অধিকার ও সত্যের পথে

আমাদের তরুণ প্রজন্ম কোনদিনে যাচ্ছে?

 আরাফাত শাহীন

কিছুদিন পূর্বে এক সন্ধ্যাবেলায় বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। বাড়িতে আসার পথেই একটা ব্রিজ। আমি দূর থেকেই খেয়াল করলাম ব্রিজের ওপর বেশ কয়েকজন কিশোর বসে আছে। এদের মধ্যে কয়েকজন আমার পরিচিত। বাকিদের চিনলাম না। হয়ত ওদের বন্ধু হবে। কয়েকজনের হাতে সিগারেট। তারা একহাতে মোবাইল ফোন টিপছে আর অপর হাতে সিগারেট ধরে সুখটান দিচ্ছে। দৃশ্যটা আমাকে অবাক করল; সেইসাথে মর্মাহত। এদের মত ছেলেদের তো এই সময়ে এখানে বসে সিগারেট টানার কথা নয়! আমরা এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে প্রকাশ্যে দূরে থাক গোপনেও সিগারেট টানার কথা চিন্তা করতে পারি না। অথচ মাধ্যমিক পড়ুয়া এসব ছেলেরা কীভাবে অধঃপতনের শিকার হয়েছে! পরিচিতদের ধমক দিতে সবাই উঠে বাড়ির দিকে রওনা হলো। তখনের মত না হয় তাদের বাড়িতে পাঠানো গেল কিন্তু বাকি সময়টাতে তাদের দিকে খেয়াল রাখবে কে?

আমাদের দেশে রাস্তাঘাটে চলতে গেলে সচরাচর এমন ঘটনা চোখে পড়ে। আমরা হয়ত কিছু না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে যাই। তবে আমাদের কিশোর এবং তরুণ সমাজ যেভাবে দিনদিন ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে চুপ করে থাকা সমীচীন নয়। একটি দেশের উন্নতি এবং অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তরুণরা ইচ্ছা করলে একটি দেশকে দ্রুততর সময়ের মধ্যে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। আবার একটি দেশের জন্য তার তরুণ প্রজন্ম যখন বোঝা হয়ে দাঁড়ায় তখন তা সেই দেশের জন্য তখন ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যখন নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করার পরিবর্তে গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেদের গা ভাসিয়ে দিতে থাকে তখন সেই দেশের জন্য ধ্বংস অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে কারা তা নিশ্চয়ই জানেন। সেদিন আমাদের দেশের প্রতিটি তরুণ অস্ত্র হাতে নিয়ে শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। সেদিন যদি তারা দেশের এই নাজুকতম পরিস্থিতিতে হাত গুটিয়ে ঘরে বসে থাকতেন তাহলে কী হতো তা বলা কঠিন। শুধু আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধই নয়, আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী যেকোনো আন্দোলন সংগ্রামে সামনে থেকে আমাদের তরুণেরা নেতৃত্ব দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন।

সেদিনের সেই তরুণদের সাথে আজকের দিনের তরুণদের তুলনা করতে গেলে বিস্ময়ে আমাদের হতবাক হয়ে যেতে হয়। আমাদের বুঝতে খুবই কষ্ট হয়, তাদের সাথে আমাদের এই প্রজন্মের তরুণদের পার্থক্য এতটা প্রকট হলো কীভাবে! বিশ্ববিদ্যালয়ে বাবা-মা বহু ত্যাগ এবং সাধনার পর তাদের সন্তানকে শিক্ষা গ্রহণ করে মানুষ হবার জন্য পাঠান। অথচ আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মাদকের আখড়া। কিছুদিন পূর্বে আমি আমার একটা বন্ধুকে নিয়ে হলে একজন বড়ভাইয়ের রুমে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম সবাই মিলে মনের সুখে গাঁজা টানছে। ভাবা যায়! বিশ্ববিদ্যালয়ের মত একটা পবিত্র জায়গাকে আমরা গাঁজা সেবনের জায়গা বানিয়ে ফেলেছি। ঘেন্নায় গা রি রি করে উঠল। দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জায়গার অবস্থা এই সেখানে সারা দেশ যে মাদকে ডুবে আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মাদকের মত আরেকটি বিষয় আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আর সেটা হলো- ইন্টারনেট প্রযুক্তি। দিনদিন ইন্টারনেট প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতির ফলে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন পূর্বের চেয়ে বহুলাংশে উন্নত হয়েছে তেমনি আমাদের তরুণ প্রজন্ম মাদকে আসক্ত হওয়ার মত ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবে আসক্ত হয়ে পড়ছে। তারা ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় ব্যয় করছে। মোবাইল ফোন নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকার ফলে নতুন প্রজন্ম হতাশা এবং মানসিক বিকারগ্রস্ততার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। শুধু তাই নয়, বর্তমান সময়ে কিশোর ও তরুণদের দ্বারা ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং ধর্ষণের মত ঘটনা বহুলাংশে বেড়ে গিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলেই এসব অপরাধ দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে।

আমরা যে সময়ে বেড়ে উঠেছি সেই সময়ে শিক্ষক এবং গুরুজনদের প্রতি মনে প্রবল শ্রদ্ধা  নিয়েই বেড়ে উঠেছি। বাবা-মা বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বারবার বলে দিতেন রাস্তায় কোনো শিক্ষকের সামনাসামনি পড়ে গেলে সাইকেল থেকে নেমে সালাম দেবে এবং কখনও সাইকেল চালিয়ে শিক্ষকের আগে পার হয়ে যাবে না। আমার ছাত্রজীবনে এই উপদেশ আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি এবং এখনও সেটা করে চলেছি। কিন্তু আমাদের এই প্রজন্মের মধ্যে শিক্ষক এবং গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধার মনোভাব তেমন একটা নেই। বরং যেভাবে দিনদিন ছাত্রদের দ্বারা শিক্ষক লাঞ্ছিতের ঘটনা বেড়ে চলেছে তাতে আমাদের শঙ্কিত হতে হয়।

আমাদের তরুণ প্রজন্ম নিশ্চিত একটা গভীর সংকটের মধ্যে পড়ে রয়েছে। অথচ তারা সেটা মোটেও অনুভব করতে পারছে না। তাছাড়া যাদের উচিত ছিলো তরুণদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বিষয়টা দেখিয়ে দেওয়া তারাও আজ চুপচাপ রয়েছে। বিষয়টা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। একটি দেশের তরুণ প্রজন্ম যদি বিপদগামী হয়ে পড়ে তাহলে সেই দেশের পক্ষে সামনের দিকে এগিয়ে চলা বড়ই কঠিন। আমাদের পিতামাতাকে খুব বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সন্তানের ভালো-মন্দ তাদেরকেই দেখতে হবে। সন্তান কী করে, কোথায় যায়, কার সাথে মেশে এই বিষয়গুলোর দিকে যদি একটু লক্ষ্য রাখা যায় তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান আপনাআপনি হয়ে যায়। সেইসাথে আমাদের তরুণদেরকেও বুঝতে হবে যে তারা দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। এতে তাদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে এবং তারা সঠিক পথে অগ্রসর হতে পারবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

একই ধরনের আরও সংবাদ