অধিকার ও সত্যের পথে

এবারের বাজেটে কী থাকবে বে-সরকারী শিক্ষকদের দাবী পুরনের বরাদ্দ?

 বিন-ই-আমিনঃ
দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৭ বছর আগে। স্বাধীনতার পরে ধাপে ধাপে শিক্ষা সেক্টরসহ বিভিন্ন সেক্টরের উন্নতি তরান্বিত  হলেও বেসরকারি শিক্ষকদের উন্নয়ন সে মোতাবেক হয়নি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একসাথে ৩৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়নের ব্যাপক পরিবর্তন করেছিলেন। তার সুযোগ্য কন্যা বর্তমান পরিবর্তিত শিক্ষাক্ষেত্রের অগ্রদূত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণ করে শিক্ষায় বিরাট সাফল্যের ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন হলো। কিন্তু বেসরকারি মাধ্যমিক পর্যায়ের আশানুরূপ উন্নয়ন হয়নি। বিভিন্ন শিক্ষক নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা ও বিভিন্ন কলামিস্ট ও লেখকদের প্রকাশিত তথ্যে জেনেছি ১৯৮০ সনে তৎকালিন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য মূলবেতনের শতকরা ৫০ ভাগ সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়ার প্রচলন শুরু করেন। পরে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার শাসনামলে ২০ ভাগ বৃদ্ধি করে শতকরা ৭০ ভাগ সরকারি তহবিল থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৯৮৯ সনের ৫ এপ্রিল বিজয় স্মরনীতে শিক্ষক মহাসমাবেশে ৩ কোটি টাকার তহবিল জমা রেখে বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য কল্যাণ তহবিলের সুচনা করেন এরশাদ। পরে বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ মেয়াদে আরো ১০ ভাগ উন্নীত করে শতকরা ৮০ ভাগ সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তৎকালীন সরকার। ১৯৯৪ সনের আন্দোলনে টাইম স্কেল ব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৯৫ সনে জনবল কাঠামোতে সংশোধন আসে। আটকে যায় টাইম স্কেল। পরে আওয়ামীলীগ সরকার (১৯৯৬ থেকে ২০০১) মেয়াদে আরো ১০ ভাগ উন্নীত করে শতকরা ৯০ ভাগ সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। শিক্ষকদের স্ব স্ব একাউন্টে বেতন দেওয়ার প্রচলনও তখন থেকেই শুরু হয়। বিএনপি সরকার ২য় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ২০০২ সনে শিক্ষকদের বহুল আকাংখিত অবসর ভাতার সুবিধা চালু করেন। সর্বশেষ বেতন স্কেলের ৭৫ মাসের সমপরিমাণ এককালীন অবসর সুবিধা ও শিক্ষকদের জন্য শতকরা ২৫ ভাগ ও কর্মচারীদের জন্য শতকরা ৫০ ভাগ উৎসব ভাতাও তখন থেকে চালু হয়। ঐ আমলে শিক্ষকদের বেতন আরো ৫% বাড়িয়ে শতকরা ৯৫ ভাগে উন্নীত করা হয়। ২০০৭ সনে অনির্বাচিত ড.ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন সরকার শিক্ষকদের বেতন শতভাগে উন্নীত করেন। উপকূলীয় এলাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মেরামতের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে উন্নয়ন ফান্ডও প্রদান করেন তৎকালীন সরকার। জিয়াউর রহমানের চালু করা শতকরা ৫০ ভাগকে এরশাদ সরকার ৭০ ভাগে উন্নীত করার পর আন্দোলন- সংগ্রাম ছাড়া কোনো সরকারই বেসরকারি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য সরকারী সুযোগ সুবিধা প্রদান করেনি। রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কারা,কিভাবে চাকরি পেয়েছে সে কথা সবাই জানি। কাউকে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আজকের লেখার উদ্দেশ্য বেসরকারি শিক্ষক সমাজ আজকের অবস্থানে কিভাবে এলো? কম বেশি আন্দোলন ছাড়া আজকের অবস্থানে আসা সম্বব ছিলনা। শিক্ষক সমাজ ২০১৮ সনেও ঢাকার রাজপথে তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান কর্মসূচী পালনের জন্য প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়েছিল। একসময় শিক্ষকদের দাবী দাওয়া নিয়ে ঢাকার মহাসমাবেশে রাজনৈতিক নেতারা এসে একাত্মতা ঘোষনা করে বলেছিলেন,আমাদের সরকার ক্ষমতায় আসলে শিক্ষকদের দাবী-দাওয়া নিয়ে রাস্তায় নামতে হবেনা। এক সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বলেছিলেন,বঙ্গোপসাগরের সব জল তেল হলেও শিক্ষকদের সরকারী করন সম্বব না। এখন সরকারী হচ্ছে। জল কিন্তু তেল হয়নি। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে সরকারী করে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি করে মানসম্মত শিক্ষা কতোটা আশা করা সম্বব? প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উপজেলায় একটি স্কুল ও একটি কলেজ( প্রায় ৭০০) জাতীয়করণ করে মাধ্যমিক স্তরের কতোটা পরিবর্তন আনা সম্বব? জাতীয়করণ না হওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের শতকরা ৫ ভাগ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, বৈশাখী ভাতা,পূর্নাঙ্গ উৎসব ভাতা না দিয়ে হতাশা আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে। মানসম্মত ও বৈষম্যহীন শিক্ষার জন্য সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান  জাতীয়করণের বিকল্প নেই। শতকরা ৯৭ ভাগ ফলাফল উপহার দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে বঞ্চিত রেখে মাত্র কয়েকশত সরকারী প্রতিষ্ঠান দিয়েই মানসম্মত শিক্ষা আশা করা শুধু অসম্ববই নয়,অবাস্তবও। আমরা চাই গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরীব পরিবারের ছেলে মেয়েরাও ধনী পরিবারের ছেলে মেয়েদের ন্যায় সমান সুযোগ সুবিধায় পড়ালেখা করবে। অনেক নাটকীয়তার পর সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেলে বেসরকারি শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তির পর বর্তমান সরকার,মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সারাদেশে আনন্দ মিছিল করেছিল বেসরকারি শিক্ষক সমাজ। এ ঘটনা বিরল। কোনো সরকার-ই জাতীয় বেতন স্কেল থেকে বেসরকারি শিক্ষকদের বঞ্চিত করেনি। তারপরও বর্তমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আনন্দ র‍্যালী করেছিল শিক্ষক সমাজ। সাবেক শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান বিদায়ী সাক্ষাতে যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের খরচ জানতে চেয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন,তখন থেকেই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের আশা শক্তভাবে মনে ধারন করে আছে শিক্ষক সমাজ। সরকারী কোষাগার থেকে বেতন নেওয়া সবার জন্য এক নিয়ম,আর বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য আরেক নিয়মে আজ শিক্ষক সমাজ মর্মাহত। তারপরও আশায় বুকবেধে আছে কবে পাবে ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, পুর্নাঙ্গ উৎসব ভাতা,বৈশাখী ভাতা? এই বাজেটেই বেসরকারি  শিক্ষকদের  প্রতি সদয় হয়ে,মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ আলোচনা করে বেসরকারি শিক্ষকদের ন্যায্য দাবীগুলো মেনে বাজেটে বরাদ্দ ঘোষনা করবেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী,এ প্রত্যাশা সকল শিক্ষক সমাজের।
লেখক-
সিনিয়র সহকারী শিক্ষক
নলছিটি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ,নলছিটি,ঝালকাঠী।
ও শিক্ষা বার্তার ঝালকাঠী জেলা প্রতিনিধি।
একই ধরনের আরও সংবাদ