অধিকার ও সত্যের পক্ষে

শুধু পড়াশুনা নয়, খেলাধূলাও প্রয়োজন

 আনোয়ারা নীনাঃ
ল্যাটিন ভাষায় ” Mens sana in corpore sano”  অর্থ A sound mind in a sound body.  সুস্থ্য দেহে সুস্থ মন। শিক্ষনীয় বিষয় বস্তু আয়ত্ত করা এবং অনুধাবন করার জন্য আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহকে উপযুক্ত পরিবেশ অর্থাৎ দেহ, মন এবং আত্মীক বিকাশের জন্য পরিবেশ অক্ষুন্ন  রাখতে হবে।যেহেতু শিক্ষা একটি জীবন ব্যাপী প্রক্রিয়া । একজন ব্যক্তির শারীরিক মানসিক, নৈতিক, সামাজিক ও আধ্যাত্নিক বিকাশই পরিপূ্র্ণ শিক্ষা।পুঁথিগত বিদ্যা কোনদিনই ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ মানুষ করতে পারে না।

গ্রীক সভ্যতায়ও শিক্ষা ছিল শিশুর পূর্ণ বিকাশের অনুকূলে। তাদের শিক্ষা সম্পর্কে বলা হয় “It was grammatic for the mind and soul gymnastic for the body and oratory for rationalistic. “অর্থাৎ মনের জন্য সৃজন ধর্মী শিক্ষা আর দেহের জন্য ব্যায়াম এবং যুক্তিবাদী হওয়ার জন্য বাগ্মীতা অপরিহার্য । আমাদের দেহের অস্থি, মাংসপেশী ও অন্যান্য অঙ্গের সুষম বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন পরিমিত ব্যায়াম। ইংরেজি প্রবাদ “All  works no play make adull jack boy.”  এমন শিক্ষা আমাদের কাম্য নয়।

জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০ অনুসারে শারীরিক  শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞান এবং চারু-কারুকে পাঠ্য সূচীর অন্তর্ভূক্ত করণের জন্য গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে স্বাগত জানাই।কিন্তু পাঠ্যবইটি মাধ্যমিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ।  তারপর আর কোন পাত্তা নেই।তবে কি শুধু খেলাধুলা, ব্যায়াম, মননশীল বিকাশ, শারীরিক  বিকাশ মাধ্যমিক পর্যায়েই প্রয়োজন?  তারপর আর প্রয়োজন নেই, এটা তো বলা সমীচীন নয়। আর তাই বিষয়টির গুরুত্ব পেয়েও পেল না। খুবই দুঃখ জনক। কেন মাধ্যমিক পর্যায়ে অতিরিক্ত একটি বিষয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে? বলা বাহুল্য শহরের ছেলে মেয়েরা খেলাধুলা করার সুযোগ পায় না।

পড়া লেখার চাপে কোনঠাসা হয়ে আছে। কারণ যেভাবেই হোক এ প্লাস তো পেতেই হবে। খেলাধুলার সনদ তো কোথাও চাওয়া হয় না। খেলাধুলা জানে কি না তাও তো জানা হয় না। কাজেই সকল অভিভাবকের প্রত্যাশা একটাই এ প্লাস। যে সময়টা তাদের খেলাধুলা করার সে সময়টা কাটাতে হয় কোচিংয়ে বা প্রাইভেট টিউটরের সামনে বসে। এমন কি বাসায় মায়েরা রান্না করার সময়টা ও পাচ্ছে না। সকালের নাস্তা দুপুরের খাবার সবই করতে হচ্ছে কোন ফার্স্ট ফুডের দোকানে ও রেস্টুরেন্টে।কিন্তু কি খাওয়াচ্ছেন আর কি খাওয়া প্রয়োজন সেটা ভাবার সময়টাও নেই। কারণ ভাবনা একটাই এ প্লাস পেতে হবে।স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষা  সব বইয়ের নিচে যদিও তদুপরি একেবারে নতুন। পরীক্ষায় লিখতে হয় না। কোন কোচিংয়েও বইটি পড়ানো হয় না।

ধারাবাহিক মূল্যায়নে নম্বর প্রদান। সে তো আমরা শিক্ষকরাই বুঝি না। কারণ এর কোন নির্দেশনা নেই বললেই চলে। শিক্ষকরা তো নম্বর কিনে আনবে না। সুতরাং দিতে কৃপনতা করার কি আছে।কিন্তু শিক্ষাবান্ধব এই বর্তমান সরকার কেন বইটি পাঠ্য করলেন তা আমরা শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক কেউ একবারও ভেবে দেখিনি। গ্রামীন পরিবেশে তো খেলাধুলার প্রশ্নই আসে না। মেয়ে একটু বড় হয়েছে তো ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না। ছেলেরা কিছুটা সময় পেলে তো মোবাইল নিয়ে ব্যাস্ত।থাকুক ঘরেই। কারণ বাইরে খারাপ হয়ে যাবে।তাছাড়া সবারই তো কোন না কোন আত্মীয় স্বজন শহরে থাকে। তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। তা না হলে তো Back dated হয়ে যাবে।

প্রাইমারীতে এ বিষয়টি ছিল না কিন্তু কিছুটা সময় হলেও খেলাধুলায় কেটেছে। কারো যদি দু-চারটা সনদ খেলাধুলায় থেকেও থাকে তো কোথায় আছে জানা নেই। কারণ চাকুরী  ক্ষেত্রে তো এসবের কোন দরকার নেই। রেজাল্ট কি সেটাই বড় বিষয়।কিন্তু এ প্লাস পেতে হলে যে শিক্ষার্থীর দেহ মন সুস্থ্য থাকা দরকার সেটা শিক্ষকগণ ভাবলেও অভিভাবকগণের প্রয়োজন নেই।বরং যে শিক্ষকগণ ভাবেন তারা ভাল শিক্ষক না।
সরকার যে কোন মাধ্যমেই হোক বছরে দুইবার খেলাধুলার ব্যাবস্থা করেছেন। একটা হলো গ্রীষ্মকালীন অন্যটা শীতকালীন। এতে রয়েছে -ফুটবল,ভলিবল,কাবাডি,সাঁতার, হ্যান্ডবল,ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন। ছেলে এবং মেয়ে প্রত্যেকের জন্য একই খেলা প্রযোজ্য। কিন্তু খেলোয়ার পাব কোথায়? শহরের যারা তারা তো ফার্স্ট ফুড খেয়ে ফার্মের মুরগী হয়ে গেছে। তাদের তো খেলার প্রশ্নই আসে না। আর যারা গ্রামে তারা ফুটবল খেলবে তাও আবার মেয়েরা!!!!!! অভিভাবকের মাথায় বাজ। বল খেললে এই মেয়েকে তো বিয়েই দিতে পারবে না। তাই এই খেলাগুলোতে মেয়েদের অংশগ্রহণ অনেকাংশে কম।যেটুকু অংশগ্রহন তা শিক্ষকগণ অনেক খর কাঠ পুড়িয়ে তারপর সম্ভব হয়েছে। কিন্তু খেলতে গিয়ে যদি ঐ মেয়ে আঘাত প্রাপ্ত হয় তবে শিক্ষকের রফাদফা করে শেষ।তাই এই বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও সরকারের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক প্রধানগণের নিকট কিছু সুপারিশ পেশ করছি —
১.যে সকল শিক্ষার্থী  এই খেলাধুলায় অংশ গ্রহণ করবে তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহ আর্থিক সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা।
২.চিকিৎসার জন্য বিশেষ ফান্ডের ব্যবস্থাকরণ।
৩.শুধু মাত্র পুরস্কারের জন্য ট্রফি বা ক্রেস্ট  না দিয়ে উৎসাহ দেয়ার জন্য অন্য পুরস্কার দেয়ার ব্যবস্থা করা।
৪.খেলাধুলায় প্রাপ্ত সনদ পরবর্তী  সময়ে মূল্যায়ন করা।
৫.স্বাস্থ্য ও শারীরিক  শিক্ষা বিষয়ে  লিখিত পরীক্ষা  নেয়া।
৬.উপজেলা পর্যায় থেকে যারা জেলা পর্যায়ে খেলতে যাবে তাদের আর্থিক সুবিধা দেয়া।
৭.অভিভাবকগণকে আগ্রহী করার জন্য মোটিভেশান সরকারী ভাবে প্রদান করা।
৮.BKSP এর মত আরো প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা।
৯.খেলাধুলায় রেফারির সিদ্ধান্ত না দিয়ে কমিটির সিদ্ধান্ত নেয়া।
১০.অভিজ্ঞ  শিক্ষক বা ব্যক্তি দিয়ে খেলা পরিচালনা করা। এখানে অভিজ্ঞ বলতে শুধু মাত্র খেলাধুলায় পারদর্শী  বুঝানো হয়নি। সৃজনশীল এবং সুস্থ্য মন মানসিকতার কথা বুঝানো হয়েছে। দেখা যায় অনেক সময় অনেকে কোন প্রতিষ্ঠান বা কোন এলাকার পক্ষপাতিত্ব করেন। এ ধরনের ব্যাক্তিদের দূরে রাখা।কারণ এতে শিক্ষার্থীর মন ভেঙে যায়।
সবশেষে চিন্তা ভাবনা, ভুল ধ্যান ধারণা আর আত্মঘাতী অন্যায়ের সাথে জড়ানোর আশংকা থেকে দূরে থেকে সুন্দর সমাজ গড়ার লক্ষ্যে সকলেই সচেষ্ট থাকার প্রত্যাশা ব্যাক্ত করছি।
লেখক- প্রধান শিক্ষক,
হালিমুন্নেছা চৌধুরাণী মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়,
ভালুকা, ময়মনসিংহ।
একই ধরনের আরও সংবাদ