অধিকার ও সত্যের পথে

বাজেটে বেসরকারি শিক্ষকগণের প্রত্যাশা অপূর্ণই থাকল কি ?

 মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ

১ জুলাই ২০১৮ থেকে কার্যকর হলো ২০১৮-২০১৯ সালের বাজেট। নতুন বাজেট এলেই নতুন প্রত্যাশা জাগে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সবার মনে। কেননা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের মহাসড়কে দারুণ অনগ্রসর পেশাজীবী বেসরকারি শিক্ষকগণ। তারা কয়েক ভাগে বিভক্ত:
ক্স এমপিওভুক্ত পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারীর ভাবনা, একযোগে শিক্ষা জাতীয়করণের ঘোষণা। অথবা অন্তত বৈশাখি ভাতা, পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা ও ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধির ঘোষণা থাকবে এই বাজেটে।
ক্স মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজের নন-এমপিও শিক্ষক এবং বিশেষত কলেজের অনার্স পর্যায়ের শিক্ষকদের স্বপ্ন বাজেটে তাদের এমপিওভুক্তির কার্যকর ও নিঃশর্ত বাস্তবায়ন ঘটবে।
এমন বাস্তবতায় অপেক্ষা ছিল, ২০১৮-২০১৯ সালের বাজেটেই ‘এক ঘোষণায় শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণে’র ব্যবস্থা করবেন মাদার অব হিউমিনিটি খ্যাত, শিক্ষক দরদী প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা। যদি জানতে চাওয়া হয় কোনো পেশায়:
(ক) একই হারে বাড়িভাড়া?
(খ) চারটি উৎসবে একটি উৎসবভাতা?
(গ) পদোন্নতি ও বদলী নেই?
(ঘ) বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ও বৈশাখীভাতা নেই?
(ঙ) সরকারের রাজস্ব খাত থেকে জাতীয় বেতনস্কেলে বেতনের পরিবর্তে ‘অনুদান’ দেওয়া হয়? উত্তর, এমপিওভুক্তগণ এমনই পেশাজীবী।
মৌলিক অধিকার শিক্ষাক্ষেত্রে সাংবিধানিক দায়: সবার সমান সুযোগ। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষকের পেশাগত বঞ্চনার অবসানে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ সর্বসম্মত প্রয়োজন। তাই জাতীয়করণের দাবিতে কলেজ শিক্ষকের মৃত্যু, আদালতে রিট বা এমপিওভুক্তির জন্য অনশন কাম্য নয়। অথচ, অযতœ-অবহেলা-নিশ্চয়তায় টিকেথাকা প্রজন্ম বেসরকারি শিক্ষক যেন ‘বেদরকারি জাতীয় বোঝা’Ñ
“রাশি রাশি মিল করিতেছ জড়ো
রচিতে পুঁথি বসি বড় বড়
মাথার ওপর বাড়ি পরো পরোÑÑ
তাহার খোঁজ রাখ কি…?”
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
নতুন বাজেট ঘিরে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সব প্রত্যাশা রয়ে গেলো অধরা-অপূর্ণ। বহুলপ্রত্যাশিত শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ, স্বতন্ত্র বেতনস্কেলের আকাক্সক্ষাও রয়ে গেলো অনিশ্চয়তার অতলান্ত অন্ধকারে।
নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবি নিয়ে যারা সরব তাদের ব্যাপারেও কোনো বিশেষ বরাদ্দ ও ঘোষণা শোনার সৌভাগ্য হলো না আমাদের। বরং এমপিওভুক্তি নিয়ে যে আশ্বাস তাও গতানুগতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া মাত্র। এতে মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজের নন-এমপিও শিক্ষক এবং বিশেষত কলেজের অনার্স পর্যায়ের শিক্ষকদের স্বপ্ন, বাজেটে তাদের এমপিওভুক্তির কার্যকর ও নিঃশর্ত বাস্তবায়ন ঘটবে বলে মনে হয় না।
২০১৫ বেতনস্কেলের নিদের্শনায় রয়েছে, পাঁচ বছর অন্তর বেতনস্কেল হবে না। বৎসরান্তে জুলাই মাসে জাতীয় বেতনস্কেলভুক্তগণ ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সুবিধা পাবেন, যা চক্রবৃদ্ধি হারে অব্যহত থাকবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে ২০% বৈশাখিভাতা চালু হওয়ায় জাতীয় বেতনস্কেলভুক্ত সবাই সুবিধাগুলো পেলেও বঞ্চিত রয়ে গেছেন এমপিওভুক্তগণ। বেতনস্কেলে ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সুবিধা যদি এমপিওভুক্তগণ না-ই পান, তবে কি তারা যে স্কেল ও সুবিধা পেয়ে চাকুরিতে যোগ দেবেন শুধু সেটুকু নিয়েই অবসরে যাবেন?
২০ ডিসেম্বর’১৫ বেতনস্কেল সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে এমপিওভুক্তদের ‘অনুদান-সহায়তা’র কথা আছে। সাধারণতঃ পুরষ্কার, অনুদান, উপহার হয় আয়করমুক্ত। এমন অসম্মান-অস্পষ্টতায় এমপিওভুক্তদের আয়কর দিতে হবে? যারা জাতীয় ঐতিহ্য-উৎসবে অবহেলিত ও বঞ্চিত। যাদের ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ যাদের ইনক্রিমেন্ট-প্রমোশনের হাহাকারে ‘খোদার আরশ কাঁপলে’ও ভাগ্যের চাকা ঘুরে না তাদেরও আয়কর? বেশ কয়েক অর্থ বছরের বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতার আয়সীমা পুননির্ধারণ হয় নি। ২০১৫ সালে জাতীয় বেতনস্কেলে সবার বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়। আবার ২০১৫ থেকে অসংখ্যবার তেল, গ্যাস, পানি, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে নি¤œ আয়/স্বল্প বেতনের মানুষের জীবনযাত্রায় সমন্বয় করা খুবই কঠিন হয়ে গেছে।
জানা যায়, মোবাইল কোম্পানিগুলো কেবল সিম বদলের নামে ১২০০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিলো গতবার। কোম্পানিগুলোর ১৯, ২৯, ৪৯ বা ২০৯/= প্যাকেজ মূল্যের ফাঁদে ভাংতির অজুহাতে দৈনিক আমরা যে এক টাকা গচ্চা দেই তার পরিমাণও কয়েক কোটি টাকা। এটা কি শুভঙ্করের ফাঁকি না চুরি? বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আরো কতোভাবে বিপল পরিমাণের কর ফাঁকি দেয়। এগুলোতে সরকার নজর দিলে দেশ লাভবান হতো। এমপিওভুক্তদের একটু ছাড়ের প্রত্যাশা খুব কি অমূলক?
সুনাগরিক হিসেবে আয়কর পরিশোধ, একজন শিক্ষকের নৈতিক কর্তব্য। তবে ৫% প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখিভাতাসহ সব বঞ্চনার অবসান না ঘটিয়েই তাদের ওপর আয়করের বোঝা ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ তুল্য!
শুধু তা-ই নয়, জেলা সদরের বাইরে আয়কর অফিস নেই। এমপিওভূক্তদের টিআইএন নম্বর খোলা, আয়কর রিটার্ন দাখিল করা কষ্টসাধ্য। এ জন্য ধরতে হয় উকিল-মোক্তার! মাননীয় অর্থমন্ত্রী, একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক যে পরিমাণ টাকা পান তা দিয়ে তার মৌল-মানবিক প্রয়োজন আদৌ পূরণ হয় কিÑ তা বিবেচনায় আনবেন না?
এমপিওভূক্তগণ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ও উৎসবভাতা পান না। তারা পদোন্নতি, স্বেচ্ছাঅবসর, বদলি সুবিধাসহ অসংখ্য বঞ্চনার শিকার! তারা পদমর্যাদা অনুযায়ী বাড়িভাড়া পান না। ‘প্রিন্সিপাল থেকে পিওন’ সবাই বাড়িভাড়া পান ১০০০/=, চিকিৎসাভাতা ৫০০/= মাত্র, যা নিতান্তই অপ্রতুল। অথচ তাদেরই ‘অনুদান-সহায়তা’ থেকে যদি আয়কর নিতেই হয়, তবে তা সরকারিভাবে কেটে রাখলেও কিছুটা সহনীয় হতো।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সব পেশাজীবীরই মৌলিক অধিকার কিন্তু টিকেথাকা ও নিজেকে মেলে ধরবার সংগ্রামে ক্লান্ত মানুষ গড়ার কারিগরদের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গøানিকর। এমন বাস্তবতায় প্রত্যাশা:
বৈশাখী ভাতা ও বার্ষিক ০৫% প্রবৃদ্ধি সুবিধা নিশ্চিত করা। খÐিতভাবে জাতীয়করণের পরিবর্তে স্বচ্ছ-সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ। শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটের ২০% অথবা জিডিপির ০৬% বরাদ্দ নিশ্চিত করা। কিন্তু কে শোনে কার কথা! তবুও স্মরণ রাখা প্রয়োজন; শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং শিক্ষকের সম্মান সবার ওপরে। কবির ভাষায়Ñ
“এক ফোটা পদধূলি নহে পরিমাণ,
গয়া কাশি বৃন্দাবন তীর্থের সমান”।
(মৈমনসিংহ গীতিকা; কবি বংশিদাস)
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ইসলামিক স্টাডিজ কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ কাপাসিয়া গাজীপুর-১৭৩০।  

একই ধরনের আরও সংবাদ