অধিকার ও সত্যের পক্ষে

শিক্ষার্থী নেই তবু স্কুলটি জাতীয়করণের তালিকাভুক্ত

 নিজস্ব প্রতিবেদক:

স্কুল মাঠকে ডোবা বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে পাট জাগ। নেই শিক্ষার্থীদের কোলাহল। তবুও স্কুলটি সরকারি! স্থানীয় সাংসদের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সরকারি হয়েছেন চার শিক্ষকও। ওই অবস্থা ময়মনসিংহের নান্দাইলের পণ্ডিতপুর নিউ কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।

উপজেলার গাঙ্গাইল ইউনিয়নে ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পণ্ডিতপুর নিউ কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্থানীয় আবদুল মান্নান বিদ্যালয়ের জন্য জমিটুকু দান করেন। ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে বিদ্যালয়টিতে এলজিইডি কর্তৃক তিন কক্ষবিশিষ্ট একটি পাকা ভবন নির্মিত হয়। বিদ্যালয়টিতে ভবন থাকলেও এর পাঠ কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ২০১৩ সালে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঘোষণার সময় এ বিদ্যালয়টিও জাতীয়করণের তালিকাভুক্ত হয়ে যায়। এরপর থেকে কাগজপত্রে চালু রয়েছে বিদ্যালয়টি। ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ ও এখানে শিক্ষকদের ভুয়া হিসেবে আখ্যা দিয়ে জমিদাতা পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আবেদীন খান তুহিনও ২০১৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিবের কাছে একটি চিঠি দেন। শিক্ষকশূন্য ও বিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় পর্যায়ে জাতীয়করণকৃত কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভুয়া নিয়োগকৃত শিক্ষক গেজেটভুক্ত না করে সরকারিভাবে শিক্ষক নিয়োগের অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে। এর মধ্যে গত ১০ ফেব্রুয়ারি বিদ্যালয়টিতে ঝটিকা সফরে গিয়ে কোনো শিক্ষার্থী পাননি সাংসদ তুহিন। বিদ্যালয়টির অবস্থা ছিল নোংরা। একজন শিক্ষককে পাওয়া যায় যিনি অন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে কিছুই বলতে পারেননি। তখন গ্রামবাসীর কাছে সাংসদ জানতে পারেন পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী এনে এ বিদ্যালয়ের নামে সমাপনী পরীক্ষা দেওয়ানো হয়। ওই অবস্থায় বিদ্যালয়টির জাতীয়করণ বহাল রেখে ৫ শিক্ষক সরকারিভাবে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করে ১২ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিবের কাছে একটি চিঠি দেন সাংসদ। গত ১২ জুলাই বিদ্যালয়ে কাগজপত্রে থাকা চার শিক্ষককে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে আদেশ জারি হয়। তারা হলেন- প্রধান শিক্ষক মো. আমিনুল হক, সহকারী শিক্ষক শিপা আক্তার, আফজালা ও লুৎফুন্নেছা।

এদিকে এমপি আনোয়ারুল আবেদীন খান তুহিন গত মঙ্গলবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী বরাবর একটি লিখিত আবেদন পাঠিয়েছেন। নিয়োগকৃত চার ভুয়া শিক্ষকের গেজেট বাতিলের জন্য আবেদনটি করা হয়। এতে সাংসদ উল্লেখ করেন, ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ১০ মে পর্যন্ত উপজেলা পরিষদের কার্যবিবরণী অনুযায়ী পণ্ডিতপুর বিদ্যালয়টি বন্ধ ছিল। গুটি কয়েক স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি তড়িঘড়ি করে ভুয়া নিয়োগকৃত শিক্ষক দিয়ে কাগজে-কলমে বিদ্যালয়টি চালু দেখিয়ে স্কুলটি জাতীয়করণের তালিকাভুক্ত করে। বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব বরাবর লিখিতভাবে জানানো হলেও অভিযোগ আমলে না নিয়ে সাংসদ ও উপজেলা পরিষদের অজ্ঞাতে একটি অসাধু চক্র চার শিক্ষকের নাম গেজেটভুক্ত করে। ওই অবস্থায় বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ ঠিক রেখে ভুয়া শিক্ষকদের নাম গেজেট থেকে বাতিল করে সরকারিভাবে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীকে।

এদিকে গতকাল বুধবার দুপুরে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায় বেহাল অবস্থা। বিদ্যালয়ের মাটি ডোবা বানিয়ে পাট জাগ দেওয়া হচ্ছে। শ্রেণি কক্ষে নেই কোনো শিক্ষার্থী। অবশ্য তিনজন শিক্ষিকা ছিলেন অফিস কক্ষে। ওই অবস্থায় তড়িঘড়ি করে আশপাশ থেকে কিছু ছেলেমেয়ে আনা হয়। একটি কক্ষেই বসানো হয় শিশুদের। পঞ্চম শ্রেণির বই নিয়ে বসে থাকা এক শিশুর কাছে কোন ক্লাসে পড় জানতে চাইলে শিশুটি বলে ওঠে সে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বিদ্যালয়টির কোনো শিক্ষার্থী নেই। তবে বিদ্যালয়ের খাতা ঘেঁটে শিক্ষক আফজাল জানান, তাদের প্রাক-প্রাথমিক চালু নেই। তবে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত তাদের ৮৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

এদিকে বিদ্যালয়টি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা মো. আমিনুল হক বলেন, তিনি ও শিপা আক্তার ২০০৮ সালে বিদ্যালয়টিতে নিয়োগ পেয়ে প্রাথমিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেন। এর আগে এটি বন্ধ ছিল। ২০১২ সালে আরও দুই শিক্ষককে নিয়োগ দিয়ে ২০১৩ সাল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত চালু করা হয়। সাংসদের অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষ তাদের নিয়োগ দিয়েছেন। সাংসদ তাদের কীভাবে ভুয়া বলেন সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী সিদ্দিক বলেন, বিদ্যালয়টির চার শিক্ষককে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার একটি আদেশ সোমবার তিনি হাতে পেয়েছেন। এটি পাওয়ার পরই জানতে পারেন শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

একই ধরনের আরও সংবাদ