অধিকার ও সত্যের পক্ষে

কুসংস্কৃতির নাম ‘র‌্যাগিং’

 একেএম শাহনাওয়াজ

বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। কঠিন ভর্তিযুদ্ধে জয়ী হয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হবে। পরবর্তী স্বপ্ন পূরণের নানা পরিকল্পনা নিয়ে পা রাখবে বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারা সন্তানদের জন্য গর্বিত বাবা-মায়েরা নতুন করে স্বপ্ন বুনবে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে। স্বাধীনতার আগে এবং পরেও সমাজের মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মানসিকভাবে বিশিষ্ট নাগরিক ভাবত। ওদের প্রতি একটি আলাদা সম্ভ্রম ছিল সবার মধ্যে। শিক্ষার্থীদের আচরণও হতো একটু আলাদা। নিজেদের অনেক বেশি পরিশীলিত রাখার সযত্ন প্রয়াস থাকত। আমি স্মরণ করতে পারি ১৯৭০ সালে কুমিল্লার হোমনা হাইস্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়েছিলাম বড় বোনের তত্ত্বাবধানে। নারায়ণগঞ্জ থেকে হোমনা যাওয়ার একমাত্র বাহন ছিল লঞ্চ। সে সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্যান্ট-শার্ট-চামড়ার জুতো পরা ফিটফাট মানুষ খুব বেশি চোখে পড়ত না। মনে পড়ে লঞ্চের আপার ক্লাসে কখনও প্যান্টে শার্ট ইন করে চকচকে চামড়ার জুতো পরা তরুণ এলে একটি ভিন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হতো। আদর, স্নেহ ও সম্ভ্রমের সঙ্গে অন্য যাত্রীরা বসার ব্যবস্থা করে দিত তরুণদের। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে জানতাম এরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। যাত্রীরা তাদের কাছ থেকে জানতে চাইত ঢাকার পরিস্থিতি। দেশের ভবিষ্যৎ। আমার চোখে ওদের কথা বলার ধরন আলাদা মনে হতো। কত বিনয়ী, কত মার্জিত!

সময় অনেক পাল্টে গেছে। আমার এক সাবেক ছাত্র বছর দুই আগে বলছিল, ‘স্যার এখন বাসে-ট্রেনে, পথে-ঘাটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরিচয় গোপন রেখে চলি। জানলে লোকে কেমন যেন বাঁকা চোখে তাকায়। হয়তো ভাবে আমি সন্ত্রাসী কিনা, চাঁদাবাজি-দলবাজি করি কিনা!’

সবকিছু আমরা উদারভাবে ভাবতে চাই। ছাত্ররা গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রজন্ম হিসেবে বেড়ে উঠুক তেমনটি কেউ চাই না। তবুও মাঝে মাঝে নতুন করে ভাবতে ইচ্ছা হয়। মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানত মেধা চর্চার জায়গা। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালকে ঘিরেই গড়ে ওঠে সাংস্কৃতিক বলয়। আমরা যখন ১৯৭৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন শিক্ষকরা বলতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পোশাকে-চলনে, কথা বলায় স্মার্ট হবে। ডাইনিংয়ে কখনও লুঙ্গি পরে আসবে না। আমাদের মধ্যে মিশ্র ভাবনা হতো। ভাবতাম এমন সাহেবি চলন হবে কেন! আমাদের সময় হলের সিকবয়রা ছাত্রদের স্যার বলত। এখন তো সর্বত্র মামা কালচার বিরাজ করছে। এর ভালো-মন্দ নিয়ে তর্ক করব না। তবে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলাদা ভাবনা তো ভাবতেই হয়। যেমন বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের কর্তব্য হিসেবে প্রথমেই বলা হয় শিক্ষকের দায়িত্ব হচ্ছে পড়ানো এবং গবেষণা করা। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান সৃষ্টির জায়গা। ফলে এ অঞ্চলের পরিবেশ ও প্রস্তুতি তো আলাদা হতেই হবে।

অথচ এমন পরিশীলিত-পরিমার্জিত জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান কি এখন নিজের উজ্জ্বল অবস্থান ধরে রাখতে পারছে? প্রথমত অপরাজনীতি ছাত্র-শিক্ষকের প্রত্যাশিত চেহারাকে নিষ্প্রভ করে দিচ্ছে প্রতিদিন। অনেক শিক্ষার্থীর (শিক্ষকেরও) পোশাকে, চলায় এবং বাচনে সপ্রতিভ সৌন্দর্য এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। মনকেও আন্দোলিত করে না। অন্যদিকে সবকিছুকে ছাপিয়ে বিগত বেশ কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নতুন ভর্তি হওয়া সতীর্থদের র‌্যাগ নামে আসুরিক, অসংস্কৃত, নিবর্তনমূলক অত্যাচার করে পৈশাচিক আনন্দ লাভ করছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থাকা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হবে। যা শুনে আমারই ধন্দ লাগে এসব সিনিয়র ছেলেমেয়েরা কি একটি ভদ্র, সম্ভ্রান্ত পারিবারিক পরিবেশ থেকে বিশ্ববিদ্যলয়ে পড়তে এসেছে! আমরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে এদের সংস্কৃতবান করে তুলতে পারিনি। কখনও কখনও নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। এক অভিভাবকের করুণ আর্তি আমার কানে বাজে। পরিচয়ের সূত্র থাকায় তিনি জানালেন, স্যার, দয়া করে আমার ছেলেটিকে রক্ষা করুন। অমুক হলে উঠেছে সে। সিট পায়নি। গণরুমে থাকে। কদিন আগে তার সদ্য ভর্তি হওয়া ছেলেটিকে মাঝরাতে ডেকে নিয়ে গেছে সিনিয়ররা। অভিযোগ- ও নাকি কাকে সালাম দেয়নি। ওকে শাস্তি হিসেবে একশ’বার কান ধরে ওঠবস করতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক এদো ডোবায় নামিয়ে আধ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছে। আমার ছেলেটি এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ও বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে আসতে চাইছে।

র‌্যাগ দেয়ার নাম করে উচ্ছৃঙ্খল, অভব্য এসব ছেলেমেয়ে অমন কাণ্ডে যুক্ত থাকার দুটো কারণ নাকি ব্যাখ্যা করে। প্রথম কারণ, প্রথমবর্ষে ভর্তি হওয়ার পর ওরাও নাকি সিনিয়রদের কাছ থেকে ‘র‌্যাগ খেয়েছে’। এখন চিরকালীন বউ-শাশুড়ির ঝগড়ার মতো ছোটদের ওপর দিয়ে শোধ তুলছে। আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, ওরা এসব করে নাকি জুনিয়রদের স্মার্ট করে তুলতে চায়। অবশ্য বুঝতে পারলাম না নবাগতদের স্মার্ট বানানোর দায়িত্ব ওদের কে দিয়েছে। নিজে সাংস্কৃতিক বোধহীন, অমানবিক আর অপদার্থ হয়ে আরেকজনকে কেমন করে স্মার্ট বানাবে তা বোঝা গেল না।

কেমন করে র‌্যাগিং নামের কুসংস্কৃতি আমাদের তরুণদের মধ্যে ঢুকে গেল বুঝতে পারলাম না। আমাদের সময় স্নাতকোত্তর শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার আগে বিদায়ীরা র‌্যাগ উৎসব করত। এখনও এ সংস্কৃতি চালু আছে। শব্দের মিল থাকলেও র‌্যাগিং এখন যে আতঙ্ক ও অভব্য আচরণের নামে ভয়ংকরভাবে দেখা দেবে তা ১৯৯০-এও এ দেশের তরুণরা জানত না। ১৯৯০-এ আমি ভারতে গবেষণার কাজে ছিলাম। তখন সেখানে প্রথম র‌্যাগিংয়ের কথা শুনি। প্রথমদিকে বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে এ অশুভ প্রচ্ছায়া পড়ে। সম্ভবত খড়কপুরের এক আইটি কলেজে র‌্যাগিংয়ের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে একজন নবাগত ছাত্র ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। তখন ভারতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে তোলপাড় হয়। বুদ্ধিজীবীরা সরব হয়েছিলেন। এরপর প্রচণ্ড নিন্দা ও চাপের মুখে র‌্যাগিংয়ের পৈশাচিকতা কমে আসে ভারতে। এরপর এ পূতিগন্ধময় কুসংস্কৃতি গ্রহণ করে আমাদের দেশে কতিপয় সংস্কৃতিবোধহীন তরুণ। অথচ নবাগত সতীর্থদের প্রতি সহযোগিতা আর স্নেহের হাত বাড়িয়ে দেয়ার কথা ছিল সিনিয়রদের।

আমার মনে পড়ে ১৯৭৮-এর শুরুতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে এসেছিলাম। সে সময় ভূগোল বিভাগের এক বড়ভাই আমাকে সাহায্য করেছিলেন। একদিন পর অ্যাডমিট কার্ড নিতে হবে। বড়ভাই বললেন তিনি উঠিয়ে রাখবেন। পরীক্ষার দিন যাতে আমি নিয়ে যাই। পরীক্ষার দিন আগেভাগে তার হলে যাই। দেখি করিডোরে সহাস্য মুখে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। অ্যাডমিট কার্ডটি হাতে। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের আগেই একটি সুখস্মৃতি উপহার দিয়েছিলেন কাশেম ভাই।

ভর্তির পর হলে আসার প্রথমদিকের দিনগুলোর কথা ভুলতে পারি না। আলবেরুণী হলের ৩০৯ নম্বর রুমে এলাম। আমার রুমমেট মাস্টার্স সদ্য শেষ করা বড়ভাই। আর কিছুদিন থাকবেন। দু-তিন দিনেই তিনি বুঝলেন আমি পড়–য়া ছাত্র। তাই আমার সুবিধার জন্য প্রায়ই বন্ধুদের রুমে রাত কাটাতেন। পাশের রুমে ছিলেন আমার দুই বছরের সিনিয়র পদার্থবিজ্ঞানের আতাউর ভাই। প্রথমদিনই আমার সঙ্গে পরিচিত হলেন। বিকালে নিচে নিয়ে গেলেন। আমাকে দেখিয়ে দিলেন কোথায় ডাইনিংয়ের খাবারের কুপন পাওয়া যাবে। কোথায় হলের কমনরুম। ক্যান্টিন চিনিয়ে দিলেন। পরদিন ক্লাস শেষে আমাকে নিয়ে গেলেন সেন্ট্রাল লাইব্রেরি চেনাতে। কেমন করে ক্যাটালগ দেখতে হয়, কেমন করে লাইব্রেরি কার্ড দিয়ে বই তুলতে হয় সবকিছু বুঝিয়ে দিলেন। আমাদের সময়ে সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কটি এমনই ছিল।

আমি ভেবে পাই না র‌্যাগ দিয়ে বীরত্ব প্রদর্শন করা এসব তরুণ-তরুণীরা পরবর্তী সময়ে কোন মুখে এক সময়ের জুনিয়রদের সামনে দাঁড়াবে! বছর তিনেক আগের কথা, আমার এক সাবেক ছাত্র এলো। একটি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার। বললাম ছাত্র থাকতে তো বেশ দাপটে ছিলে। র‌্যাগ দেয়ার অভিযোগও ছিল তোমার বিরুদ্ধে। এখন কৃতকর্মের জন্য খারাপ লাগে না? নত মস্তকে ছেলেটি বলল, স্যার লজ্জা ও বিব্রতকর অবস্থার কথা কী বলব! এখন আমার শাখায় ম্যানেজার হয়ে যিনি জয়েন করেছেন তিনি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বছরের জুনিয়র। র‌্যাগিংয়ের নামে ওর ওপর অত্যাচার করেছিলাম আমি। এখন তো স্যার তার সামনে চোখ তুলে তাকাতে পারি না।

র‌্যাগিংয়ের কু-সংস্কৃতিতে যুক্ত আমাদের একশ্রেণীর তরুণ কবে সভ্য আর সুরুচিবান হতে পারবে আমি জানি না। একটি সাম্প্রতিক সুখস্মৃতির কথা বলে লেখাটি শেষ করব।

আমার মেয়ে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টের কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। ওকে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলাম। ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ দিনব্যাপী নতুনদের ওরিয়েন্টেশন হবে সেখানে। যে ভবনে রেজিস্ট্রেশন হবে তা চিনে আসতে ১১ তারিখে আমরা বাপ-মেয়ে গেলাম। প্রায় তিন হাজার বিদেশি ছাত্রছাত্রী এসেছে এবার। এদের সবার সহযোগিতা করার দায়িত্ব নিয়েছে সিনিয়র ছাত্রছাত্রীরা। গায়ে ব্যাজ লাগান। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে চারপাশে। এক একজন নবাগতকে দেখতেই ছুটে আসছে। জানতে চাইছে কী সহযোগিতা লাগবে। ভবনের ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম একপাশে তিনজন ছাত্রছাত্রী টেবিলের ওপর একটি খাবারের ডিশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সহাস্য মুখে আমাদের ডাকল। এদের একজন মুম্বাইয়ের ছেলে, একজন চায়নার মেয়ে, আরেকজন আইরিশ তরুণী। ভাবলাম খাবার বিক্রি করে। গরুর মাংসে আলুর ঘণ্ট করে একটি আইরিশ ডিশ বানিয়েছে। কাগজের গ্লাসে করে খেতে দিল। বেশ সুস্বাদু। আমি আরেক গ্লাস চেয়ে নিলাম। জানলাম, বিক্রি নয়- নবাগতদের জন্য ওদের শুভেচ্ছা উপহার। এভাবে বিভিন্ন জায়গায় সিনিয়ররা যার যার সাধ্যমতো শুভেচ্ছা উপহার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সিনিয়র-জুনিয়রদের অমন সম্পর্ক- বিশেষ করে নবাগত সতীর্থদের প্রতি সিনিয়র ছাত্রদের দায়িত্ব-কর্তব্য দেখে নিজের দিকে আর ফিরে তাকাতে ইচ্ছা হল না। শিক্ষক হিসেবে আমি কি নষ্ট মানসিকতা থেকে ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে আনতে পারছি? যখন ভাবি বিশ্ববিদ্যালয় নাকি একজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যে নাগরিকবোধ তৈরি করে এবং উভয়কে সংস্কৃতিবান হিসেবে গড়ে তোলে, তখন ভাবান্তর হয়- তাহলে আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে অমন গ্রাম্যতা কেন ছড়িয়ে পড়ছে?

লেখক: ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: যুগান্তর

একই ধরনের আরও সংবাদ