। মেরুদণ্ড সোজা করে নিভির্কভাবে কথা বলার দক্ষতা অজর্ন জড়িত তা সমাজ এবং শিক্ষকের নিজের উপলব্ধিতে সহায়তা করা।

(১৩) শিক্ষকদের সাফল্য এবং বঞ্চনার চিত্র মিডিয়ার তুলে ধরা। একলব্য হয়ে গুরু দক্ষিণার দায়বদ্ধতা থেকে শিক্ষকদের অবস্থান পরিবতের্ন কলম এবং ক্যামেরার ব্যবহার করা।

(১৪) দেশ এবং জাতির স্বাথের্ শিক্ষকতা পেশাকে সবোর্চ্চ পেশায় উন্নীত করার পাশাপাশি প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সব শিক্ষকদের মযার্দায় বিভাজন না করে একই অবস্থানে নিয়ে আসা।

(১৫) শিক্ষকদের নৈতিকতা বিবজির্ত কাজের কঠোর ব্যবস্থা নেয়া।

(১৬) ‘সামান্য’ নামক বিশেষণ মুছে ফেলতে কাযর্কর পদক্ষেপ। গুরু এবং পিতা-মাতা এই তিনজন ব্যক্তি একটি শিশুকে মানুষে পরিণত করতে ভূমিকা রাখে। সুতরাং মানুষের বিশ্বে মানুষ সৃষ্টির জন্যই প্রয়োজন গুরু সৃষ্টি করা।

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক

 

একই ধরনের আরও সংবাদ