অধিকার ও সত্যের পথে

রাজনৈতিক চিকিৎসা এবং নন্দলাল সংস্কৃতি

 এ কে এম শাহনাওয়াজ

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিখ্যাত নন্দলাল কবিতার কয়টি লাইন দিয়ে শুরু করতে চাই। “নন্দর ভাই কলেরায় মরে, দেখিবে তাহারে কেবা!/সকলে বলিল, ‘যাও না নন্দ, করো না ভায়ের সেবা’/নন্দ বলিল, ‘ভায়ের জন্য জীবনটা যদি দিই—/না হয় দিলাম,—কিন্তু অভাগা দেশের হইবে কি?”

আমাদের দেশের ক্ষমতাবান নেতা-নেত্রী যাঁরা পালাক্রমে এ দেশের সরকার গঠন করেন, তাঁদের কোনো কোনো আচরণ দেখলে আমার নন্দলালের কথা মনে হয়। সাধারণ ধারণা, যুক্তি ও বাস্তবতায় যেহেতু দেশে রাজতন্ত্র চালু নেই, দেশটি রাজা বা রাজপরিবারের সম্পত্তি নয়, সংবিধানের ভাষায় এটি গণতান্ত্রিক দেশ। এই দেশের মালিক নাকি জনগণ। সাধারণ মানুষ। বলা হয় রাজনীতিকরা, বিশেষ করে যেসব দল ক্ষমতায় থাকে বা যাওয়া-আসা করে সেসব দলের নেতা-নেত্রীরা সবাই জনগণের সেবক। জনগণের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব তাঁদেরই। সাধারণ অর্থে সেবক মালিকের সুখ-সুবিধা দেখবেন। নিজের সুখ-সুবিধার কথা ভাববেন সবার পরে।

জনগণের অন্যতম প্রয়োজনীয় বিষয় চিকিৎসাসেবা। স্বাধীনতা-পূর্বকালের কথা বাদ দিলাম। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে কি এ দেশে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি হয়নি? নিশ্চয়ই হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা বেড়েছে। উপজেলা পর্যন্ত হেলথ কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার তো অগুনতি। তার পরও জনসংখ্যার বিচারে স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ আছে, শহর কেন্দ্র থেকে দূরের হাসপাতালগুলোতে ডাক্তারদের সব সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। চাহিদামতো ওষুধপত্র থাকে না। সরকারি বেশির ভাগ হাসপাতালে চাহিদার তুলনায় বেড খুব অল্প। মেঝেতে, করিডরে গাদাগাদি রোগী। বিনা চিকিৎসা আর ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর কথা সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই শোনা যায়। মাঝেমধ্যেই রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ডাক্তার-নার্সদের হাতাহাতির ঘটনার কথা সংবাদপত্রে আর টিভি চ্যানেলে লিড নিউজ হয়। অবশ্য আমজনতার বাইরের শ্রেণি বড়লোকের জন্য তৈরি হয়েছে অনেক বড় আধুনিক বেসরকারি হাসপাতাল। অর্থের জোর না থাকায় গরিব মানুষ সেখানে চিকিৎসা পায় না।

দুর্ভাগ্য এই, জনগণের সেবকদের সাধারণত সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যেতে দেখা যায় না। যেন বলতে চাচ্ছেন আমরা ক্ষমতায় থেকে যে হাল করে রেখেছি হাসপাতালের, সেখানে দেশের মালিক সাধারণ জনগণ চিকিৎসা করুক। আমরা সেবক। নন্দলালের দর্শনমতো দেশসেবার জন্য আমাদের বাঁচতে হবে। তাই অগত্যা ধনীদের বেসরকারি হাসপাতালে যাব অথবা হাতের ব্যথা, নাকের ব্যথা বা চোখের ব্যথা সারাতে সরকারি টাকায় অথবা দলের ফান্ড ভেঙে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা সৌদি আরব যাব। নন্দলাল কলেরায় আক্রান্ত ভাইয়ের সেবা করায় রাজি ছিলেন, তবে বৃহত্তর কল্যাণে জনগণের জন্য নিজের বেঁচে থাকাটাকেই জরুরি বিবেচনা করলেন।

আমাদের নেতা-নেত্রীদের অনেকেই যেন নন্দলালের ভাবশিষ্য। না হলে যাঁদের দায়িত্ব ছিল জনগণের চিকিৎসাসেবার সুবন্দোবস্তের দায় গ্রহণ করার, তাঁরাই নিজেদের চিকিৎসার প্রশ্নে লজ্জার মাথা খেয়ে প্রথম শ্রেণির হাসপাতালগুলোতে যেতেও নাক সিটকান। বলেন, এখানে ওই মেশিনটি ভালো না, ওখানে স্বস্তি পাবেন না বলে যাওয়া চলবে না। আমার পছন্দ অমুক বড়লোকি বেসরকারি হাসপাতাল। ওখানে ভর্তি না করলে (বিনা চিকিৎসায় মরব তবু) গাল ফুলিয়ে বসে থাকব।

দুর্নীতির দায়ে কারারুদ্ধ বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে যে অপ্রীতিকর দৃশ্য চিত্রণ হচ্ছে, তা দেখে মনে হয় নন্দলালের দর্শন যেন ফিরে আসছে। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সমাজের স্বার্থপর চরিত্রের প্রতীক হিসেবে নন্দলালকে হাজির করেছিলেন, আর এখানে স্বার্থবাদী কপট রাজনীতির নিকৃষ্ট রাজনৈতিক ঝগড়া শুরু হয়েছে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা প্রশ্নে। কপট শব্দটি এ জন্য ব্যবহার করলাম, কারণ এসব দলের নেতা-নেত্রীরা দমে দমে গণতন্ত্রের জন্য কান্নাকাটি করেন, আর মঞ্চে বসে জিকিরের মতো করে ‘জনগণ’ শব্দটি ব্যবহার করেন। অথচ রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেও যে দেশের সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত সেবকরা, আবার বড়াই করে বলেন ‘…তিনবারের প্রধানমন্ত্রী’; এই যোগ্যতায় তাঁদের কী অধিকার আছে হাসপাতাল বাছাই করার? তিনবারের প্রধানমন্ত্রী অর্থাৎ তিনবারের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের সেবকের চিকিৎসার জন্য ভর্তি হওয়া উচিত ছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে অথবা বড়জোর বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাবেক সামরিক কর্মকর্তার স্ত্রী কোটায় হয়তো সিএমএইচেও তাঁর চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার থাকতে পারে। তিনি কেন জনগণের সেবক হয়েও রাজধানীর অন্যতম ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গোঁ ধরে থাকবেন। আর তাঁর দলের নেতা-নেত্রীরা লজ্জার মাথা খেয়ে সাধারণ জনগণের প্রতি কমিটমেন্ট ভুলে গিয়ে নিজ নেত্রীকে রাজতন্ত্রের যুগের রানি ভেবে নেত্রীর ইচ্ছা তামিলের জন্য রাষ্ট্রের ওপর চাপ  দেবেন। নাকি আমাদের দেশের সুবিধাভোগী রাজনীতির অভিজাতরা মাটির পৃথিবীতে পা রাখেন না। জনগণের সুখ-দুঃখ বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। অনেকটা মারিয়া অ্যান্টোনিয়ার মতো। ফরাসি বিপ্লবের সময় সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের স্ত্রী মারিয়া অ্যান্টোনিয়া প্রাসাদের বাইরে লাখ লাখ বিদ্রোহী কৃষকের স্লোগান শুনে সভাসদদের কাছে কারণ জানতে চান। তাঁরা জানালেন রুটির দাবিতে কৃষকরা আন্দোলন করছে। জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকা সম্রাজ্ঞী সরল উক্তিতে বলেছিলেন, রুটি না পায় তো ওদের কেক খেতে বলো!

আমাদের জানা মতে খালেদা জিয়া কোনো রাজবন্দি নন। দুর্নীতির দায়ে আদালতের রায়ে কারাবন্দি আসামি। একটি বড় দলের নেত্রী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলে ডিভিশন পেয়ে একই ধরনের অপরাধীর মতো সাধারণ সেলের বদলে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় অন্তরীণ আছেন। অন্য কয়েদিরা চিকিৎসার জন্য এত সব বায়না ধরতে পারেন কি না আমার জানা নেই। বা জেলকোড অনুযায়ী খালেদা জিয়ার মতো ডিভিশন পাওয়া আসামির আবদার করার অধিকার কতটুকু আছে আমি জানি না। আইন বা নিয়ম অনুযায়ী তিনি যদি তাঁর মর্জিমাফিক হাসপাতালে চিকিৎসা করার অধিকার রাখেন, তবে সরকার নিশ্চয়ই সেই অধিকার না দিয়ে অন্যায় করছে। আর তা না হলে ‘একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী, মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী আর তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী’ বলে বিশেষ সুবিধা আদায়ের কথা বলা হলে তা হবে সাধারণ মানুষ ও সাধারণ কয়েদির অধিকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করা। এই মানসিকতা যাঁরা লালন করবেন জনগণের নেতা-নেত্রী বলার দাবিদার তাঁরা হতে পারেন না।

এখন সরকারপক্ষ বা আওয়ামী লীগের নেতারা শুধু বলছেন তা নয়, সাধারণ মানুষও মনে করছে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার কথা তুলে বিএনপি তার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চাইছে। এমন ভাবনার অনেক কারণ ও যুক্তি রয়েছে। তার আগে আমরা প্রার্থনা করব, যদি খালেদা জিয়া সত্যিই স্বাস্থ্যগত কারণে তেমন সঙ্গিন হয়ে থাকেন, তবে বিধাতা যেন তাঁর আরোগ্য বিধান করেন। প্রথম খটকা হচ্ছে, বিএনপি নেতাদের ভাষ্যমতে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত অবস্থা যদি তেমন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকে তবে বিশেষ হাসপাতালের জন্য গোঁ না ধরে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করার কথা। আমাদের জানা মতে, দেশের সেরা দুই হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তাবই রাখা হয়েছিল। বারবার খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের প্রতি ভরসার কথা বলছিল বিএনপিপক্ষ। সরকারপক্ষ তো সেই ইচ্ছার প্রতিও সম্মান জানিয়েছে। বলা হয়েছে, যেখানেই ভর্তি করা হোক তাঁর চিকিৎসকরা সেখানে যেতে পারবেন। আসলে লেবু বেশি কচলালে নাকি তিক্ত হয়ে যায়। তেমনটিই দেখলাম আমার চেনা এক গৃহবধূ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুদি দোকানির বক্তব্যে। খালেদা জিয়া জেলবন্দি হওয়ার পর তাঁরা ওই নেত্রীর প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন। এত সব নাটকের পর তাঁদের আবেগ অনেকটা কমে গেছে। মুদি দোকানির বক্তব্য, স্যার, শরীরের অবস্থা তেমন খারাপ হলে কেউ বসে থাকে না। আসলে ওই বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হলে নেতাকর্মীদের সঙ্গে রাজনীতি করতে পারবেন। পরিচিত গৃহবধূটিরও খালেদা জিয়ার প্রতি আগের মতো ততটা সহানুভূতি আর নেই। তাহলে কি ভুল রাজনীতির পথে হেঁটে বিএনপি আরেকবার পা পিছলালো!

নিয়মতান্ত্রিক আর সততার সঙ্গে রাজনীতি না করায় বিপদ আছে। খালেদা জিয়ার দুর্ভাগ্য রাজনীতির ফায়দা নেওয়ার জন্য যূূপকাষ্ঠে বারবার তাঁর ঘাড়টাকেই রাখা হয়। জিয়াউর রহমান-উত্তরকালে খালেদা জিয়াকে দিয়ে বলানো হলো, ‘স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান’। খালেদা জিয়ার নতুন জন্মতারিখ বানানো হলো ১৫ আগস্ট। আবার এখন চিকিৎসা নাটকেও ওই নেত্রীকেই করা হলো শিখণ্ডী। এসবই বিএনপির ভেতরকার অস্বস্তিকর অবস্থার প্রকাশ।

রাজনীতিতে কৌশল তো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে যে দাবার ঘুঁটির কূটচাল দিয়েছিলেন বিএনপি নেতারা, এর পাল্টা চাল দিয়ে সরকারপক্ষ ও আওয়ামী লীগ নেতারা এরই মধ্যে অনেকটাই কূপোকাত করে ফেলেছেন বিএনপির ঘুঁটিকে। খালেদা জিয়ার বন্দিত্বের পর এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল। চিকিৎসা প্রশ্নে অযৌক্তিক ও অতি বাড়াবাড়ি আচরণ করে তা এখন অনেকটাই বুমেরাং হয়ে গেছে। সরকারি শেষ চালটা ছিল সিএমএইচে নেওয়ার প্রস্তাব। এবার অদ্ভুত আপসহীন না থেকে সরকারপক্ষকে দ্বিতীয় সুযোগ না দিয়ে নিয়ে আসা উচিত ছিল সিএমএইচে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে আমার সংস্কৃতিকর্মী এক ছাত্রের আলাদা বিশ্লেষণ রয়েছে। ও বলছিল, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে যেসব বক্তব্য বিএনপি নেতারা দিয়ে আসছেন, সিএমএইচে এলে যদি আসল সত্য প্রকাশ পেয়ে যায়!

আমরা বহু দিন ধরে বলে আসছি, লিখে আসছি দ্রুত রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য বারবার অন্ধকার পথ হাতরাচ্ছে বিএনপি। সাধারণ মানুষের সামনে তা প্রকাশ্যও হচ্ছে। এতে বানর তেলতেলে বাঁশ বেয়ে ওঠার চেয়ে নামছেই বেশি। এই পতনকে আলিঙ্গন করার চেয়ে দ্রুত ক্ষমতাসীন হওয়ার স্বপ্ন বাদ দিয়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে হেঁটে দলকে সুসংগঠিত করা কি জরুরি ছিল না? বিএনপি নেতারা বারবার আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছেন। কিন্তু কার্যত নিজেদের অন্তরীণ করে রাখছেন চার দেয়ালের ভেতর। এসবে বোঝা যায় আন্দোলন করার মতো সক্ষমতার সন্ধান এখনো বিএনপি নেতারা পাননি। অন্ধকার গলি-ঘুপচির দিকে না তাকিয়ে দল সুসংগঠিত করে আন্দোলনের পথে হাঁটা ছাড়া বিএনপির আর কোনো পথ খোলা নেই। এ দেশের কোনো সরকার কখনো বিরোধী দলের আন্দোলনের পথকে কুসুমাস্তীর্ণ করে রাখেনি। সাংগঠনিক শক্তি বাড়িয়ে এসব বাধা অতিক্রম করেই সাফল্যের পথে হাঁটতে হয়। এসব বাস্তবতা কিন্তু সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে। বিএনপি নেতাদের বুঝতে হবে ভুল পথে মানুষের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা বাস্তবে ফলাফল এনে দেবে না।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

একই ধরনের আরও সংবাদ