অধিকার ও সত্যের পথে

পিইসিতে ৬০০ জেএসসি ৬৫০ পার্থক্য ৫০ !

 এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।

ইদানীং প্রায়ই চোখে পড়ছে সন্তানের লেখাপড়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের দায়িত্বজ্ঞানহীন নানা সিদ্ধান্ত, যা অনেক সময় ডেকে নিয়ে আসছে করুণ পরিণতি। তাদের এই হতাশা আর উদ্বেগের কারণে কখনো বা শিশু-কিশোরেরা আত্মহত্যা করছে, কখনো বিগড়ে যাচ্ছে সন্তানের মন। পারিবারিক অশান্তি আর সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে মা-বাবার এই হতাশার মুলে এই ঘুনে ধরা শিক্ষা ব্যবস্থা।

 এই হতাশার মুলে ঘনঘন পরীক্ষাপদ্ধতি পরিবতন করা। কোমল মতি শিক্ষাথীদের খেলনার পুতুল ভেবে যখন যা ইচ্ছা তা চাপিয়ে দেওয়া। আজকে বলা হচ্ছে এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা হবে কাল বলা হচ্ছে অমুক পদ্ধতিতে পরীক্ষা। যাচ্ছে তাই অবস্থা বিরাজ করছে। একজন ৫ম শ্রেণির শিশুকে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে ৬০০ নম্বরের আর ৩ বছর পর ৮ম শ্রেণির শিশুর পরীক্ষা দিতে হচ্ছে ৬৫০ নম্বরের। অনেকেই বলছেন এটা তামাসা। আবার কেউ কেউ বলছেন এটা শিক্ষার মান বাড়ানোর নামে জাতিকে ধ্বংস করার পায়তারা। এতে করে লোক দেখানো পাশের সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু শিক্ষার গুনগত মান বাড়ছে না। ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট (এনএসএ) নামের প্রতিষ্ঠান প্রতি দুই বছর অন্তর একটি জরিপ পরিচালনা করে । তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে বাছাই করে তাদের দক্ষতার পরিমাপক পদ্ধতিটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ২০১১ সালের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ ৬৭ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭৫ শতাংশ, আর ২০১৫ সালে দেখা যাচ্ছে পঞ্চম শ্রেণির কাঙ্ক্ষিত গাণিতিক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯০ শতাংশ! তার মানে, বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই গণিতের কিছুই শিখছে না।

গণিতের পাশাপাশি সাক্ষরতার কথাও ধরা যেতে পারে। একই সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ২০১১ ও ২০১৩ সালে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ৭৫ ভাগই বাংলা ভাষায় তাদের কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। ২০১৫ সালে এ হার বেড়ে হয়েছে ৭৭ শতাংশ। তাহলে আমাদের হতাশার জায়গা আরো প্রশস্ত হচ্ছে। আমরা সবাই দেশকে ভালোবাসার কথা বলে মুখে ফেনা তুলছি আর কোমলমতি শিক্ষাথীদের চাপিয়ে দিচ্ছি হতাশা আর আত্মহত্যার হাতিয়ার। শিক্ষাবর্ষের অধেক সময় চলে যাওয়ার পর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার (পিইসি) শিক্ষার্থীরা জেনেছে, এবার তাদের প্রশ্নপত্র হবে অন্য রকম। ‘বহুনির্বাচনি প্রশ্ন (এমসিকিউ) থাকবে না। আর জেএসসির শিক্ষার্থীরা জেনেছে তাদের পরীক্ষা হবে ৬৫০ নম্বর।

বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা অতীতে কম হয়নি, এখনো কম হচ্ছে না। একটি জাতীয় শিক্ষানীতি থাকার পরও সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য স্থির করা সম্ভব হয়নি। এমনকি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম হয়নি। এমনিতেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব আছে বলেও মনে হয় না। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের আত্মঘাতি সিদ্ধান্তে আর কোন শিক্ষাথীকে যেন জিপিএ ৫ না পাওয়ার অপমানে আত্মহত্যা পর বেছে নিতে না হয় এমনটি প্রত্যাশা শিক্ষক, শিক্ষাথী ও অভিবাবকদের।

লেখক- শিক্ষক ও সাংবাদিক।

একই ধরনের আরও সংবাদ