অধিকার ও সত্যের পক্ষে

মহিলাদের হজ্বের বিধি বিধান

 অধ্যাপক মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ

নারী পুরুষ সবার জন্যই জীবনে একবার হজ্ব করা ফরজ। ‘হজ্ব’ নামে পবিত্র কুরআনে একটি স্বতন্ত্র সুরা রয়েছে। দৈহিক-আর্থিক সামর্থ্য এবং স্থান ও সময়গত সামঞ্জস্যতায় হজ্ব একটি বিশ্বজনীন ইবাদত। ব্যাপক কর্মতৎপরতায় হজ্ব হলো লক্ষ জনতার চলমান মহাসমাবেশ। প্রাচ্য-প্রতীচ্যের অগণন বনী আদম এখানে সমবেত হন, যাদের পরনের কাপড় এক, কামনা এক, মনে-মুখে ধ্বনিত হয় একই ভাষার একই উচ্চারণ “লাব্বাইক! আল্লাহুম্মা লাব্বাইক! (উপস্থিত! হে প্রভু আমি উপস্থিত!!) আরাফাত, মুজ্দালিফা, মিনা প্রভৃতি স্থানে যথা সময়ে সুশৃঙ্খল কর্ম সম্পাদনের এক মহা-প্রশিক্ষণ হজ্ব। প্রিয়নবী (স.) বলেন “আমার কাছ থেকে হজ্বের নিয়মকানুন শিখে নাও”।

পুরুষ ও মহিলার ক্ষেত্রে হজ্বের বিধি বিধানগত পার্থক্য বিবেচনায় সতর্কতা অবলম্বন করা একান্ত জরুরি। কেননা, প্রিয়নবী (স.) হযরত আয়েশাকে (রা.) বলেন “তোমাদের জন্য মাবরুর (কবুল) হজ্ব হচ্ছে শ্রেষ্ট জিহাদ” (বুখারি)। হজ্বের ক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য বিশেষ কিছু বিধি বিধান মেনে চলতে হয়। যেমন:
# মহিলাদের হজ্বের অন্যতম শর্ত মাহরাম (অর্থাৎ পিতা, চাচা, মামা, শ্বশুর, ভাই, নিজের ছেলে, ভাতিজা, ভাগিনা, জামাতা ও অন্যান্য) সঙ্গী থাকা। এ মাহরাম সঙ্গীকে অবশ্যই সুস্থ-সক্ষম, প্রাপ্তবয়ষ্ক মুসলিম হতে হবে। আরবি ‘মাহরাম’ অর্থ হালালের বিপরীত বা হারাম। অর্থাৎ ‘যাদের সঙ্গে বিয়ে নিষিদ্ধ ও সাক্ষাৎ অনুমোদিত’। পারিভাষিক দিক থেকে ‘মাহরাম’ নির্ধারিত হয় তিনটি কারণে:
(ক) ঔরসজাত ও বংশগত সম্পর্কের জন্য মাহরাম। এরূপ মাহরামও আবার দু’প্রকার। যথা: চিরস্থায়ী ও সাময়িক মাহরাম।
(খ) বিয়ের সম্পর্কের জন্য মাহরাম।
(গ) মাতৃদুগ্ধ পানের সম্পর্কের জন্য মাহরাম।
যদিও ইমামদের মধ্যে এ বিষয়ে সুক্ষè ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ রয়েছে, তবু মাহরাম ছাড়া মহিলাদের হজ্ব শুদ্ধ হবে না। প্রিয়নবী (স.) বলেন “কোনো মহিলা যেন মাহরাম ছাড়া সফর না করে….. একথা শুনে একজন বললেন ‘হে আল্লাহ্র রাসুল আমার স্ত্রী হজ্বে যেতে চায়’ তখন রাসুল (স.) বললেন: তুমি তার সঙ্গে যাও” (বুখারি)।
এ প্রসঙ্গে ইবনু ওমর (রা.) বর্ণিত হাদিসে আছে, “কোনো মহিলা তিন দিনের দূরত্বে মাহরাম ছাড়া ভ্রমণ করবে না” (বুখারি-মুসলিম)। ইবনু আব্বাসের (রা.) বর্ণনায় আছে, “মাহরাম ছাড়া মহিলা হজ্ব করবে না” (দার কুতনি)। অন্য বর্ণনায় আছে, “কোনো মহিলার একাকী হজ্ব করা বৈধ নয়” (তিবরানি)।
# অভিভাবকের অনুমতি নেওয়া। দৈহিক-আর্থিকভাবে সামর্থ্য রয়েছে মহিলাদের হজ্বের ক্ষেত্রে স্বামী বা পিতামাতার অনুমতি নেওয়া মুস্তাহাব। তবে অনুমতি পাওয়া না গেলেও হজ্ব করা যাবে। বরং অভিভাবকের উচিত হবে, অনুমতি প্রত্যাশী মহিলাদের অনুমতি দেওয়া এবং হজ্বের অনুসঙ্গিক দিক যাচাই করে দেখা। যেমন: মাহরাম সঙ্গী, নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রস্তুতির খোঁজ নেওয়া। যে মহিলার জন্য হজ্ব করা ফরজ তিনি মাহরাম সঙ্গী নিশ্চিত থাকা সাপেক্ষে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াও হজ্বে যেতে পারবেন। তবে মহিলার জন্য হজ্ব করা ফরজ না হলে বা নফল হলে অভিভাবকের অনুমতি নেওয়া ফরজ এবং অনুমতি ছাড়া হজ্বে যাওয়া ঠিক হবে না।
# মহিলাদের ইহরামের সঙ্গে পুরুষের ইহরামের কাপড়ের পার্থক্য অত্যন্ত স্পষ্ট। পুরুষের ইহরামের জন্য ব্যবহৃত হয় সেলাইবিহীন দু’টি সাদা বস্ত্র। তবে মহিলাদের ইহরামের কোনো নির্দিষ্ট পোশাক নেই। যা উজ্জল রঙের নয়, নজর কাড়া নয় ও শরীর ভালভাবে ঢাকে এমন ঢিলাঢালা স্বাভাবিক আরামদায়ক যে কোনো রঙের পোশাকে মহিলাগণ ইহরাম বাঁধতে পারেন। তবে শাড়ি পরে তাওয়াফ করা অনেক অসুবিধা ও কষ্টকর। পরপুরুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় মহিলারা এমন পোশাক কিংবা অলংকার পরিধান করবেন না।
মহিলাদের ইহরামের পোশাকের অন্যতম শর্ত হলো:
১. মহিলাদের চেহারা খোলা রাখতে হবে এমন নয়। তবে মাথা ভালভাবে ঢেকে রাখতে হবে, কিন্তু নিকাবের মাধ্যমে বা অন্য কোনো উপায়ে মুখ একেবারে ঢাকা যাবে না এবং হাত মোজা ব্যবহার করা যাবে না। প্রিয়নবী (স.) বলেন “ইহরাম অবস্থায় মহিলাগণ নিকাব ও হাত মোজা পরবে না” (বুখারি)। তবে হজ্বের সময়ে পরপুরুষদের খুব কাছাকাছি হয়ে গেলে ওড়না দিয়ে বা অন্য উপায়ে সাময়িকভাবে মুখ আড়াল করা যাবে। আবু দাউদ শরিফে হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদিসে এমন বিবরণ রয়েছে।
২. ইহরাম অবস্থায় কোনো সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে না। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন “ঠোঁটের ওপর কাপড় দেবে না, নিকাব পরবে না, জাফরান বা অন্য কোনো সুগন্ধিযুক্ত কাপড় পরবে না” (বুখারি)।
৩. মহিলাদের ইহরামের কাপড় সাদা বা সবুজ হতে হবে এমনও নয় বরং লাল, নীল, হলুদ ইত্যাদি রঙেরও হতে পারে।
৪. মহিলাগণ ইহরামরত অবস্থায় পোশাক বদলাতে পারবেন।
৫. ভুলে বা অজ্ঞতাবশতঃ নিকাব বা হাত মোজা ব্যবহার করলে এ জন্য ‘দম’ দিতে হবে না বরং হজ্ব হয়ে যাবে।
৬. মহিলাগণ ইহরামরত অবস্থায় পায়ে মোজা ব্যবহার করতে পারবেন এবং তা উত্তম। এতে পা ঢাকা থাকবে।
৭. মহিলাগণ ঋতুবতী অবস্থায়ও ইহরাম বাঁধতে পারবেন। ঐ অবসথায়ই গোসল করে যথা সম্ভব পরিচ্ছন্ন ও নির্বিঘœ হওয়া মুস্তাহাব।
# মহিলাদেরকে তাওয়াফের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু বিধি বিধান মেনে চলতে হবে। যেমন:
১. তাওয়াফের সময়ে মহিলাদেরকে সার্বিকভাবে পবিত্র-পরিচ্ছন্ন হতে হবে। ঋতুবতী অবস্থায়, সন্তান প্রশব পররবর্তীকাল বা অন্য কোনো মেয়েলি সমস্যায় অপবিত্রতা নিয়ে তাওয়াফ করা যাবে না। হজ্বের সময় হযরত আয়েশা (রা.) ঋতুবতী হলে প্রিয়নবী (স.) বলেন “হাজিরা যা করে তুমিও তা করো, তবে পবিত্র না হয়ে তাওয়াফ করো না” (বুখারি)।
২. তাওয়াফের সময় পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য বিশেষ বিধান ‘রামল’ ও ‘ইযতিবা’ মহিলাদের করতে হবে না। ‘রামল’ ও ‘ইযতিবা’ করা পুরুষদের জন্য সুন্নাত।
৩. মহিলাগণ উচ্চস্বরে ‘তালবিয়া’ অর্থাৎ লাব্বাইক ধ্বনি করবেন না। বরং নিজে ও পাশের অন্য মানুষ শোনে এমন স্বরে করবেন।
৪. তাওয়াফ ও হজরে আসওয়াদ চুম্বনের সময় মহিলাদের উচিত ভিড় এড়িয়ে চলা যেন পুরুষের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি না হয়।
৫. তাওয়াফকালে কোন মহিলা ঋতুবতী হলে, তাওয়াফ বন্ধ করে হারাম শরিফের বাইরে চলে যাওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে চক্কর ৩টির কম হলে পরবর্তীতে পবিত্র হওয়ার পর নতুন করে তাওয়াফ করতে হবে, আর ৪টি বা তার অধিক চক্কর হয়ে থাকলে তাওয়াফের ওয়াজিব আদায় হয়ে যায়। তাই বাকী চক্করগুলো পুরা করা উত্তম, জরুরি নয় (কিতাবুল মাসাইল)।
৬. ঋতুবতী অবস্থা, সন্তান প্রশব পররবর্তী অন্য কোনো মেয়েলি সমস্যার ক্ষেত্রে ‘তাওয়াফে যিয়ারতে’র জন্য পবিত্র হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে। তবে, যদি তা কোনোভাবেই সম্ভব না হয় তা হলে ঐ অবস্থায়ই ‘ফরয তাওয়াফ’ করে নিতে হবে। এতে হজ্বের ফরয আদায় হয়ে যাবে বটে, কিন্তু অপবিত্র অবস্থায় তাওয়াফের কারণে পূর্ণ একটি উট বা গরু কিংবা মহিষ দম হিসেবে হারাম শরিফের সীমানার মধ্যে জবাই করতে হবে এবং এ ত্রæটির জন্য মহান আল্লাহ্র কাছে তওবা-ইস্তিগফার করতে হবে (কিতাবুল হজ্ব)। উল্লেখ্য, হারাম শরিফের সীমানার বাইরে দমের পশু জবাই করলে দম আদায় হবে না।
৭. যদি স্বাস্থ্য ঝুঁকি না থাকে। তবে, মহিলাগণ মেয়েলি সমস্যা থেকে মুক্ত থাকবার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী স্বল্প-মেয়াদি ঔষধ সেবন করে হজ্বের কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন।
৮. ‘বিদায়ী তাওয়াফে’র সময়েও যদি কেউ ঋতুবতী থাকেন তবে তাকে ঐ তাওয়াফ করতে হবে না। এজন্য দমও দিতে হবে না। দূর থেকে বিদায় নিলেই চলবে। তবে ‘তাওয়াফে যিয়ারতে’র পর কেউ কোনো নফল তাওয়াফ করলে ঐ তাওয়াফই বিদায়ী তাওয়াফের স্থলাভিষিক্ত হয়ে যাবে।
# অনুরূপভাবে কুরবানির পর মাথামুÐনের বেলায় পুরুষগণ পুরো মাথা খৌর করলেও মহিলাগণ শুধু চুলের আগ্রভাগ সামান্য কাটলেই হবে। তবে মহিলা হাজিগণকে হজ্বের সময় নিচের বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ যতœবান হতে হবে। যেমন:
 আর্থিক পবিত্রতা, আল্লাহ্র সন্তুষ্টি এবং তাওবার মানসিকতা।
 হজ্বের ফরজ ও ওয়াজিব পালনে সর্তকতা।
 দৃঢ় মনোবল ও সুস্থতা এবং ঝধভঃু ভরৎংঃ নীতি।
 নিয়ম কানুন দোয়া-কালাম শিখে-লিখে ও ‘ক্ষুদ্র পুস্তিকা’ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখা।
 রোগকে অবহেলা-আড়াল না করা। ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র, প্রয়োজনীয়-পর্যাপ্ত ওষুধ সঙ্গে রাখা এবং নিয়ম মেনে ওষুধ সেবন করা।
 নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী হালকা ও পরিমিত পরিমাণ হওয়া।
 শরীর, সময় ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে ইবাদত করা।
বস্তুতঃ হজ্ব একটি পূণ্যময় ইবাদত। হজ ত্রæটি মুক্ত হওয়া একান্ত জরুরি। কেননা, প্রিয়নবী (সা.) বলেন “কবুল হজ্জ্বের বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়” (বুখারি)। মহান আল্লাহ্ বাংলাদেশের মহিলা হজ্বযাত্রীগণকে নিরাপদ ও সুস্থ রাখুন। সবার হজ্ব ও সব মুনাজাত কবুল করুন। আমিন।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ কাপাসিয়া গাজীপুর

 

একই ধরনের আরও সংবাদ