অধিকার ও সত্যের পক্ষে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ব্যাপারে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের আদেশ

 নিউজ ডেস্ক।।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশে শিক্ষক-কর্মচারীদের ওপর অনেকটা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে দুটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়। অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতামূলক নোটিশ দিয়েছে। এ নিয়ে ওই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের গুজব ও প্রচারণার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজরদারি শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতিমধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শতাধিক ফেসবুক আইডি চিহ্নিত করে তা বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এক অফিস আদেশে শিক্ষক, চিকিৎসক, কর্মকর্তা, নার্স ও কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া মতামত দেয়ার ওপর নির্দেশনা দেয়া হয়। নির্দেশ অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহ এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ ধরনের একটি নির্দেশনা দেয়া হয়। শিক্ষক-কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সতর্ক করেছে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বিএসএমএমইউ’র অফিস আদেশে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষতা ও শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ এর ধারা ৫ (ঙ) এর আলোকে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনো প্রচার মাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো বক্তব্য, বিবৃতি, স্ট্যাটাস প্রদান করা বিদ্যমান আইনের পরিপন্থি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক, চিকিৎসক, কর্মকর্তা, নার্স ও কর্মচারী উক্ত আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো প্রচার মাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনো বক্তব্য, বিবৃতি, স্ট্যাটাস প্রদান করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী, জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থি, রাজনৈতিক মতার্দশ বা আলোচনা সংশ্লিষ্ট, কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে হেয় প্রতিপন্ন করা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা, সর্বোপরি জনমনে বিভ্রান্তি, অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো বিষয় প্রচার এবং কমেন্ট করা সরকারি আইনের পরিপন্থি। এ ব্যাপারে সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার জন্য আহ্বান জানানো হলো।

গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার ১৯:  নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরমধ্যে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানা, রূপনগর থানা, রমনা থানা ও ধানমন্ডি থানায় ১৪ জনকে, চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় চারজন ও সিরাজগঞ্জের সদর থানায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তারা গুজব ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন। এছাড়া ফেসবুকে সরকাবিরোধী বক্তব্য শেয়ার করার অভিযোগও আনা হয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। তাই বিতর্কিত তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে গ্রেপ্তারও দেখানো হয়েছে। বুধবার রাতে উস্কানিমূলক ও মিথ্যা খবর প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- অনলাইন নিউজ পোর্টাল জুম বাংলার সিইও ইউসুফ চৌধুরী (৪০) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দাইয়ান আলমকে (২২)। রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে ডিএমপি’র সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন বিভাগ। এ সময় তাদের কাছ থেকে কম্পিউটার, মোবাইল, ল্যাপটপসহ ফেসবুক আইডি ও গ্রুপসমূহ জব্দ করা হয়েছে। গত ১লা আগস্ট রমনা থানায় দায়েরকৃত মামলায় (নং-১) ইউসুফকে এবং ৫ই আগস্ট রমনা থানায় দায়েরকৃত (নং-৮) মামলায় দাইয়ানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-২) সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে ধানমন্ডি এলাকা থেকে র‌্যাব তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন, মুনিম সরকার (২৩), আখতারুজ্জামান টনি (২২) ও আসাদুল্লাহ আল গালিব (২২)। এসময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল, সিম, ল্যাপটপ ও শিবিরের কিছু কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা নিজেদের শিবিরের কর্মী হিসাবে পরিচয় দিয়েছে। একই দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট তৌহিদুল ইসলাম তুষার (২৪), মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ (২৮) ও এহসান উদ্দিন এজাজ (১৮) নামের তিনজনকে আটক করেছে। তাদের কাছ থেকেও মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, মেমোরি কার্ড উদ্ধার করা হয়। এছাড়া তাদের ফেসবুক আইডি থেকে অনেক তথ্যও পাওয়া যায়। পরে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় তাদের রমনা থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, তৌহিদুল ইসলাম তুষার, মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ ও এহসান উদ্দিন এজাজকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত ওয়ালিউল্লাহর পাঁচ দিন, এজাজ ও তুষারের চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। আর সোমবারের গ্রেপ্তার হওয়া মাহবুবুর রহমান, আলমগীর হোসেন ও সাইদুল ইসলামের পাঁচ দিনের রিমান্ড চলছে। তাদের কাছ থেকে সাইবার ক্রাইম ইউনিট বেশ চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে। এর আগে ফেসবুকে সেনাবাহিনী নিয়ে মিথ্যা তথ্য শেয়ার ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে উসকানি দেয়ার  অপরাধে সিরাজগঞ্জে গ্রেপ্তার হন সাখায়াত হোসেন শাকিল। তিনি পেশায় একজন আইনজীবী। গ্রেপ্তারের পর তাকে আদালতে হাজির করলে আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। আইসিটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ইমদাদুল হক অনিক, আজিউর রহমান, মারুফ হোসেন ও আব্দুল্লাহ আল শাহেদকে একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগে গত ৪ঠা আগস্ট রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, উত্তরা থেকে অভিনেত্রী নওশাবা আহমেদ ও রংপুর থেকে শাহেদ আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন বিভাগের উপ-কমিশনার মো. আলিমুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির লোক উস্কানিমূলক পোস্ট ও মিথ্যা তথ্য প্রচার শুরু করেছিল। এতে করে জনমনে আতঙ্ক ও দেশ অস্থিতিশীল হতে পারত। তাই আমরা বিভিন্ন সময় এসব অপরাধে জড়িত থাকার অপরাধে আমরা নয়জনকে  গ্রেপ্তার করেছি। রিমান্ডে এনে অনেক আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ বুধবার রাতে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আলিম বলেন,  জুম বাংলা কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই ভুয়া সংবাদ প্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। চলমান আন্দোলনের সময় পুলিশের অযৌক্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক ছবি প্রকাশ করে আন্দোলনকে উস্কে দেয় জুম বাংলা। বুয়েটের ছাত্র দাইয়ান ফেসবুক লাইভ ও পোস্টসহ নানান কন্টেন্ট পোস্ট ও শেয়ার করে চলমান স্বাভাবিক আন্দোলনকে সহিংস করতে ভূমিকা রাখেন বলে তদন্তে জানা যায়। গ্রেপ্তারকৃতদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে তিনি জানান।

শতাধিক ফেসুবক আইডি ও কন্টেন্ট বন্ধের উদ্যোগ:  শতাধিক ফেসবুক আইডি ও কন্টেন্ট বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুরোধে তারা এ উদ্যোগ নিচ্ছে। এর মধ্যে ফেসবুকের আইডি সরাসরি বন্ধ করার সুযোগ নেই বিটিআরসির। তারা আইডি চিহ্নিত করে ফেসবুককে কেবল অনুরোধ জানাতে পারে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ নিজস্ব বিবেচনায় ওইসব আইডি বন্ধ করতে পারে আবার নাও পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছুই করার নেই। তবে কিছু কনটেন্ট ব্লক করার সুযোগ রয়েছে বিটিআরসির। গত কয়েক দিনের ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে রীতিমতো বিপাকে পড়েছে বিটিআরসি। তারা জানান, এরই মধ্যে বেশ কিছু সাইট নিয়ে অনুরোধ এসেছে। প্রক্রিয়া মেনে বিটিআরসি সেসব নিয়ে কাজ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক কর্মকর্তা জানান, গত কয়েক দিন ধরে আমাদের কাছে অনবরত নির্দেশনা আসছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ধরনের নির্দেশনা বলে দাবি করছে সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে বিটিআরসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহুরুল হক গতকাল মানবজমিনকে বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে উস্কানিমূলক অনেক কিছু রটানো হয়েছে। গুজব ছড়িয়ে সহিংসতামূলক কর্মকাণ্ডও হয়েছে। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জনসচেতনতামূলক কিছু নির্দেশনা আসে সেসব আমরা প্রচার করেছি। বিভিন্ন অপারেটরদের জানিয়েছি। আর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন কিছু হলে মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের লিখিত অনুরোধ জানানো হয়। তখন আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। সম্প্রতি ফেসবুক বা কোনো কন্টেন্ট বন্ধ করা হয়েছে কি না প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা ফেসবুককে কেবল অনুরোধ করতে পারি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে আমরা সেটা নিয়মিত করি। কোনো কন্টেন্ট বন্ধ করা হয়েছে কি না আমার জানা নেই। বর্তমানে বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন প্রায় ৪ কোটি। আর ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৮ কোটির বেশি।সুত্র মানবজমিন

একই ধরনের আরও সংবাদ