অধিকার ও সত্যের পক্ষে

কেন এমপিওভুক্তি চাই

 জামির হোসেন ||

১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারি কলেজে প্রথম অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালু করে। বর্তমানে দেশের ৪৯৪টি বেসরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স কোর্সে ২,১০,০০০ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষাদানে রত অনার্স-মাস্টার্স কোর্সে নিয়োগপ্রাপ্ত ৫,৫০০ জন শিক্ষক। ২০০০ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্তি সংক্রান্ত সংশোধিত রেগুলেশনের ৪র্থ পৃষ্ঠায় প্রতিষ্ঠানে অনার্স কোর্স অধিভুক্তির শর্তাবলীতে উল্লেখ আছে, ‘ডিগ্রী (অনার্স) কোর্সে শিক্ষাদানের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেগুলেশনে বর্ণিত শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন অন্তত: ৭(সাত) জন (ডিগ্রী পাসসহ) শিক্ষক/শিক্ষকা কর্মরত থাকিতে হইবে।’ এই নিয়ম মেনে কলেজে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ১ জন শিক্ষক, ডিগ্রী পর্যায়ে ১ জন শিক্ষকসহ অনার্স কোর্স চালুর জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট প্রতি বিষয়ে অনার্স কোর্সে ৫ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে থাকে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০১২ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও কর্মচরীদের বেতন-ভাতাদির সরকারি অংশ প্রদান এবং জনবল কাঠামো সম্পর্কিত ২০১০-এর সংশোধিত নির্দেশিকার ১৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে- ‘কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত জনবল কাঠামোর অতিরিক্ত শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োজিত রাখলে অতিরিক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি ও আনুষাঙ্গিক সুবিধাদিসহ ১০০% সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হবে।’ এবং ১৯৯৪ খ্রি. প্রকাশিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরির শর্তাবলী রেগুলেশনের ৫ পৃষ্ঠায় ‘বেতন ও ভাতা’ নির্দেশিকায় উল্লেখ আছে- ‘প্রত্যেক কলেজে সকল শ্রেণীর শিক্ষকের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত অথবা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বেতনক্রম এবং বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থা থাকিবে।’

বাস্তবে দেখা যায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের সকল শ্রেণীর শিক্ষকদের ১০০% বেতন ভাতা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রদানের নির্দেশনা থাকলেও এ ব্যাপারে উভয় কর্তৃপক্ষের কোন পর্যবেক্ষণ না থাকায় দেশের ৯৫%এর বেশি প্রতিষ্ঠান শিক্ষকের মাসিক বেতন প্রতিষ্ঠান ভেদে ৩,০০০ টাকা থেকে ৬,০০০ টাকা করে প্রদান করছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে এতদিন এসমস্ত বঞ্চিত শিক্ষকদের মুখ বন্ধ করে রেখেছিল প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। এই দ্রব্যমূল্যের বাজারে এখন এসমস্ত শিক্ষকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। অর্ধহারে, অনাহারে থেকে আর কতদিন শিক্ষকরা এই উচ্চ স্তরের পাঠ্যক্রমে মনোযোগের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারবে! সরকার এই সমস্ত শিক্ষকদের দায়িত্ব না নিয়ে তাদের ভাগ্য কলেজ কর্তৃপক্ষের খেয়াল-খুশির উপর ছেড়ে দিয়েছেন, যা রাষ্ট্রের এক ধরনের উদাসীনতা। বেসরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স কোর্সে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এমপিও না করায় এই দীর্ঘ ২৩ বছরে কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের নূন্যতম বেতনও দিচ্ছেনা। অপরদিকে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের খেয়াল খুশিমত এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে মাসিক বেতন আদায় করছে।

এতে করে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ই বঞ্চিত হচ্ছে। সরকার ঘোষিত বর্তমান পে-স্কেলে প্রাইমারি শিক্ষকদের বেতন স্কেল ১১,০০০ টাকা, মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেতন স্কেল ১৬,০০০টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রী কোর্সের শিক্ষকদের বেতন স্কেল ২২,০০০টাকা। আর দেশের বেসরকারি কলেজের উচ্চশ্রেণীতে পাঠদানরত শিক্ষকদের বাস্তবে কোন স্কেল নাই, এই সমস্ত শিক্ষকরা কর্তৃপক্ষের খেয়ালের দাস, একই প্রতিষ্ঠানে চাকুরিরত নিম্ন শ্রেণীর এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের থেকে অনার্স-মাস্টার্স কোর্সে পাঠদানরত উচ্চশ্রেণীর শিক্ষকরা ১০ ভাগের ১ ভাগ বেতনও পাচ্ছেনা। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে এইভাবে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের উচ্চ শ্রেণীর শিক্ষকরা। বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টর্স কোর্সের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের অবস্থা আরো করুণ। বেসরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স কোর্সে শিক্ষার্থীদের মাসিক কত টাকা বেতন দিতে হবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর নির্ধারন না করায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ খেয়াল খুশিমত শিক্ষার্থীদের থেকে বেতন আদায় করছে। প্রতিষ্ঠান ভেদে একজন শিক্ষার্থীর মাসিক বেতনের পরিমান ৩০০ টাকা থেকে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। প্রায় সব প্রতিষ্ঠান শিক্ষর্থীদের নিয়ে রিতিমতো ব্যবসা করছে। আবার এসব কোর্সে প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের থেকে ভর্তি ফি, ইনকোর্স, টার্মপেপার ও মৌখিক পরীক্ষার বাড়তি ফিসহ বিভিন্ন ধরনের জরিমানা আদায় করছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। ভর্তি ফি এর ব্যাপারে কোন পর্যবেক্ষণ না থাকায় প্রতিষ্ঠান ভেদে ভর্তিতে শিক্ষার্থী প্রতি ৫,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। দেশের দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বেসরকারি কলেজে অনার্স কোর্সে ভর্তি হতে চায়। কিস্তু অধিক হারে ভর্তি ফি ও মাসিক বেতনের কারণে অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পরে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে কোর্স সম্পন্ন না করেই অর্থাভাবে অনেকেই পড়ালেখার ইতি টানে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক গত ১৪ অক্টোবর ২০১৫ইং তারিখে বেসরকারি অনার্স-মাস্টার্স কোর্সে শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করতে বার্ষীক ৮৮,৮৬,৯০,০০০ টাকা উল্লেখ করে শিক্ষমন্ত্রণালয়ে মতামত প্রেরণ করেন। যা বর্তমান পে-স্কেল অনুযায়ী দাড়াবে আনুমানিক ১৭৭,৭৩,৮০,০০০ টাকা। অথচ অনার্স-মাস্টার্স কোর্সে পাঠদানরত ২,১০,০০০ জন শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে বার্ষিক ৫০০,০০,০০০০০ (পাঁচ শত কোটি) টকারও বেশি আদায় করছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। এই বিপুল পরিমান টাকা শিক্ষার্থীদের থেকে আদায় করা সত্বেও, কলেজ কর্তৃপক্ষ, অনার্স মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষকদের ১০০% বেতন ভাতা নিশ্চিত না করে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও অনার্স-মাস্টার্স কোর্সের পাঠ্য বিষয়ের (ইন্টারমিডিয়েট ও ডিগ্রীর জন্য নিয়োগ প্রাপ্ত) এমপিওভুক্ত প্রভাষকগণকে অনার্স-মাস্টার্স তহবিল থেকে যথেচ্ছভাবে সম্মানি দিচ্ছে আর অনার্স-মাস্টার্স তহবিলের অর্থ যথেচ্ছভাবে খরচ করছে। এই অর্থ আদায় করে কলেজ কর্তৃপক্ষ একদিকে যেমন গরীবের পেটে লাথি মারছে অপরদিকে প্রায় দুইযুগ ধরে শিক্ষকদের ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত করে চলছে।

বেসরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স কোর্সে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি থাকলে এবং শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন নির্ধারন করা থাকলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এইভাবে বঞ্চনার শিকার হতোনা। এসমস্ত কারণে বেসরকারি কলেজ অনার্স- মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষকরা এমপিওভুক্তি চায়। দীর্ঘ ২৩ বছর বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষকদের শ্রমে, ঘামে, ত্যাগে, সেবায় লাখ লাখ শিক্ষার্থী যোগ্য জনশক্তিতে পরিনত হয়েছে। তাই অজ অনার্স-মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বেসরকারি কলেজের অনার্স-মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষার্থীদের আয় সরকারি কোষাগারে জমা নিয়ে শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি:
মাননীয় অর্থমন্ত্রী এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয় সরকারি কোষাগারে জমা নিয়ে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পে-স্কেল কার্যকর করার কথা বলেছেন। মাননীয় শিক্ষমন্ত্রী এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব আইনের আওতায় আনতে ১ মাসের মধ্যে আইন পাশের জন্য সংসদে উঠবে বলে জানিয়েছেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়ের মধ্যে বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষার্থীদের থেকে আদায় করা আয় ও অন্তর্ভুক্ত আছে। বেসরকারি কলেজের অনার্স- মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষকরা এমপিও বিহীনভাবে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানেই চাকরি করে। আমরা বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষার্থীদের থেকে আদায় করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয় আইনের আওতায় এনে সরকারি কোষাগারে জমা নিয়ে বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির জোর দাবি জানাই।

লেখক: প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান

একই ধরনের আরও সংবাদ