অধিকার ও সত্যের পক্ষে

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে কেমন আছে শিক্ষক সম্প্রদায়

 কাজী ফারুক আহমেদ ||

আজ ৫ অক্টোবর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, এ বছর সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণারও ৭০ বছর পূর্তি হচ্ছে।

সঙ্গত কারণেই দিনটিতে শিক্ষকদের অধিকার, প্রত্যাশা ও শিক্ষকতায় বিভিন্নমুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে দেশে দেশে শিক্ষক সংগঠনগুলো বক্তব্য তুলে ধরবে।

আলোচনায় উঠে আসবে জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি ৪ বাস্তবায়নে শিক্ষকদের কাম্য ভূমিকাও। ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় উচ্চশিক্ষা সবার অধিকারের আওতায় না এলেও এসডিজি ৪-এ তা বিবেচনায় এসেছে।

কিন্তু সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অথবা এমডিজি থেকে এসডিজি শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে স্পষ্টতর বলা হলেও শিক্ষকদের প্রসঙ্গে যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তাতে তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। সে জন্যই ইউনেস্কো প্রকাশিত গ্লোবাল মনিটরিং রিপোর্ট ২০১৭/৮-তে বলা হয়েছে, ‘এসডিজি লক্ষ্যমাত্রায় ‘যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের কথা উল্লেখ করা আছে, কিন্তু বৈশিক নির্দেশে ‘প্রশিক্ষিত’ শিক্ষকের কথা বলা হয়েছে, এতে এক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। সর্বনিম্ন ডিগ্রিধারী শিক্ষকরাই ‘যোগ্যতাসম্পন্ন’, কিন্তু ‘প্রশিক্ষিত’ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। কয়েকটি দেশের শিক্ষকতায় প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় শর্তের দিক থেকে এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে এ দূরত্ব সবচেয়ে বেশি; জ্যামাইকার মাধ্যমিক স্কুলে ১৫ শতাংশ শিক্ষক ‘যোগ্যতাসম্পন্ন’ এবং ৮৫ শতাংশ ‘প্রশিক্ষিত’। বৈশ্বিক শিক্ষা পরীবিক্ষণ প্রতিবেদন ২০১৬-এ ‘শিক্ষক’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: “এসডিজি শিক্ষকদের ‘বাস্তবায়নের হাতিয়ার’ বলে মনে করে, এ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে মৃদু ক্ষোভ আছে। এবং এর ফলে এই পেশার মৌলিক অবদানকে ছোট করে দেখার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ শিক্ষকরাই মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান একটি ইতিবাচক শিখন পরিবেশ গঠনে অবদান রাখেন। শিক্ষকদের মূল সমস্যা সম্পর্কে সীমিত ধারণা থাকার জন্য এ অভিলক্ষ্য প্রণয়নে দুর্বলতা থেকে গেছে।”

দেশে দেশে শিক্ষকরা কেমন আছেন?

সাধারণভাবে আমাদের দেশে শিক্ষকদের একটা অংশের মধ্যে এমন ধারণা আছে যে, অন্যান্য দেশে এ পেশার মানুষরা তাদের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় আছেন। আসলে একটি দেশের অবস্থার সঙ্গে অন্য দেশের অবস্থার মিল বা অমিল খোঁজার কাজটি খুব সহজ নয়। তবে এ কথা বলা সরলীকৃত হবে না বলে মনে করি যে, অধিকাংশ দেশেই শিক্ষকদের পেশাগত অসন্তোষ বা ক্ষোভ রয়েছে। এক আধটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। তেল সম্পদে সমৃদ্ধ ভেনিজুয়েলায় ৮৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশটিতে চরম আর্থিক মন্দা। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি পরিবেশিত সংবাদ অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। তবে যাকে নিয়ে সংবাদ, তিনি নিজে সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, অর্থাভাবে তিনি নতুন জুতা কেনা দূরের কথা ছেঁড়া জুতা মেরামত করতে পারছেন না। তার জুতার দুটো সুকতলা ক্ষয়ে গেছে। ৪১ বছর বয়সী ওই শিক্ষকের নাম ইবারা। ভদ্রলোক ভেনিজুয়েলা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। যে ইউরোপ, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য থেকে আমরা এ উপমহাদেশে উচ্চশিক্ষার পাঠ গ্রহণ করেছি, সেখানে শিক্ষকদের অবস্থা কেমন? ২০১৬ সালের ১৩ জুলাই ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে তেরেসা মে বলেন, ‘আপনি যদি সাধারণ শ্রমজীবী পরিবার থেকে এসে থাকেন তাহলে বলতে হবে আপনার জন্য জীবনযাত্রা নির্বাহ সত্যই কঠিন। আপনার শিশুকে ভালো একটা স্কুলে ভর্তি করা কষ্টকর বৈকি।’ এ তো গেল প্রধানমন্ত্রীর কথা। ২৮ বছর শিক্ষকতায় নিয়োজিত, ১৩ বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনকারী এক শিক্ষক বলেন, পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় করা না গেলে স্কুল শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব স্কুলমাস্টার্স ইউনিয়ন অব উইমেন টিচার্স (এনএএসইউডব্লিউটি) ২০১৭ সালে ১১ হাজার শিক্ষকের ওপর পেশাগত ক্ষোভ ও সন্তুষ্টি নিয়ে এক জরিপ চালায়। তাতে দেখা যায়, ৭৯ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, তাদের বেতন-ভাতা সমান যোগ্যতার অন্য পেশার মানুষের মতো নয়। ৬৯ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, কম বেতনের কারণে অনেকে শিক্ষকতা ছেড়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষকদের এক পর্যালোচনা রিপোর্টে জানা যায়, আর্থিক সুবিধাদি আকর্ষণীয় না হওয়ায় মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসছে না। যারা শিক্ষকতায় আছেন তারাও সুযোগ পেলেই পেশা ত্যাগ করছেন। কানাডার শিক্ষকরাও প্রচলিত বেতন কাঠামোয় সন্তুষ্ট নয়। তবে এসব নেতিবাচক তথ্য সত্ত্বেও গবেষক, ব্যতিক্রমী উদ্ভাবক শিক্ষকদের কদর কম নয়।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

উপরে যেসব দেশের নাম উল্লেখ করেছি তার প্রতিটিতে শিক্ষকরা সংগঠিত। তাদের সংগঠনের কার্যক্রম শুধু পেশাগত দাবি আদায়ের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নয়। ওইসব সংগঠন থেকে নিয়মিত জরিপ ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং সদস্য শিক্ষকরাও সংগঠনের সুবাদে নানারকম প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। আমাদের দেশের সঙ্গে কোনোভাবেই তার তুলনা চলে না। তারপরও তারা কতখানি ক্ষুব্ধ উল্লিখিত বর্ণনা তারই সাক্ষ্য দেয়। বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশায় সমস্যা অন্তহীন। বেতন-ভাতা, পদোন্নতিতে মোটামুটি সরকারি খাতের অগ্রাধিকার। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য দূর করার কথা আছে। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে যেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে তার প্রতি আচরণ বিমাতাসুলভ। অন্যদিকে গত চার দশকে বাংলাদেশে শিক্ষকদের অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে, এটা ঠিক। তবে সময় ও বিশ্বের তুলনায় তা এখনও আশাব্যঞ্জক নয়। এখনও মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসছে না। অভিজ্ঞ শিক্ষকরা অবসরে চলে যাচ্ছেন। এসব শূন্যস্থান যথাযথভাবে পূরণ হচ্ছে না। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। অতি সম্প্রতি ইউনেস্কো জাতীয় শিক্ষকনীতি প্রণয়ন, প্রধান শিক্ষককে প্রধান করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের যে নির্দেশনা দিয়েছে এবং জাতিসংঘ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের যে ১৭টি লক্ষ্য ঘোষণা করেছে তার মধ্যে ৪ নম্বর যা শিক্ষার্থী, শিক্ষক উন্নয়ন ও শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু বিভিন্ন দেশের শিক্ষক সংগঠনগুলোর মতো এখনও তাদের সেভাবে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে না।

এদিকে মোবাইল ফোন ও ফেসবুক ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ মনে করলেও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে শিক্ষকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তথ্যপ্রযুক্তি আয়ত্তে স্বচ্ছন্দ বা অভ্যস্ত নয়। আবার শিক্ষার্থীদের একটা অংশ অতিমাত্রায় প্রযুক্তিতে ঝুঁকে পড়ায় শিক্ষকের কাছ থেকে প্রাপ্য মানবিক আবেদন সংকুচিত হয়ে পড়ছে বলে কেউ কেউ মত প্রকাশ করছেন। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা মিলিয়ে শিক্ষকের সংখ্যা লাখ দশেক। এদেরই একটি ক্ষুদ্রাংশ, যারা মোট শিক্ষকের এক শতাংশের ধারে কাছেও নয়, তাদের অশিক্ষকসুলভ ও গর্হিত অনৈতিক আচরণ গোটা শিক্ষকসমাজের ওপর কালিমা লেপন করছে। শুধু সরকার অথবা কর্তৃপক্ষের নয়, শিক্ষক সংগঠনগুলোরও এ ক্ষেত্রে করণীয় আছে। কিন্তু তারা তা কতটুকু করছেন? প্রকৃতপক্ষে শিক্ষক, অভিভাবক, প্রশাসক সবারই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসা দরকার। এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্যে শিক্ষককে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা অধিকার প্রতিষ্ঠার যে আহ্বান ইউনেস্কো থেকে এসেছে তার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদ্যাপন জাতীয় কমিটির উদ্যোগে আজ ৫ অক্টোবর বেলা ৩টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট প্রাঙ্গণে ‘শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতে চাই শিক্ষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা’ প্রতিপাদ্যে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংগঠন, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় শিক্ষা সংস্থার প্রতিনিধিরা র‌্যালি করবেন ও বিকাল ৪টায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে কৃতী শিক্ষকদের সম্মাননা, সৃজনশীল ও সাহসী শিক্ষার্থীকে স্বীকৃতি প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। ইউনেস্কো, আইএলও, ইউনিসেফ, গণসাক্ষরতা অভিযান, ইউসেপ, আহছানিয়া মিশন, ব্লাস্ট, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজশিক্ষক প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। আশা করা যায়, আন্তর্জাতিক সমাজের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এ মহতী অনুষ্ঠান থেকে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে সমবেত উদ্যোগ গৃহীত হবে।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : বিশ্ব শিক্ষক দিবস জাতীয় উদ্যাপন কমিটির সমন্বয়ক, জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য

একই ধরনের আরও সংবাদ