অধিকার ও সত্যের পক্ষে

শীতে মাঠে, বর্ষায় আশ্রয়কেন্দ্রে ক্লাস

 নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

২০০৫ সালে বিদ্যালয়ের একমাত্র ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর কেটে গেছে ১৩টি বছর। কিন্তু আজও নির্মিত হয়নি নতুন ভবন। ফলে ১৩ বছর ধরেই শিক্ষার্থীরা শীতকালে মাঠে বা গাছতলায় আর বর্ষায় বিদ্যালয়ের পাশের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে ক্লাস করে। চলতি বর্ষায়ও আশ্রয়কেন্দ্রের খোলা ভবনটিতে চলছে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর পাঠদান। এসব কারণে ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি হলো কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলা সদরের দিশাবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের জীর্ণ ভবনটি কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। অধিকাংশ কক্ষের দরজা-জানালা ও গ্রিল নেই। ভবনের ভেতর-বাইরে আস্তর খসে পড়েছে। ভবনটি যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ে প্রাণহানির আশঙ্কায় শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ক্লাস করানো হয় না। পাশের আশ্রয়কেন্দ্রে চলছে পাঠদান। ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি দিশাবন্দ রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়কে দিশাবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত করা হলেও সেখানে নতুন ভবন হয়নি।

জানা গেছে, বিদ্যালয়টিতে ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে ভবন নির্মিত হয়। নির্মাণের এক বছর পর থেকেই বৃষ্টিতে ছাদ চুইয়ে পানি পড়তে থাকে। ধীরে ধীরে অনুপযোগী হয়ে পড়ে সব শ্রেণিকক্ষ। ২০০৪ সালে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলাকালে এক শিক্ষার্থীর মাথায় ছাদের কিছু অংশ খসে পড়লে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বিষয়টি প্রধান শিক্ষক আবদুল মতিন জানালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকৌশলী ২০০৫ সালে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। এর পর থেকে শীতকালে বিদ্যালয়ের মাঠে আর বর্ষাকালে কাছের আশ্রয়কেন্দ্রে চলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। এতে কিছু অভিভাবক সন্তানদের অন্যত্র ভর্তি করান।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র আজাদ হোসেন বলে, ‘পাঁচ বছর ধরে পড়াশোনা করছি। কিন্তু বিদ্যালয়ের ভবনে এক দিনও ক্লাস করতে পারিনি। কখনো মাঠে, কখনো আশ্রয়কেন্দ্রে আমাদের ক্লাস নেওয়া হয়। এখন বর্ষাকাল, আশ্রয়কেন্দ্রের চারপাশ খোলা হওয়ায় বৃষ্টিতে মেঝে ভিজে যায়। আমাদের পড়াশোনা করতে অনেক কষ্ট হয়।’ একই শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহমিনা আক্তার বলে, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের শুধু নামটিই আছে, ভবন নেই। আমরা পড়াশোনা করছি শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশ ছাড়াই।’

বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে টয়লেটও নেই। এতে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে শিক্ষিকা ও ছাত্রীদের। শিক্ষকদের বসার জন্য জায়গা নেই।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল মতিন বলেন, ‘নতুন একটি ভবনের জন্য ১৩ বছর ধরে এমন কেউ নেই যার দ্বারস্থ হইনি। বিনিময়ে মিলেছে আশ্বাস। কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর গাফিলতির কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে শিক্ষার্থীদের জীবন। তবে আমাদের বলা হয়েছে, শিগগিরই নতুন ভবন হবে। দেখা যাক নতুন ভবন জোটে কি না!’

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি মো. আবদুর রশিদ বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করলে এই বিদ্যালয় উপজেলার মডেল থাকত। কিন্তু এর বিপরীতে জুটেছে শুধুই অবহেলা। এর প্রতিকার কবে মিলবে জানি না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত চার-পাঁচ বছরে দিশাবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির জন্য দুবার নতুন ভবন বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে এক শ্রেণির লোক ভবনটি অন্য বিদ্যালয়ে নির্মাণ করিয়েছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

মনোহরগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মইনুল ইসলাম শিক্ষাবার্তা ডট কম কে বলেন, ‘দিশাবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ এই উপজেলার জরাজীর্ণ ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণের বরাদ্দ এসেছে। এখন ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলছে। আশা করি চলতি বছরেই বিদ্যালয়গুলোতে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে।’

একই ধরনের আরও সংবাদ