অধিকার ও সত্যের পক্ষে

আজকের আইসিটি আগামীদিনের বৈশ্বিক গ্রাম

 মোঃ মোজাহিদুর রহমান, সাব এডিটর

খুব বেশি আগের কথা নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, ঢাকাসহ  দেশের ভিতরে যোগাযোগ ব্যবস্থা করা হত চিঠিপত্রের সাহায্য। আত্নীয়স্বজনের কাছে কারও মৃত্যুর খবর পৌছাতে হয়ত কয়েকদিন সময় লেগে যাত। প্রিয় মুখখানা দেখা হত না যোগাযোগব্যবস্থার করুন দশার কারনে। ভোররাত্রে রানার ছুটে চলত ডাকের থলি কাধে করে। চাকুরীর দরখাস্ত জমা দিতে পায়ে হেটে, নদী পার হয়ে ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে শহরে গিয়ে জমা দিয়ে আসতে হত। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল জানতে রেজাল্ট প্রকাশিত হওয়ার পরও দুই একদিন অপেক্ষা করতে হত। প্রেয়সী অপেক্ষা করত দীর্ঘদিন বিদেশে কর্মরত তার প্রিয়তম স্বামীর আদরমাখা চিঠির জন্য। মা অপেক্ষা করত কবে আসবে তার খোকা বাড়ী, কবে পাবে তার ভালবাসাময় চিঠিখানা। অনেক দুর্ভোগের মাধ্যমে দিনাতিপাত করতে হয়েছে তখনকার দিনে যোগাযোগব্যবস্থার অনুন্নত হালের কারনে।

শুরু হলো টেলিফোনের যুগ। যোগাযোগ ব্যবস্থার কিছুটা উন্নতি হল। বিপদ, আপদ, সুযোগ, সুবিধা টেলিফোনের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই যোগাযোগ করা সম্ভব হত। কিন্তু এটা ছিল শহরকেন্দ্রিক। গ্রামের যোগাযোগব্যবস্থার দৈন্যদশা থেকেই যায়। তারপরও আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তি আসে জনমনে। দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমে। গ্রামের মানুষ শহরে গিয়ে টেলিফোন বুথে তার প্রিয়মানুষের সঙ্গে দু চারটি কথা বলে মনের খায়েস মেটাত।

একসময় টেলিফোনের পাশাপাশি মোবাইল ফোনের প্রচারনা শুরু হয়। দেশ, বিদেশে, শহর থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে মোবাইল ফোনের ছোয়া। যোগাযোগ ব্যবস্থায় আসে এক আমুল পরিবর্তন। ঘরে বসেই প্রিয়জনের সাথে সকল সমস্যায় যোগাযোগ করতে পারছে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষগুলো। বর্তমানে স্বল্পদামে মানুষের সাধ্যের মধ্যে রয়েছে মোবাইল ফোনের প্রাপ্তি।

বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ। তথ্য প্রযুক্তি ছাড়া কোনকিছু কল্পনা করা সম্ভব হয়না। সকালের ঘুম ভাঙে মোবাইলের এলার্মের শব্দে। অনলাইনে খাবারের অর্ডার দিয়ে ঘরে বসেই বাইরের খাবার খাওয়া হয়। বিশ্বের যে কোন প্রান্তের খবর মুহুর্তের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। ঘরে বসেই চাকুরীর দরখাস্ত, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির আবেদন, পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্ট পাওয়া যাচ্ছে। একটা গ্রামের খবর যেমন অল্প সময়ের মধ্যে নেওয়া সম্ভব তেমনি তথ্য প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সারা বিশ্ব এখন একটি গ্রামের মতোই মনে হয়। এটাই হলো বৈশ্বিক গ্রাম।

এসে গেল স্মার্টফোন। বর্তমানে প্রায় ৫০শতাংশ লোকের কাছে পৌছে গেছে এ স্মার্টফোনের ছোয়া। শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই অনলাইনের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি বিদেশের অনেক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স সম্পন্ন করছে। চাকুরীর দরখাস্ত, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির আবেদন ইত্যাদি কাজের জন্য কারও ধর্না ধরতে হয় না। বিদ্যালয়ে বইয়ের বোঝার পরিবর্তে এসেছে ট্যাব। এক ট্যাবেই সকল বইয়ের সংস্করন। কোন বই হারিয়ে গেলে বা কোন লাইব্রেরীতে খুজে না পেলে ই-বুক রিডারের মাধ্যমে দ্রুত খুজে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা হাতের ছাপের মাধ্যমে ক্লাসে প্রবেশ করছে। তাদের কার্যক্রম মনিটিরং হচ্ছে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে।

বর্তমান সরকার তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে বদ্ধ পরিকর। এনালগ বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রুপান্তরের দোরগোড়ায় পৌছানের জন্য সরকারের শতভাগ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হাতে কলমে শিক্ষার জন্য মাল্টিমিডিয়া কনটেন্টের সাহায্য শ্রেনী কার্যক্রম পরিচালিত করা হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ আয়ত্ব করছে সহজে। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল আশানুরুপ হচ্ছে। দেশের সকল শিক্ষককে এক প্লাটফর্মে কাজ করার জন্য তৈরি হয়েছে শিক্ষক বাতায়ন। এখানে সকল শিক্ষক শিক্ষার উন্নয়নে একযোগে কাজ করছে। শিক্ষার উন্নয়নে এ সাইটের কাজ দেখাশোনা করছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এটুআই থেকে। মনিটরিং করা হচ্ছে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হচ্ছে। দেশের গন্ডি পেরিয়ে আমাদের দেশের শিক্ষকবৃন্দ এখন বিভিন্ন প্রশিক্ষনে বিদেশে অবস্থান করছেন। রয়েছে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

শুধু শিক্ষা ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তি সীমাবদ্ধ নয়। স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসাসহ সকল ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির ছোয়া রয়েছে। ই-কমার্সের মাধ্যমে ঘরে বসেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাথে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভবপর হচ্ছে। অনলাইনের মাধ্যমে সকল ধরনের সেবা মুহুর্তের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। ঘরে ঘরে এখন স্মার্টফোন, ল্যাপটব পৌছে গেছে। শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক পর্যায় থেকে তথ্য প্রযুক্তি শিখতে পারছে। ঘরে বসেই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ইয়াহু, হোয়াট এপস ইত্যাদি তথ্য প্রযুক্তির অনেক গুরুত্বপুর্ণ মাধ্যম হিসাবে বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ভিশন বাস্তবায়নের পথে। তথ্যপ্রযুক্তির উপযুক্ত ও কার্যকরী ব্যবহারের ফলে একসময় দেশ পরিনত হবে একটি পাড়ায়, পৃথিবী পরিনত হবে একটি গ্রামে। এটাই হবে তখনকার বৈশ্বিক গ্রাম।

লেখক

মোঃ মোজাহিদুর রহমান

সাংবাদিক ও লেখক

আইসিটি শিক্ষক

ICT4E জেলা এম্বাসেডর

মাষ্টার ট্রেইনার, ওয়েব পোর্টাল, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড।

একই ধরনের আরও সংবাদ