অধিকার ও সত্যের পক্ষে

বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর

 মীম নোশিন নাওয়াল খান ||

খুব ছোট থাকতে ফ্রক পরে ঘুরে বেড়াতাম। ফ্রক পরার সবচেয়ে কঠিন ব্যাপারটা ছিল চেইন লাগানো। সেই চেইন লাগানোর কৌশল আমাকে প্রথম যিনি শেখান, তিনি আমার মাম। দাঁত ব্রাশ করতে শেখানো, নিজে হাতে ভাত মাখা, কাঁটা বেছে মাছ খাওয়া থেকে শুরু করে আজকে নিজে হাতে রান্না করা- মামের কাছে শিখতে শিখতে কীভাবে যেন এই পৃথিবীতে ১৭ বছর পার করে ফেললাম!

খুব ছোট থাকতে ধারণা ছিল, ভয়ঙ্কর কোনো অসুখ হলে ক্যাপসুল খেতে হয়। তো, একবার আমাকেও ডাক্তার ক্যাপসুল খেতে দিয়ে দিল! ক্যাপসুল দূরে থাক, আমি তো ট্যাবলেটই খেতে পারি না! কলার ভেতর ক্যাপসুল ভরে আমাকে খাওয়ানোর বুদ্ধিটা মামের মাথা থেকে বেরুল। আমি খুব অবাক হয়ে ক্যাপসুলটা দেখিয়ে বললাম, এটা তো প্লাস্টিক! প্লাস্টিক খেয়ে ফেলব?!
প্লাস্টিকটা কীভাবে পেটের ভেতরে গিয়ে গলে যাবে, সেটা আমাকে প্রথম যিনি দেখান, তিনি আমার বাপি। ক্যাপসুলটা খুলে প্রথমে দেখালেন, তার ভেতর কত ছোট্ট ছোট্ট সুইট বলের মতো জিনিস! তারপর দেখালেন কীভাবে ক্যাপসুলের খোসাটা গলে যায়! প্রচণ্ড বিস্ময় নিয়ে আমার তখন মেডিক্যাল সাইন্স বুঝতে শেখার শুরু। গত ১৭ বছরে মেডিক্যাল সাইন্স থেকে শুরু করে মানবিক গুণাবলি গঠনের বিদ্যা কিংবা লাইফ সাইন্স- কোনোকিছুই শেখাতে বাদ রাখেননি বাপি। প্রতি মুহূর্তে শিখছি।

ছোট হলেও টিং, অর্থাৎ আমার ছোট ভাই জাওয়াদ আমাকে প্রতি মুহূর্তে ভালোবাসতে শেখায়। স্কুলের ফ্রেন্ডের কাছ থেকে পাওয়া একটা টফিও কীভাবে বাসায় এনে দুইভাগ করে আপুকে দিয়ে খেতে হয়, সেটা ওর কাছ থেকেই শিখেছি। কলেজের ফেস্টে সারাদিন না খেয়ে থাকি, লাঞ্চটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখি দুই ভাইবোন একসাথে খাবো বলে। এভাবে ভালোবাসতে শেখা তার কাছ থেকেই।

কোন পাখিটা ঘুঘু আর কোনটা পায়রা- সেটা প্রথম শিখি নানুর কাছ থেকে। সেই শিক্ষা থেকে শুরু করে গতকাল বাতাবিলেবু কেনার সময়ে কীভাবে ভালো এবং মিষ্টি বাতাবিলেবু চেনা যায়- সেই শিক্ষা নেয়া পর্যন্ত অসংখ্য মজার মজার এবং প্রয়োজনীয় জিনিস শিখেছি নানুর কাছ থেকে।

পরিবারের সবার কথা বলতে গেলে শেষ হবে না। তাদের কথা বলবও না আর।

আমাকে যে কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করা হয়, সেখানে আমার অংক টিচার ছিলেন রাসেল স্যার। আরো ছিলেন সাইফুল স্যার, ইংলিশ টিচার কামাল স্যার। কামাল স্যারের কোলে বসে থাকা আর সাইফুল স্যার-রাসেল স্যারদের কথা মুগ্ধতা নিয়ে শোনার দিনগুলো অস্পষ্টভাবে স্মৃতিতে গেঁথে আছে।

আমাদের ডায়েরি লিখে দিতেন ইউনুস স্যার। আমাকে প্রচণ্ড আদর করতেন, কিন্তু আমি তাঁকে দেখলেই ভয়ে দৌড়ে পালাতাম!
আজ অনেক বছর কেটে গেছে। সেই টিচারদেরকে হারিয়ে ফেলেছি। খুঁজে পাই না আর। ইউনুস স্যারের সঙ্গে শুধু যোগাযোগ আছে। আজ আর দৌড়ে পালাই না, বরং বারবার ফিরে আসতে চাই।

ভিকারুননিসা জীবনে অনেক টিচার পেয়েছি। সবার কথা বলে শেষ হবে না। তবে তাজিন মিস, ফ্যান্সি মিস, কাকলী মিস, কামরুন মিস, আফজা মিস, মোনা মিস- তাঁদের প্রতি তৈরি হওয়া শৈশবের মুগ্ধতা আজও কাটেনি।
হাইস্কুলে ওঠার পর ফারহানা মিস নামক একজন মা পেলাম। আমার মামের পর যদি কারো সাথে আমি সবচেয়ে বেশি ফ্রি হয়ে থাকি, সেটা আমার বাপিও না, সেটা হচ্ছেন ফারহানা মিস! দুষ্টুমি, খুনসুটি, আহ্লাদ-আবদার থেকে শুরু করে এমন কিছু নেই যা আমি মিসের সঙ্গে করি না। এরকম একজন মাদারলি ফিগার আমি আর কখনোই খুঁজে পাইনি, জানি না আর কখনো পাবোও কিনা।
মিসের প্রতিটা কথাই জীবনের জন্য শিক্ষা। যেভাবে মিস মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন শিখিয়েছেন, আমার মনে হয় না কোনো টিচার কখনোই না পারবেন বা করবেন। ড্রাগ অ্যাডিকশন পড়াতে গিয়ে প্রতিটা ড্রাগের চেহারার বর্ণনা দিয়েছেন মিস। মিস বলতেন, ড্রাগ খারাপ মানেই এটা না যে তুমি সেটা সম্পর্কে জানবে না। না জানলে তুমি সচেতন কীভাবে হবে? সচেতনতার জন্য জানতেই হবে! নিঃসংকোচে সোশ্যাল ট্যাবু জাতীয় ব্যাপারগুলো ক্লাসে শিখিয়েছেন মিস।
ঘরের পাক্কা গৃহিণী থেকে পর্বতারোহী সাহসী নারী- পৃথিবীর প্রতিটা জায়গায় নিজের বিজয় চিহ্ন এঁকে দেয়ার মন্ত্র শিখিয়েছেন এই মানুষটাই।

ইংলিশ ভার্সনের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড মিস্ট্রেস নীরা মিস আমার জীবনের আরেকটা ধ্রুবতারা। লিখতে গেলে খাতা শেষ হবে, লেখা শেষ হবে না। ফিরোজা মিস, নাজনীন মিস, মিল্কি মিস, স্বপ্না মিস, ইয়সমিন মিস, রুমেনা মিস, জহুরুল স্যার, হাসান স্যার, হাই স্যার, রহমতউল্লাহ স্যার, নম্রা মিস, লায়লা মিস- আমার জীবনে এই টিচারদের ভূমিকা বলে শেষ করা যাবে না।

আমাদের একজন প্রিন্সিপাল ছিলেন মঞ্জু আরা মিস। এই মানুষটাকে দেখে শিখেছি এত বড় একটা প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল হয়েও কতটা বিনয়ী হওয়া যায়। আজও মিস আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন পরম মমতা নিয়ে।

স্কুল পেরিয়ে কলেজে এসেছি। কিন্তু এই টিচারদেরকে আজও জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছি পরম শ্রদ্ধায়।

কলেজে উঠে চট করে নতুন একটা পরিবেশ, নতুন টিচারদের সঙ্গে মানিয়ে নেয়াটা যখন কঠিন হয়ে উঠেছিল, দু’হাত বাড়িয়ে স্কুলের টিচারদের মতো মায়ের স্নেহে প্রথম যিনি আগলে নিয়েছিলেন, তিনি হচ্ছেন লক্ষ্মী মিস। সদ্য কলেজে ওঠা একটা মেয়ের প্রথম আশ্রয়স্থলকে কি মেয়েটা কখনোই ভুলতে পারবে?
প্রথমবার কলেজে যেই টিচার আমাকে বুকে টেনে মায়ের গায়ের গন্ধের স্বর্গীয় অনুভূতি পাওয়ার সুযোগ দেন, তিনি শীলা মিস।

বায়োলজির মতো অপছন্দের সাবজেক্টের ক্লাসটার পুরো ৪৫ মিনিট গভীর মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করার মতো অসাধ্য সাধনের পেছনে যেই মানুষটা আছেন, তিনি আমাদের এক ও একমাত্র নাসিম মিস।

একজন আদর্শ মানুষের অবতার হয়ে আমার কলেজ জীবনে সব মঙ্গল, কল্যাণ ও শুভ্রতার আধার নিয়ে সবসময় পেয়েছি ম্যাথসের নাসরিন মিসকে। মন খারাপ হলে হাউমাউ করে কাঁদা কিংবা ছেলেমানুষি উচ্ছ্বাসে লাফানো- সবসময় মিসকে পেয়েছি মায়ের মতো শুধু নয়, বেস্ট ফ্রেন্ডের মতো।

তাসকিয়ার আচমকা মৃত্যুর পর আমাকে টেনে তোলার পেছনে যেই মানুষগুলোর অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল, তাদের মধ্যে একজন স্ট্যাটের শাহনাজ মিস।

আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে বিনয়ী, নরম এবং সুইট মানুষ সম্ভবত ফিজিক্সের জিনাত মিস। এই পৃথিবীতে কখনোই আর এমন একজন মানুষ পাব বলে মনে হয় না।

আমার সাবজেক্ট টিচার না হলেও আসাদ স্যারের কাছ থেকে পাওয়া বাবার মতো স্নেহ, স্যারের মজার মজার কথা- এগুলো নিঃসন্দেহে জীবনের অনেক বড় পাওয়া।

রাফি স্যারের মোহাবিষ্ট করে রাখা কণ্ঠ, বদরুল স্যারের পানির মতো করে কেমিস্ট্রি শেখানো, ফরহাদ স্যারের পার্সোনালিটি, ফেরদৌসী মিসের পার্সোনালিটি, বার্বি ডলের মতো মার্জিয়া মিস, ফারহানা মিস, আসমা মিস, কুসুম মিস, স্বপ্না মিস, ফারুক স্যার, ডালিয়া মিস, জেবুন মিস, মুনমুন মিস, তাপসী মিস- প্রতিটা টিচারই আমার জীবনে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে অনন্য তাৎপর্য নিয়ে বিরাজমান।

কিছুদিন আগে কলেজে কয়েকজন নতুন টিচার এসেছেন। বিদায়বেলায় এসে পাওয়া নতুন টিচাররা এত অল্প সময়ে জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন, ভাবিনি।

মেহেদী স্যার, ইমরান স্যার, সুমন স্যার, সোনিয়া মিস, রাব্বানী স্যার, জাফর স্যার- কারো ক্লাস পেয়েছি তিন-চারটা, কারো সাথে কোনো ক্লাসই পাইনি। কিন্তু নির্দ্বিধায় বলতে পারি, জীবনে চলার পথে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে সবসময়ই থাকবেন এই টিচাররা। অল্প সময়ের মধ্যে স্নেহ-মমতা আর সহযোগিতার যে বিরল দৃষ্টান্ত এই টিচাররা রেখেছেন, তা আমাকে আরো ভালো মানুষ হওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়ে চলেছে।

আমার বয়সী আমারই ব্যাচমেট যে ছেলেটা প্রতি মুহূর্তে তার প্রতিটা কাজে ভালোবাসার নতুন নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে যাচ্ছে, তার কাছ থেকে শিখছি ভালোবাসার অদম্য শক্তি, আর নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারার বিরল গুণ।

ছোটবেলা থেকে যারা ছিল ক্লাসে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী, সেই অরুন্ধতী, মাইশাদের কাছ থেকে জীবনকে উপভোগ করতে শিখছি প্রতিনিয়ত।

প্রশংসার জলে ভেসে না গিয়ে হাঁসের মতো গা থেকে প্রশংসার জল ঝেড়ে ফেলে নিজের মতো সাঁতার কেটে চলা শিখেছি দীপু আংকেল, অর্থাৎ বাবাংকেলের কাছ থেকে।

রেলস্টেশনে বা ফুটপাথে আমার যে বাচ্চাগুলো রাতের রাতের রাত কাটিয়ে দেয়, আমাকে দেখে যারা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে, ওদের কাছ থেকে শিখেছি জীবনে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা।

দৈর্ঘ্যে ছোট এই জীবনে অনেক অনেক মানুষকে পেয়েছি শিক্ষক হিসেবে। কত মানুষের কথা বলতে পারলাম না! তবুও পোস্টটা অনেক বড় হয়ে গেল! খুব খুব প্রিয় এবং আমার জীবনে খুব বেশি অবদান রাখা অনেক অনেক মানুষের কথা লিখতে পারিনি। তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
কিন্তু সবশেষে যেই একজনের কথা না বললেই নয়, সে আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক, এই পৃথিবীতে চলার পথে আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী। আমাদের ভাষায় যাকে বলে বয়ফ্রেন্ড। সে হচ্ছে আমার নিজের জীবন। আমার জীবনই আমার বয়ফ্রেন্ড! জীবন আমাকে প্রতি মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি শেখাচ্ছে, প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকার মর্ম উপলব্ধি করতে শেখাচ্ছে, আমাকে দিচ্ছে উপরের মাএনুষগুলোর মতো চমৎকার উপহার। জীবনের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। জীবনের কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলোর মধ্যে একটা হলো, জীবন আমাকে শিখিয়েছেঃ
যতদিন এই পৃথিবীতে বাঁচবে, ছয়টা জিনিসকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিও প্রতি মুহূর্তে-
1। Love unconditionally. Love everyone- your friends, your enemies, flowers, wind, rivers, butterflies, the earth- everyone. Keep loving but never expect anything in return.
2। Try to be loved by as many as possible. Try to be loved by your friends, your enemies, flowers, wind, rivers, butterflies, the earth- everyone. Gain as much love as you can because at the end of the day, that is what remains as your belongings.
3। Gain experience and make memories. No matter whether its good or bad, taste every experience you can.
4। Listen to your heart first.
5। Never stop chasing your dreams.
6। Your time in this world is limited. So be happy always. Do anything and everything that keeps you happy.

যাই হোক। মাম, বাপি, টিং, নানু, দাদু, মামা-খালামণিরা, চাচা-ফুপিরা, স্কুল এবং কলেজের টিচাররা, বন্ধুবান্ধবরা, শুভাকাঙ্খী ও চলার পথে পাওয়া অসাধারণ মানুষেরা এবং সবশেষে জীবন- আমার শিক্ষক হয়ে সবসময় পাশে থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা সবার প্রতি।
Happy Teachers’ day to all of you, my favorite teachers.

 

লেখক|| মীম নোশিন নাওয়াল খান

ভিকারুননিসা নূন কলেজ, দ্বাদশ শ্রেণি, বিজ্ঞান (ইংলিশ ভার্সন)।

একই ধরনের আরও সংবাদ