অধিকার ও সত্যের পক্ষে

শিক্ষার উদ্দেশ্য বনাম বাস্তবতা

 অলোক আচার্য্য

ভারতের রাষ্ট্রপতি ও বিখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী এ.পি.জে আবদুল কালাম শিক্ষা নিয়ে খুবই চমৎকার একটি মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছিলেন, যতদিন শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু চাকরি পাওয়া হবে, ততদিন সমাজে শুধু চাকররা জন্মাবে, মালিক নয়”। যে কথার বাস্তবিক প্রমাণ আমরা আজকের সমাজে প্রতিফলিত হচ্ছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের আজকের শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল চাকরি পাওয়া। একটা সার্টিফিকেট আর চাকরি তারপর জীবনে আর কোন দুঃশ্চিন্তা থাকে না। পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে দেশে রীতিমত যুদ্ধ হয়। সেটা হলো জিপিএ ফাইভ নিয়ে। এটা রীতিমত দেশের অভিভাবকদের কাছে মানসম্মানের ব্যাপার। সন্তান যদি জিপিএ ফাইভ না পায় তাহলে পাড়া মহল্লাাসুদ্ধ মানুষ গালমন্দ করতে থাকে। এমনকি নিজের মা বাবার মুখটাও সারাক্ষণ কালো হয়ে থাকে। কয়েক বছর ধরে মানে জিপিএ প্রথা চালু হওয়ার পর থেকেই এ রকম একটা ব্যাপার চোখে পরছে।

আমাদের সময়কালে জিপিএ ছিল না ছিল ডিভিশন। সেখানে এখনকার মত গ্রেড পয়েন্ট ছিল না তবে স্টার মার্কস, লেটার মার্কস,বোর্ড স্ট্যান্ড এসব বড় বড় সব স্থান ছিল। এখন সেসব নেই। যুগের পরিবর্তনের সাথে সবকিছু পরিবর্তন হয়। এটাও না হয় হয়েছে। কিন্তু তাই বলে জিপিএ বিক্রি হবে এটা মেনে নেওয়া যায় না। সর্বোচ্চ ফলাফল যদি কেনা সম্ভব হয় তাহলে সেখানে শিক্ষার মান বলে কিছুই থাকে না। অবশ্য আমাদের দেশে অনেক জিনিসই কিনতে পাওয়া যায়। সার্টিফিকেট কেনা বেচা তো হয়ই। রেজাল্ট, সার্টিফিকেট এমনকি মনুষত্ব পর্যন্ত বিক্রি হয়ে যায় এদেশে। মনুষ্যত্ব বিক্রি করে দিব্বি চোখ বুঁজে চাকরি করে যাচ্ছে সারাজীবন। কতজন ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে বছরের পর বছর চাকরি করেছে এদেশে। এমনকি তারা দেশের বড় বড় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছে। কিন্তু জিপিএ বিক্রির বিষয়টা অবশ্য নতুন। এখানেও সেই সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটটা দেশের বারোটা বাজিয়ে দিল। শিক্ষাখাতে সিন্ডিকেট, নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারে সিন্ডিকেট, পরিবহণে সিন্ডিকেট। সাধারণ পাবলিকের সিন্ডিকেট কোথায়? আজ পর্যন্ত কতজন টাকা দিয়ে জিপিএ ফাইভ কিনে সার্টিফিকেট অর্জন করেছে তা কি কোনদিন জানা সম্ভব হবে। আমার মনে হয় তা আর সম্ভব হবে না।

প্রশ্ন ফাঁস করে যারা এতকাল ভালো রেজাল্ট করেছে তারা তো বহাল তবিয়তে দেশের বড় আদৌ দেশের উন্নয়ন চায় বলে মনে হয় না। একবার ভেবে দেখলে গা শিউরে ওঠে যে আজ পর্যন্ত কত ছাত্রছাত্রী প্রশ্ন ফাঁস করে উচ্চশিক্ষা নিয়েছে, কত ছাত্রছাত্রী জিপিএ ফাইভ কিনে উচ্চশিক্ষা নিয়েছে তাদের সে সংখ্যা কত। এ তো গেল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা। এরপর চাকরির বাজারে এসেও নানা কারসাজি হয়। এখানেও প্রশ্ন ফাঁসের গোলমাল আছে, আছে টাকা এবং লোকবল খাটিয়ে পরীক্ষার হলেই ম্যানেজ করার কারসাজি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় এরকম কারসাজি করতে গিয়ে অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। এরমধ্যে একজন কলেজের অধ্যক্ষও রয়েছেন। তিনি নাকি বহুবছর যাবৎ তার সিন্ডিকেট দিয়ে এসব অপকর্ম করে গেছে। তার নাকি বড় বড় সব ডিগ্রী আছে। সাথে আছে পিএইডি! এতসব ডিগ্রী আসলে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে নেওয়া! হায় শিক্ষক! তাহলে আজ পর্যন্ত কতজন মেধাহীন যুবক তার হাত ধরে শিক্ষকতার মত একটা মহান পেশায় ঢুকে শিক্ষকতার বারোটা বাজাচ্ছে তার হিসাব কে মেলাবে। এভাবেই আমাদের দেশের মেধার মূল্যায়নে ঘাটতি থেকে যায়। মেধাহীনরা ক্ষেত্রবিশেষে মেধাবীদের সাথে প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে পরে বাহুবল যা তারা চাকরি পাওয়ার আগেই দেখিয়েছে বা রাজনৈতিক নেতার একনিষ্ঠ সমর্থক হয়ে দাপটের সাথে চাাকরি করে যাচ্ছে।

একটু চোখ কান খোলা রাখলেই এদের আলাদা করা সম্ভব। কারণ যারা মামা কাকার আর টাকার দাপট দেখিয়ে চাকরি পায় তারা কিন্তু স্বীকার করে না যে তারা মেধার জোরে চাকরি পাননি। তারাও তখন রীতিমত মেধাবী হয়ে যায়। এই হলো অবস্থা। সব সেক্টরে কমবেশি একই অবস্থা বিরাজ করছে। বাঁকা পথে সার্টিফিকেট অর্জন করে যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাথা উঁচু করে চলাফেরা করছে। তাদের মনের মধ্যে কি কখনো এই পাপের জন্য একটুও অনুশোচনা হয় না। আয়নায় নিজেকে দেখে কি একটু লজ্জাও হয় না। এভাবে দেশের বিভিন্ন সেক্টরে মেধাবীদের সাথে মেধাবীহীনরা প্রবেশ করেছে। আর তাই ভালোর সাথে খারাপ মিশে দেশটার বারোটা বাজাচ্ছে। কারন যারা এভাবে পেছন দিয়ে উচু জায়গায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখে তাদের দ্বারা দেশের উন্নয়ন হওয়া সম্ভব না। তারা এদেশে উচ্চ শিক্ষা লাভের রাস্তাটা আজও বেশ ব্যয়বহুল।

অথচ সক্রেটিস এরিষ্টোল প্লেটোর হাত ধরে যে শুদ্ধ শিক্ষার ইতিহাস বয়ে চলেছে তার বিপরীত ব্যাবহারের ফল যে আমাদের এমন বেহাল দশা করে ছাড়বে তা কে জানতো। যে শিক্ষা মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না তার কোন প্রয়োজন নেই। আজকাল যেন সেই মূল লক্ষ কেবল সার্টিফিকেট। সেটা লেখাপড়া করে হোক বা টাকা দিয়ে কিনে হোক কার্যসিদ্ধি হলেই হলো। কোনমতে একটা সার্টিফিকেট পেলেই সব শেষ। তারপর এদিক সেদিক ধরাধরি করে একটা চাকরি বাগিয়ে সমাজে দিব্বি মেধাবী সেজে ঘুরে বেড়ানো যায়। একসময় দেশে পরীক্ষায় নকল করার একটা প্রবণতা ছিল। তখন পাসের হারও কম ছিল। কিন্তু সবাই নকল করতে পারতো না। তবে আশ্চর্যের বিষয় কিন্তু সেটা নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো সেসময় পরীক্ষার কেন্দ্রে অসুদপায় অবলম্বন করলেও শিক্ষার্থীদের মেধা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতো না। কে পরীক্ষার কেন্দ্রে নকল করেছে সে বিষয়টার স্বাক্ষী কেবল আরেক পরীক্ষার্থী থেকে যেত। আজ কেন্দ্রের সামনে লেখা থাকে নকলমুক্ত পরীক্ষা কেন্দ্র। তবে শিক্ষার্থীদের মেধা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় কেন?

অনেক বড় বড় লেখক কবিদের আর্থিক অবস্থা ভাল থাকার পরেও কিন্তু তাদের অভিভাবকরা শুধু বড় চাকরি পাওয়ানোর উদ্দেশ্যে লেখাপড়া করাননি বরং তাদের ইচ্ছানুযায়ী পড়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে আজ সারা বিশ্বে বেশিরভাগ উচু দরের মানুষ কিন্তু নিজের ইচ্ছানুযায়ী পড়ালেখা করে তারপর সৃষ্টিশীল কোন কাজে বিখ্যাত হয়েছেন। শুধু চাকরি বাকরি করে টাকা কামাতে চাননি। বরং স্বপ্ন দেখেছেন আরও দশ জনকে চাকরি দেওয়ার। তাই আমাদের অভিভাবকদের বোঝা উচিত যে সন্তানের মেধা যে পথে বিকশিত হবার সুযোগ পায় বা পূর্ণতা লাভ করে সে পথেই তার প্রকৃত মঙ্গল রয়েছে। বাকি পথ কেবল জোর জবরদস্তির। আবার বিজ্ঞান বিভাগে পড়ালেখা করলেও আবিষ্কারক হওয়ার কথা কিন্তু তেমন একটা কেউ বলে না। কারণ প্রথম প্রথম ওতে শুধুই ধৈর্য্য লাগে পয়সা আসে না। কিন্তু অবাক বিষয় হলো মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেশের আনাচে কানাচে যেসব আশা প্রদানকারী নতুন কিছু আবিষ্কারের খবর চোখে পড়ে তার বেশিরভাগই তেমন উচ্চ শিক্ষিত নয়। বরং দীর্ঘদিন ঐ বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে করতে একান্তই ইচ্ছা থেকে সে আবিষ্কারটি করে ফেলে। এখানে বিজ্ঞান তার কাছে নেশা বা ভালবাসা। তাই বিষয়ভিত্তিক ভালোবাসা ভিন্ন বিষয়।

কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ফেল করলেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। বরং অন্য কোন বিষয়ে তার আগ্রহ আছে ধরে নিতে হবে। কোন নির্দিষ্ট পরীক্ষায় ফেল বা কম মার্ক পেলেই জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। জীবনের সাফল্য ব্যর্থতা নির্ভর করে মনুষ্যত্ব অর্জনে। আর তাই যারা পরীক্ষায় ফেল করেছে বা আশানুরূপ ফল করতে পারে নি তারা যেন সব শেষ হয়ে গেছে এটা মনে না করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সঙ্গ দিতে পারে সন্তানের অভিভাবক। যেসব কলেজে কোন শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি সেসব কলেজ থেকে ভবিষ্যতে মেধাবী কেউ বের হবে না সে গ্যারান্টি কেউ দিতে পারেনা। তবে পাস না করার কারণ খতিয়ে দেখা দরকার। কলেজ কর্তৃপক্ষের গাফিলতি প্রমাণিত হলে ব্যাবস্থা নিতে হবে। দক্ষ জনসম্পদ তৈরি করতে মেধাবী ছাত্রছাত্রীই প্রয়োজন। পাসের হার বৃদ্ধি করে আপাত শিক্ষার প্রসার হলেও মান না বাড়লে স্থায়ী ক্ষতি হয়। শিক্ষার বাণিজ্যিকিরণ আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য মারাত্বক। শিক্ষা যদি কোন ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তুলতে না পারে তাহলে ধরে নিতে হবে সেই শিক্ষা কেবল বিষ ঢেলেছে অমৃত নয়। আজ যারা বড় বড় পদে থেকেও বড় বড় চুরি করছে তারাও তো শিক্ষিত। তাহলে এই অন্যায় তারা করছে কিভাবে। এটা সম্ভব হচ্ছে কারণ তারা শিক্ষা অর্জন করলেও তা সার্টিফিকেট অর্জনের মধ্যেই সিমাবদ্ধ রয়ে গেছে। আর তাই শিক্ষা বিষয়টা আজ এতটা প্রশ্নবিদ্ধ।

লেখক- সাংবদিক ও কলাম লেখক

একই ধরনের আরও সংবাদ