অধিকার ও সত্যের পথে

১৯৮২ থেকে মাঠেই বিশ্বকাপ দেখেন এই দম্পতি

 শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ

পান্নালাল চ্যাটার্জি। বয়স ৮৪। তার স্ত্রী চৈতালি চ্যাটার্জি। তার বয়স ৭৬। শারীরিকভাবে বয়স্ক হলেও মনের দিক থেকে দুজনই নবীন। টানা নয়বার বিশ্বকাপের মাঠে বসে খেলা দেখেছেন এই দম্পতি। এবারও ঘটেনি এর ব্যতিক্রম।

ভারতের আজকাল নামে একটি সংবাদপত্রের খবরে বলা হয়, কলকাতার খিদিরপুর কবিতীর্থ অঞ্চলের বাসিন্দা এই দম্পতি এবারের রাশিয়া বিশ্বকাপে ম্যাচ দেখতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। ‘যতদিন বাঁচি, ততদিন বিশ্বকাপ দেখি’- এটাই তাদের স্লোগান।

১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপ ফুটবল দিয়ে শুরু। নয়টি বিশ্বকাপের নামী দল ও তারকা ফুটবলারদের খেলা দেখার সুবাদে বিভিন্ন দেশের মানুষ ও তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে চ্যাটার্জি দম্পতির। প্রতিবার বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে যান নিজেদের জমানো টাকার ওপর নির্ভর করে। স্পনসরশিপ পান নামমাত্র। বিশ্বকাপের ম্যাচের টিকিটের দাম ছাড়া বিমানভাড়া, থাকা–‌খাওয়া, স্টেডিয়ামে যাতায়াতের খরচ অনেক। আগে বেণু দাশগুপ্তর সংস্থা ম্যাচের টিকিট দিত ডিসকাউন্ট দরে। কম টাকার প্যাকেজে নিয়ে যেত বিশ্বকাপে। সম্প্রতি ক্লাব সেভেনের সাহায্য পেয়েছেন দুজনে। সোনি স্পনসরশিপ নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এবার কী ধরনের সাহায্য বা স্পনসরশিপ পাবেন, তার জন্য বসে না থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপের দুটো ম্যাচের টিকিট কেটে ফেলেছেন নিজেদের টাকা দিয়ে।

আগামী ১৪ জুন মস্কোর উদ্দেশ্যে কলকাতা থেকে রওনা হচ্ছেন পান্নালাল ও চৈতালি। প্রাথমিক পর্বে মস্কোয় পর্তুগাল-‌মরক্কো ও জার্মানি-‌মেক্সিকো ম্যাচের টিকিট হাতে থাকায় স্টেডিয়ামে যাওয়া পাকা। আর একটা ম্যাচের টিকিট পাওয়ার চেষ্টায় রয়েছেন তারা, সেন্ট পিটার্সবার্গে ব্রাজিল বা আর্জেনটিনার খেলা দেখতে। আপাতত ২৭ জুন পর্যন্ত থেকে দেশে ফিরে আসার কথা চ্যাটার্জি দম্পতির। তবে নক আউট পর্বের ম্যাচের টিকিট পেলে আর কয়েকটা দিন কাটানোর ইচ্ছা আছে তাদের। যাঁদের সঙ্গে যাচ্ছেন, সেই সংস্থাকে ইতিমধ্যেই পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছেন। কলকাতা ডক লেবার বোর্ডের চাকরি থেকে পান্নালাল অবসর নিয়েছেন ৯৪ সালে। তখন থেকে সংসার চলে পেনশনের অর্থে।

এ বিষয়ে চৈতালি বলেন, ‘লন্ডনের সাসেক্সে থাকতেন আমাদের এক বন্ধু। নবাব বাড়ির মজফ্‌ফর আলি। ৮২ সালে তিনি ফোন করে বলেন, পান্না আমি মেয়র হচ্ছি। তোরা চলে আয় এখানে। আমি প্লেনের টিকিট পাঠিয়ে দিলাম। আমরা ওখানে গেলে ওই বন্ধু বলেন, এতদূর এলি, আর বিশ্বকাপ না দেখেই চলে যাবি। তা কী হয়?‌ চল তোদের বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখিয়ে নিয়ে আসি। তিনি আমাদের নিজের গাড়িতে চাপিয়ে স্পেনে নিয়ে গিয়ে স্পট ভিসা করেন। বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখলাম মাঠে বসে। গ্যালারির সেই উন্মাদনা আমাদের বিশ্বকাপ দেখার নেশা ধরিয়ে দিল।’

চৈতালি বলেন, ‘ঠিক করে ফেলি, নিজেদের উদ্যোগে ৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপে যাব। বিশ্বনাথ দত্তকে কে না চেনে দক্ষ ক্রীড়া প্রশাসক হিসেবে। উনি আমাদের উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, পান্নালাল, তোমরা বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়ার সুযোগ পেলে ছেড়ো না। একটু না হয় কষ্ট করলে। সেই প্রেরণাতেই গেলাম। সেই নেশাটা আজও ছাড়তে পারিনি।’‌ মারাদোনার পাঁচজনকে কাটিয়ে চোখধাঁধানো গোল, বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে আর্জেনটিনার মহাতারকার উল্লাস এখনও চোখের সামনে ভাসে।’

মেক্সিকোতে পেলের হোটেলের পাশেই থাকতেন এই জুটি। পরে আমেরিকা বিশ্বকাপে মাঠে ঢোকার সময় পেলের সঙ্গে দেখা হওয়ায় চৈতালিকে শাড়িতে দেখে চিনেছিলেন ফুটবলের জাদুকর পেলে। একসঙ্গে ছবি তুলে বলেছিলেন, ‘‌ম্যাডাম, ইউ হ্যাভ কাম ওয়ানস এগেন। ইনক্রেডিবল।’‌ টুকরো টুকরো নানা ঘটনার স্মৃতির একটা অ্যালবাম রয়েছে মনের মণিকোঠায়।

তবে দশম বিশ্বকাপের আসরে যাওয়ার আগে একটা আক্ষেপ রয়েছে পান্নালাল ও চৈতালির। ভারতে অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপের সময় ফিফার প্রতিনিধিরা তাদের বিশেষ সম্মান দিয়েছিলেন। কলকাতার সব ম্যাচের টিকিট দিয়েছিলেন বিনামূল্যে। বাড়িতে গাড়ি পাঠিয়ে মাঠে নিয়ে গিয়েছিল। আবার বাসায় পৌঁছে দিয়েছিল। এমন ফুটব‌পাগল সমর্থকের কথা তো ফিফার অজানা নয়। পান্নালাল ও চৈতালির ফিফার কাছে প্রশ্ন, এতগুলো বিশ্বকাপ নিজেদের খরচে দেখতে যাওয়ার পরও কি এবার রাশিয়া বিশ্বকাপের জন্য তাদের দুজনকে ফিফা কয়েকটা ম্যাচের টিকিট বিনামূল্যে দিতে পারত না?

একই ধরনের আরও সংবাদ