অধিকার ও সত্যের পক্ষে

ডিজিটাল বাংলাদেশ ও শিক্ষকের মর্যাদা

 সামিউল ইসলামঃ

বাংলাদেশ এখন আর গরিব নয়। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করলো বাংলাদেশ চলতি বছরেরর ২৬ মার্চ অর্থাৎ স্বাধীনতা দিবসের দিন। আমরা মহাশূন্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন করতে পেরেছি। যা কি না মুষ্টিমেয় দেশের আছে।আমরা তথ্য প্রযুক্তিতেও অনেক এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা এখন এসব বুক ফুলিয়ে গর্বভরে বলতে পারি। হ্যাঁ, সত্যিই দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নাই। ছোট সময় প্রাইমারি স্কুলে পড়েছিলাম কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতাটি। এ কবিতাটি আমার মানসপটে ভেসে উঠছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ কবিতাটি অতীব জরুরি বলে মনে করছি। কিন্তু অাশ্চর্যের বিষয় এ কবিতাটি এখন আর স্কুল-কলেজের পাঠ্য পুস্তকে নাই। না থাকার কারণ আমার বোধগম্য নয়। হয়তো উর্ধ্বতন কর্তপক্ষ মনে করেছেন বর্তমানে এ কবিতাটি পাঠ্যপুস্তকে থাকলে শিক্ষকদের মর্যাদা দিতে হবে।

উনাদের দৃষ্টিতে হয়তো শিক্ষকরা মর্যাদার পাওয়ার যোগ্য নয়। শিক্ষকদের এখন স্যার না বলে অনেকেই মাস্টর/ মাস্টর মশাই বলে ঠাট্রা মশকরা করে। এটা কি শুধু সাধারণ মানুষরাই করে? না, উচ্চতর চেয়ারে আসীন ব্যাক্তিরাও এটা করে। দেড়-দুই বছর আগে মাউশির একজন উপ-পরিচালক এক স্কুল শিক্ষককে বলেছেন, স্কুলে মাস্টারি করার চেয়ে আপনার এলাকার মোড়ে একটি চায়ের দোকান দেওয়া অনেক ভালো। এতে মাস্টরি করার চেয়ে অনেক বেশি ইনকাম হবে। তখন ঐ শিক্ষক দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ঐ রুম থেকে বেরোলেন। শুধু ঐ উপ-পরিচালকই নন শিক্ষা প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তারাই শিক্ষকদের সাথে এমন আচরণ করেন। অনেক শিক্ষক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার কিংবা তারও বেশি টাকা খরচ করে শিক্ষা প্রশাসনের কর্তাদের কাছে এসে দেখাও করতে পারেন না। উনাদের ব্যক্তিগত সহকারিরা বলে দেন, আপনার এ সমস্যার জন্য স্যারের কাছে যেতে পারবেন না। অধঃস্তন কর্মকর্তাদের কাছে যান। যদি বলা হয় অধঃস্তন কর্মকর্তারা তো বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না। তখন বলে তাহলে কিছুই করার নাই। এ বিষয়ে স্যারের সাথে দেখা করা যাবে না। তখন নিরীহ শিক্ষককে কষ্টার্জিত সামান্য বেতন থেকে অনেক টাকা খরচ করে স্বর্থসিদ্ধি না হওয়ায় নিরুপায় হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয়। সমস্যার জায়গায় সমস্যাই রয়ে গেল। শিক্ষককে দিয়ে যখন তখন সরকারি যে কোন কাজে ( ভোটার তালিকা প্রস্তুত, আদম শুমারি, ভোট গ্রহণ ইত্যাদি) লাগানো যায়। শিক্ষকের মর্যাদা কবিতা পাঠ্য পুস্তকে থাকলে হয়তো এসব বিষয় একটু বিবেকে নাড়া দিবে। তাই হয়তো বাদ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সচিবরা সরকারি কোষাগার থেকে ৭৫ হাজার টাকার মোবাইল পেতে যাচ্ছেন । শুধু কি উনারাই ৭৫ হাজার টাকার মোবাইল দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে পারবেন? মনে রাখতে হবে দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে গড়তে হলে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে শিক্ষকদের ।

শিক্ষকদের তো নুন আনতে পান্তা ফুঁরোয় । তারা কি ৭৫ হাজার টাকা দিয়ে মোবাইল কিনতে পারবেন? তাদেরকে কি সরকারিভাবে কোনো মোবাইল/ল্যাপটপ দেওয়া হচ্ছে? না । তাদেরকে সামান্য বেতনের টাকা থেকে প্রতি মাসে কিছু কিছু টাকা বাচিয়ে অথবা ঋণ করে ল্যাপটপ কিনতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পাঠ সহজে বোধগম্য করতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস প্রস্তুত ও পরিচালনার জন্য । তারা শিক্ষার্থীদের জন্য নিবেদিত প্রাণ । তারা নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে । শিক্ষকরা মাসে বাড়ি ভাড়া বাবদ এক হাজার টাকা পান। ঢাকা শহরে একটা বস্তিতেও তো এক হাজার টাকায় থাকা যায় না। এক হাজার টাকা দিয়ে তো খোলা আকাশের নিচে ছাড়া কোথাও জায়গা পাওয়া যাবে না। শিক্ষকরা কি এতই তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের পাত্র? এক হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া দিয়ে কি তাদের সাথে ঠাট্রা-মশকরা করা হচ্ছে না ? সরকারি চাকুরীজীবীরা শতভাগ ঈদ বোনাস পায় অার শিক্ষকরা সিকিভাগ পায় । তাও আবার কর্তৃপক্ষের গাফলতির জন্য সবসময় ঈদের আগেও উত্তোলন করা যায় না ।

শিক্ষকদের বেতন উত্তোলনের জন্য নির্ধারিত শেষ দিনের পূর্বে কোন ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের বিলের কপি জমা নেয় না । ব্যাংক শিক্ষকদের শত শত কোটি টাকার ১২-১৫ দিন ব্যবসা করে । অন্যদিকে মাউশি, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর বেতন উত্তোলনের জন্য ১২-১৫ দিন সময় নির্ধারণ না করে ইচ্ছা করলে আরো কমিয়ে দিতে পারে । তাহলে শিক্ষকরা আরো আগেই বেতন উত্তোলন করতে পারে । সরকারি চাকুরীজীবীরা বৈশাখী ভাতা পেলেও ৮ম পে স্কেল চালুর ৩ বছরের মধ্যেও হতভাগ্য শিক্ষকদের কপালে এখনো তা জুটে নাই । সরকারিরা ৫% ইনক্রিমেন্টসহ পে স্কেলের যাবতীয় সুবিধা ভোগ করলেও বেসরকারি শিক্ষকদের মূল বেতন ছাাড়া আর কিছুই বাড়ে নি । সরকারি চাকুরীজীবীদের মতো ১৬০০০ (ষোল হাজার) টাকার স্কেল হলেই শিক্ষকদের আয় কর/রিটার্ণ ফরম জমা দিতে হচ্ছে । সরকারি চাকুরীজীবীদের তো মুল বেতনের সাথে অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে বেতনের প্রায় দ্বিগুণ হয় । আর শিক্ষকদের? বাড়ি ভাড়া ১০০০ (এক হাজার) এবং চিকিৎসা ভাতা ৫০০ (পাঁচশত) টাকা । তাহলে কেন তাদের আয়কর/ রিটার্ণ ফরম জমা দিতে হবে ? শিক্ষকদের মধ্যেও যারা সরকারি শিক্ষক রয়েছে তারা বেসরকারিদের মতো একই বই পড়িয়ে সকল সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে । বেসরকারি শিক্ষকদের পান থেকে চুন খসতে না খসতেই হুমকি দেওয়া হয় এমপিও বন্ধের ।

আর সরকারিদের? বেসরকারিদের সাথে সবসময় বিমতাসুলভ আচরণ কেন? শিক্ষকরা হচ্ছে জাতি গড়ার কারিগর । জাতি গড়ার কারিগরকে এভাবে অবজ্ঞার চোখে দেখে আমরা কখনো একটি ভালো ও শোষণমুক্ত জাতি প্রত্যাশা করতে পারি না ।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

একই ধরনের আরও সংবাদ