অধিকার ও সত্যের পক্ষে

শিক্ষকতা ও রাজনীতি

 জয়দীপ দে শাপলু ||

কাল স্টাফরুমে বসে সহকর্মীদের সাথে আড্ডা পিটাচ্ছিলাম। কথায় কথায় শিক্ষকদের অধিকার ও অপ্রাপ্তির কথা উঠে এসেছিল। আমি তখন কিছু তীর্যক মন্তব্য করলাম। বললাম, ‘আপনাকে এতো সুযোগ সুবিধা দিয়ে কি হবে। রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সাথে আপনার পেশার যোগাযোগ কতটুকু। শিক্ষক ছাড়া দেশ রক্ষা করা যায়, কিন্তু আর্মি পুলিশ ছাড়া সম্ভব। আর সরকারি উচ্চ বেতনের শিক্ষকেরই বা কি দরকার। বেসরকারি শিক্ষক অনেক কম বেতন ও সুবিধা নিয়ে আপনার আমার মতো ছাত্র পড়াচ্ছে না?’ আমার আক্রমণের মুখে সবাই দেখি মিইয়ে গেলো। কেউ নিজের পেশাকে ডিফেন্ড করল না। আমি মনে মনে হাসলাম। একটা রাষ্ট্র বা জাতির সবচেয়ে বড়ো পাহারাদার শিক্ষা। যদি শিক্ষা ‘বিনাসুতা’ দিয়ে একটি জাতি বিনির্মাণ করতে না পারে, সেই জাতি অন্তর্ঘাতেই শেষ হয়ে যাবে। তার উদাহরণ লিবিয়া। এতো সম্পদ ও ঐশ্বর্য্যের পরও তারা আজ ধুকে ধুকে মরছে। যতদিন গাদ্দাফি লাঠির ভয়ে ছোট নৃগোষ্ঠীগুলোকে ঠাণ্ডা রেখেছিল, ততদিন দেশ ঠাণ্ডা ছিল। কিন্তু যেই বন্ধন আলগা হয়ে গেছে, ওমনি সব শেষ।

লাঠির ভয় না দেখিয়ে সব নাগরিককে উন্নত শিক্ষা দেয়া গেলে লিবিয়ার আজ এ অবস্থা হতো না। পাকিস্তান জন্মের পর থেকে বাজেটে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ প্রতিরক্ষায় দিয়ে আসছে। কিন্তু এতো বরাদ্দে কি সে তার প্রতিরক্ষা সুসংহত করতে পেরেছে? ২৪ বছরের মাথায় এক টুকরো খসে পড়ে আপনা থেকেই। বলা হয় দিনের বেলা পাকিস্তানের দুই তৃতীয়াংশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে, রাতের বেলা সেটা হয় এক তৃতীয়াংশ। পাকিস্তান ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ তার জাতিগত গঠন হয়নি। শিক্ষার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য নির্মাণ সম্ভব হয়নি। অথচ দেখুন অল্প জায়গায় সবচেয়ে বেশি জাতিগোষ্ঠী পাশাপাশি থাকার উদাহরণ ইংল্যান্ড। তাদের কিন্তু এ সমস্যা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের কথাও বলা যায়। মূল কথা হচ্ছে শিক্ষা দিয়ে যদি জনগণের মধ্যে ঐক্যের চেতনা আর ন্যায় অন্যায়ের বিভেদ তৈরি করা না যায়, তাহলে সে রাষ্ট্র টিকে না। টিকবে না। লক্ষ্য করে দেখবেন, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির আতুড়ঘর একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীর সবচেয়ে রাজনীতিসচেতন ছাত্র-শিক্ষক এই দেশেই ছিল। বঙ্গবন্ধু এই সচেতনতাকে সম্মান জানিয়ে ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সায়ত্ত্বশাসন ও শিক্ষকদের মতামত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে জাতির জনক পাকিস্তানের ধারাবাহিকতা অগ্রাহ্য করে প্রতিরক্ষা খাতের চেয়ে শিক্ষা খাতে আড়াই কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দিয়েছিলেন। অনেকে অবশ্য এটাই তার কাল হয়েছিল বলে ধারণা করেন। আমরা অনেকেই মনে করি শিক্ষকের কাজ হলো ‌‘এ ফর আপেল, বি ফর ব্যানানা’ পড়ানো। সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। শিক্ষক যদি রাজনীতি সচেতন না হোন, শিক্ষার্থীরাও হবে না।

আর শিক্ষার্থী যদি রাজনীতি সচেতন না হয়, তাহলে সে দেশ ও জাতির জন্য আত্মনিবেদনে প্রস্তুত থাকবে না। এই শিক্ষার্থীই কিন্তু পুলিশ মিলিটারি হয়। দেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ না হলে যুদ্ধের সময় না লড়ে প্রতিপক্ষের সাথে আঁতাত করে দেশকে ডুবাবে। যেমনটা হয়েছিল সাদ্দাম গাদ্দাফীর সেনাবাহিনীতে। আবার পোল্যান্ডে দেখুন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। আর্মি আর যুবকরা নিশ্চিত পরাজয় জেনেও কাধেঁ কাঁধ রেখে যুদ্ধ করেছে দেশমাতৃকার জন্য।

তাই শিক্ষা হলো একটি জাতির প্রতিরক্ষা ও উন্নয়নের ফার্স্ট ফ্রন্টলাইন। রাজনীতির সাথে শিক্ষার সম্পর্ক মৌলিক ও নিবিড়। যে শিক্ষক ক্লাসে তোতাপাখির মতো বইয়ের পড়া আওড়ে যান, তিনি আদতে মৃত শিক্ষক। তার রাজনীতিতে মাথা না ঘামালেও চলবে। তাকে বেতন দেয়া জাতির অনেক অপব্যয়ের মধ্যে একটা। যে শিক্ষক মনে করেন তিনি তার শিক্ষার্থীর মধ্যে উন্নত জীবনের দীপশিখা জ্বালিয়ে যাবেন, তার রাজনীতি সম্পর্কে জানা জরুরি। তার রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অধিকার থাকা আবশ্যক। এটা ব্যক্তিমানুষের স্বার্থে নয়, একটি জাতির স্বার্থে।

 

লেখক || জয়দীপ দে শাপলু || 

একই ধরনের আরও সংবাদ