অধিকার ও সত্যের পক্ষে

কিশোরগঞ্জে কিংবদন্তীর পাগলা মসজিদ

 অধ্যাপক মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ

কিংবদন্তী কী সত্য, না ঐতিহাসিক তা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ বিষয়। কিংবদন্তী অর্ধ-সত্য ও অর্ধ-ঐতিহাসিক। সত্যের খোলস ইতিহাস এবং ইতিহাসের কঙ্কাল কিংবদন্তী। ঐ কঙ্কালে কল্পনার লেবাস লাগিয়ে ইতিহাস হেটে চলে মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায়। জনশ্রুতি, গল্প-গীত, ইত্যাদির যত্ন কিংবদন্তী বেঁচে থাকে পরম সম্মানে এবং বড় হয় গর্বের মান্যতায়। এ দিক বিবেচনায়, মহাকালের স্রোতধারায় ঐতিহ্যের স্মারক জেলা শহর কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদ।
শোলাকিয়া ঈদগাহ্র ঐতিহ্যে গর্বিত শহর কিশোরগঞ্জের অনন্য অহঙ্কার, দু’শতাব্দী প্রাচীন পাগলা মসজিদ। পাগলা মসজিদের দানবাক্সে দৈনিক প্রায় লাখ টাকা জমা পড়ে। দান বাক্স খুললেই পাওয়া যায় স্বর্ণালঙ্কার, বৈদেশিক মূদ্রা অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী। মুসলিম-অমুসলিম সবাই এ মসজিদে দু’হাত খুলে দান করেন। কারণ, মানুষের বিশ্বাস একনিষ্ঠ মনে এখানে মানত/দান করলে রোগ-শোক বালা-মসিবত দূর হয়।
গত ৭ জুলাই ২০১৮ শনিবার মসজিদের পাঁচটি দানবাক্সে পাওয়া গেছে ৮৮ লাখ ২৯ হাজার ১৭ টাকা। ৩১ মার্চ ২০১৮ পাওয়া যায় ৮৪ লাখ ৯২ হাজার ৩৭৫ টাকা। সাধারণত ৩/৪ মাস পর দানবাক্স খুললেই এমন বিপুল পরিমাণ টাকা পাওয় যায়। ৬ জানুয়ারি ২০১৮ পাওয়া গেছে, ১ কোটি ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ৪৭১ টাকা। ২০১৭ সালের এপ্রিলে পাওয়া গেছে ১ কোটি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৩২ টাকা। ২০১৭ আগস্ট মাসে ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৫ হাজার ১৭০ টাকা। ২০১৬ সালে ২ কোটি ৪৫ লাখ ৫২ হাজার ৬৪৪ টাকা। ২০১৫ সালে প্রচুর পরিমাণ টাকা ও ২৩৮ ভরি স্বর্ণ ৮৬ ভরি রূপা, হিরার আংটিসহ অন্যান্য মূলবান সামগ্রী নিলামে তুলে মসজিদে প্রচুর আয় হয়।

‘পাগলা মসজিদ’ কিশোরগঞ্জ শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত। মসজিদটিতে রয়েছে পাঁচ তলা উচ্চু দৃষ্টি নন্দন মিনার। কিংবদন্তী রয়েছে, সহসা প্রমত্তা নরসুন্দার বুকে পানিতে ধ্যানরত এক ভাসমান দরবেশের আবির্ভাব হয়। তাঁর কল্যাণেই নদীর মাঝে চর জেগে ওঠে। নদী তীরবর্তী রাখুয়াইল গ্রামের এক গৃহস্থের গাভী নিয়মিত নদী সাতরিয়ে গিয়ে ঐ দরবেশের ভাÐে ওলানের দুধ দিয়ে আসতো। এতেই গাভীর দরিদ্র মালিক ও স্থানীয়দের চরম বৈষয়িক উন্নতি হয়। এমন আরো অসংখ্য কারামতিতে বিমুগ্ধ মানুষজন ঐ দরবেশের খেদমতে হুজরাখানা তৈরী করে। দরবেশের মৃত্যুর পর তাঁর হুজরাখানার পাশেই পাগলা সাধকের স্মৃতিতে ‘পাগলা মসজিদ’ নির্মিত হয়। এ জনশ্রæতির ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় নি।
‘পাগলা মসজিদ’ কিশোরগঞ্জের জীবন্ত কিংবদন্তী। আরেক জনশ্রুতি হলো, হয়বতনগরের প্রতিষ্ঠাতাদের পরিবারের এক নিঃসন্তান বেগমকে জনগণ ‘পাগলা বিবি’ বলে ডাকতো। দেওয়ান বাড়ির এ বেগম নরসুন্দার তীরে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে একটি মসজিদ নির্মাণ করলে ‘পাগলা বিবি’র নামে পরিচিতি পায়। মাকসুদ হাসিলের নানান কিংবদন্তী রয়েছে পাগলা মসজিদ সম্পর্কে।
হয়বতনগর দেওয়ানবাড়ির ১০ শতাংশ ওয়াকফ সম্পত্তিতে গড়ে ওঠা পাগলা মসজিদের বর্তমান জমির পরিমাণ ৩ একর ৮৮ শতাংশ। মসজিদে মহিলাদের নামায আদায়ের আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদের অর্থায়নে গড়ে উঠেছে এতিমখানা ও মাদ্রাসা। এখানে ছেলেমেয়েদের থাকাখাওয়া, পোশাকসহ লেখাপড়ার খরচ বহন করা হয়।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি। তাঁর তদারকিতে মসজিদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত স্বচ্ছ। পাগলা মসজিদের অর্থায়নে এলাকার অন্যান্য প্রাচীন মসজিদের সংস্কার ও উন্নয়ন করা হচ্ছে। এলাকায় দরিদ্র অসহায় অসুস্থ অসচ্ছল পরিবারের জন্য পাগলা মসজিদ থেকে অনুদান দেওয়া হয়। লেখাপড়া, চিকিৎসা, অভাবী নারীর বিয়ের সময় সাহায্য করা এ মসজিদের গণমুখী কার্যক্রমের অংশ।
সব মিলে শান্তি-সহাবস্থান, জান্নাতি পরিতৃপ্তির স্থাপত্য নিদর্শন ‘আল্লাহ্র ঘর: মসজিদ’গুলো টিকে থাকবে অনন্তকাল। এ ক্ষেত্রে ঐতিহ্যের বিজয়কেতন উড়িয়ে তাওহিদের বার্তা শোনায় দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য এবং ভাটি বাংলার কিংবদন্তীতুল্য ঐতিহ্য কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদ। তবে কিংবদন্তী তো কিংবদন্তীই। কেননা, রহস্যাবৃত্ত লোকজ ভাবনাই কিংবদন্তীর অবলম্বন। অন্যদিকে সভ্যতার পাথর চাপা সত্য সামান্য ঝলকানিতে মিলিয়ে যাবে না, যদি ক্যামেরা-ক্যাসেট হাতে মানুষ লোকায়ত বাংলার মেঠোপথে একটু পা বাড়ায়। আর তখন কিংবদন্তীগুলো হয়ে ওঠবে জীবন্ত এবং বিশ্বাসের কাছাকাছি প্রায় সত্য।
তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা:
১) ময়মনসিংহে ইসলাম: আবদুল করিম (ইফাবা)।
২) কিশোরগঞ্জ জেলা: জাতীয় তথ্যবাতায়ন।
৩) বাংলা ট্রিবিউন।
৪) খন্ড ০৩, বাংলাপিডিয়ায় কিশোরগঞ্জের ধর্মীয় স্থান সংক্রান্ত আলোচনায় পাগলা মসজিদের নাম আছে।
৫) দৈনিক ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও নিজস্ব অভিজ্ঞতা।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ইসলামিক স্টাডিজ কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ কাপাসিয়া গাজীপুর 

একই ধরনের আরও সংবাদ