অধিকার ও সত্যের পথে

“শিক্ষকদের  জন্য বিশেষ বেতন স্কেল ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা  ” 

 আলী আকবর:  

মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে জাতীয়  শিক্ষানীতি  ২০১০ এর আলোকে  শিক্ষকদের জন্য বিশেষ বেতন স্কেল  প্রণয়নের  পরিকল্পনা  রয়েছে বলে   শিক্ষামন্ত্রী নরুল ইসলাম নাহিদ  গত বৃহস্পতিবার   জাতীয় সংসদকে জানান। সরকার দলীয় সদস্য নুরুন্নবি শাওনের এক প্রশ্নের জবাবে  মাননীয় মন্ত্রী বলেন”  মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে  ও  তাদের দক্ষতা বাড়াতে সরকার ইতোমধ্যে  গাজীপুরে দেশের এক মাত্র বিশেষায়িত  প্রতিষ্ঠান  ” বঙ্গ বন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ডিজিটাল ইনভারসিটি অব বাংলাদেশ”  প্রতিষ্ঠার উদ্রোগ গ্রহন  করেছে।

মাননীয় মন্ত্রীমহোদয়ের   এ   আশার বাণী  শিক্ষকতাকে যারা পেশা হিসেবে বেছে নেবেন- তাদেরকে কিছুটা হলেও আশান্বিত করবে- তাতে সন্দেহ নেই।  কিন্তুু  আশার স্বপ্ন দেখিয়ে  তা বাস্তবায়ন করতে না পারলে  ভুক্তভোগীদের মাঝে চরম হতাশা ও ঘৃণার  উদ্রেক  সৃষ্টি হয়।  উল্লেখ্য মন্ত্রীমহোদয়ের  এ  প্রতিশ্রুতি   শিক্ষকদের জন্য নতুন কোন প্রতিশ্রুতি  নয়।  শিক্ষামন্ত্রীর পদ অলংকৃত  করার পর  বিগত বছর গুলিতে  তিনি বহুবার   বিভিন্ন সভা – সেমিনারে বলেছেন ” শিক্ষকদের  দেয়া হবে  স্বতন্ত্র  বেতন স্কেল ।  তাদের বেতন হবে লক্ষ টাকা” …… ইত্যাদি।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্যে,  এ দেশের  শিক্ষক  সমাজ  , বিশেষ   করে বৈষম্যে ভারাক্রান্ত  বেসরকারি শিক্ষকরা  ভেবে ছিলেন- এই বুঝি তাদের  দুর্ভাগা  ভাগ্যের পরিবর্তন হবে ……..!    কেননা  সংশ্লিষ্ট  মন্ত্রণালয়ের  দায়িত্ব প্রাপ্ত কোন মন্ত্রী যখন কোন   পেশাজীবীদের  দাবীর ব্যাপারে বক্তব্য দেন  তা বাস্তবায়িত হবে এটাই  স্বাভাবিক ।  কিন্তু  এ দেশের শিক্ষকদের  পোড়া  কপাল!    তাদেরকে  বিগত নয় বছর যাবৎ  বিশেষ স্কেল নামক যে  সোনার হরিণের  স্বপ্ন  দেখিয়ে   ছিলেন – সময়ের  দীর্ঘ পরিক্রমায় এসেও তরা এর বাস্তবায়ন দেখতে পান নি।

সত্যি কথা বলতে কি বেসরকারি  শিক্ষকরা বর্তমানে  বিশেষ বা ব্যতিক্রম  এক বেতন স্কেলই   ভোগ করছেন ! জাতীয় বেতন স্কেলের  অন্তর্ভুক্ত  হওয়া সত্ত্বেও  এখনো  তাদের ভাগ্যে জোঁটেনি ৫% ইনক্রিমেন্ট।   এখনো  বঞ্চিত রয়ে গেল  সার্বজনীন  বৈশাখী  ভাতা  থেকে। অথচ  সরকারি স্কুল কলেজে কিংবা অফিসের দপ্তরী  থেকে পিয়ন  পর্যন্ত সবাই  পেলেন উক্ত সুবিধা – শুধু বাদ পড়লেন  বেসরকারি শিক্ষক সমাজ।  ১৯৮৪  সাল থেকে  ২০০ টাকা বাড়ি ভাড়া ১০০টাকা চিকিৎসা ভাতা  চলেছে  যুগের পর যুগ। শিক্ষকদের  ব্যাপক  আন্দোলনের মুখে   ২০১২ সালে   বাড়ি ভাড়া ২০০টাকা  থেকে  বাড়িয়ে ৫০০ টাকা   করা হয়।   অথচ জাতীয় প্রচার মাধ্যমে  তখন ঘোষণা   করা  হলো শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া পাঁচ গুন বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে  শিক্ষক নিয়োগে  এতদিন কোন স্বচ্ছ নীতিমালা  ছিলনা।  ম্যানেজিং কমিটির  সুনজরে থাকা প্রার্থীরাই অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ পেতেন।  বঞ্চিত হতেন  মেধাবীরা।
অবশেষে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাব দিহিতা   আনার লক্ষ্যে   বর্তমান সরকারের আমলে “NTRCA”  বা  বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন   কমিটি গঠনকরা হয় – যাদের কাজ হলো  যোগ্যতার ভিত্তিতে মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ করা।  আশার কথা হলো- ইতোমধ্যে শিক্ষক নিয়োগে যে অনিয়ম ছিল তা অনেকটা কমে এসেছে।

কিন্তু  এর পরও কি আমাদের দেশে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আকৃষ্ট হতে পারছে?  উত্তরটা অনেকটা নেগেটিভ । কেননা  সংবাদে প্রকাশ, বিগত বিসিএস পরীক্ষায়  শিক্ষা ক্যাডারে চান্স পাওয়া  প্রায়    ডজন খানেক মেধাবী প্রার্থী  ঔ ক্যাডারে যোগদান না করে  পুলিশ প্রশাসন সহ অন্যান্য  লোভনীয় পেশায়   যোগদান করেছে।   কেননা  মেধাবীরা জানে  শিক্ষকতা পেশায় অর্থের  জৌলুশ  নেই।  এ পেশায় রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়া যায় না।

উল্লেখিত তর্থ্যে আমদের দেশে মেধাবীদের  শিক্ষকতা পেশা নির্বাচনে এক  হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে।   এতে সহজেই অনুমেয়   সরকারি চাকুরি হওয়া সত্ত্বেও  মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশা বেছে নিতে চান না।  সরকারি চাকুরিতে যদি  মেধাবীদের এ অবস্হা হয়, তা হলে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে  যেখানে নেই সামাজিক মর্যাদা, নেই অর্থনৈতির নিশ্চয়তা –  যাদের নুন আনতে পান্তা  ফুরায়   কোন আশায় তারা এ  পেশায় আসবে! আমাদের দুর্ভাগ্য  আমরা  এতদিন যাবৎ  এ দেশের মেধাবীদের   শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় আকৃষ্ট করতে পারিনি। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে – মেধাবীরা যদি শিক্ষকতা পেশায় না আসে তা হলে মেধাবী শিক্ষার্থীর সৃজন হবে কিভাবে?   ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষাবিধ  আবুল কালাম যথার্থই বলেছেন-            “জাতীর  শ্রেষ্ঠ সন্তান ক্লাস রুমের পেছনের বেঞ্জ থেকেও পাওয়া যেতে পারে। আর এ জন্য প্রয়োজন  শাণিত  মেধার উদ্ভাবনী  শিক্ষক- যিনি  তার শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলবেন আপন অবয়বে। “

বিশ্বের উন্নত দেশ সমূহের  দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে  তাদের উন্নয়নের মূলে রয়েছে শিক্ষা।শিক্ষাকে তারা উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে।  আর শিক্ষার  প্রধান নিয়ামক হলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী।  শিক্ষার্থীদেরকে যথাযথ মানব সম্পদে পরিণত  করার লক্ষ্যে সেসব দেশ  শিক্ষকতা পেশাকে করেছে  আকর্ষণীয় ও লোভনীয় ।

২০১৬  সালে কোরিয়ার একটি  গভেষণা   সংস্হা সে দেশে মাধ্যমিক ও হাই স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে  পেশা নির্বাচনের ব্যাপারে একটি জরীপ  চালিয়ে ছিল।  জরীপে মাধ্যমিকের ৬২হাজার ২০৩ জন,   হাইস্কুল লেভেলের ৪৪ হাজার ৯৩৭ জন শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল  ভবিষ্যৎ এ তারা পেশা হিসেবে কি বেছে নিতে চায়।  উত্তরে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে।   কারন হিসেবে তারা  উল্লেখ করে   মাধ্যমিকে  ও হাইস্কুল লেভেলে ঔ দেশে এক জন শিক্ষকের বেতন যথাক্রমে  ৩৫ লাখ ১১ হাজার উওন ও ৪০ লাখ উওন  যা ঔ দেশের অন্য যে কোন  পেশার চেয়ে ঈর্ষণীয় বেতন স্কেল। কিন্ত দুঃখজনক হলেও বাস্তব আমাদের দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে এক জন বেসরকারি  সহকারি শিক্ষকের বেতন সর্বসাকুল্যে  যথাক্রমে ১২৮০০ (বিএডছাড়া) ১৬৫০০ (বিএড) ও ২২১৮০ টাকা।
(সারা জীবনে একটি মাত্র টাইম  স্কেল নিয়ে)
তাই স্বভাবতই  প্রশ্ন জাগে – এ দেশে  মেধাবীরা   কেন  স্বল্প বেতনে শিক্ষকতার মতে পেশার  প্রতি আকৃষ্ট হবেন (?)

আমাদের শিক্ষা  ব্যবস্হা মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত। একটি সরকারি। অন্যটি বেসরকারি।  এ দুটি ধারার মধ্যে আবার আকাশ -পাতাল  বৈষম্য।   সরকারি ও ক্যাডেট কলেজ  সমূহে মাত্র ৩% শিক্ষার্থীরা লেখা পড়া করার সুযোগ পাচ্ছে।  পক্ষান্তরে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া  করছে ৯৭% শিক্ষার্থী।   পরিসংখ্যানে  দেখা  যায়- ক্যাডেট কলেজের এক জন শিক্ষার্থীর পেছনে সরকারি ব্যয় প্রতি মাসে ২৬০০০ (ছাব্বিশ হাজার টাকা)। অথচ   সুবিধা বঞ্চিত   ৯৭%  অধ্যয়নরত  বেসরকারি  শিক্ষার্থীদের  জন্য রাষ্টীয় ব্যয় অতি নগন্য।

বর্তমান পূজিবাদী সমাজে অর্থনৈতিক মানদন্ডকে কোনক্রমেই  অস্বীকার করা যায় না। গ্রোবাল ভিলেজ এ রুপায়িত এ পৃথিবীতে  যেখানে অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভবান হওয়া যায় মানুষ সেখানেই  ছুঁটে।  বাংলাদেশের  মতো উন্নয়নশীল  দেশেও তার ব্যতিক্রম নয়।  আমাদের দেশে মেধাবী ছাত্র- ছাত্রীর আকাল হয়েছে এমনটি নয়। সত্যিকারের মেধাবীদেরকে আমরা লালন করতে পারছি না।  তাই প্রতি বছর উল্লখযোগ্য সংখ্যক মেধাবীরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। বিদেশে গিয়ে অনুকূল  পরিবেশ পেয়ে, মেধার স্ফুরণ  ঘটিয়ে বিশ্ব ব্যাপী  আলোড়ন  তুলেছেন -এমন সংখ্যাও নেহায়েত  কম নয়।

আমদের  উপলব্ধি করতে  হবে যে, শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন  করে কোনো জাতীই  শিক্ষার উন্নয় করতে পারনি।  বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক  হোয়াইটহেড বলেছেন। “No  system of education  is better than a teacher ”  অর্থাৎ কোনো শিক্ষা ব্যবস্হাই  শিক্ষকের চেয়ে উন্নত নয় “শিক্ষকই শিক্ষা ব্যবস্হার প্রাণ।  তাই মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা ব্যতিত  পুরো শিক্ষা ব্যবস্হার উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষক সমাজ  আশা করে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহান সংসদে দাঁড়িয়ে মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে যে  বিশেষ  স্কেলের আশ্বাস  দিয়েছেন  তা যেন অচিরে বাস্তবায়িত হয় ।

লেখক:  শিক্ষক, কলামিষ্ট ও সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি গাজীপুর জেলা শাখা।

একই ধরনের আরও সংবাদ