অধিকার ও সত্যের পথে

জীবনের জন্য পড়াশোনা, পরীক্ষার জন্য জীবন নয়

 ডা: মো: কফিল উদ্দিন চৌধুরী।।

এক আত্মহনননামাঃ
ঘড়ির কাঁটা রাত ১টা বাজে টিক্-টিক্। নাম তার রোকেয়া বেগম। রংপুর সদরের হরিদিপুর ইউনিয়নের এক দুরন্ত কিশোরী। হৃদয়ের সবুজ বাগিচায় যেন ছিল নানা রঙ-বেরঙের স্বপ্ন প্রজাপতির আনাগোনা। কিন্তু হঠাৎ এসএসসি পরীক্ষা ফেলের কালবৈশাখীর ঝড় যেন লণ্ডভণ্ড করে দিলো তার ভবিষ্যতের সব আশা-আকাক্সক্ষা। জীবনের উজ্জ্বল সম্ভাবনার সূর্য যেন ঢাকা পড়ল হতাশার কালো মেঘে। ফিকে হয়ে গেল জীবনের সব রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধের আকর্ষণ। নিজের এই জীবনসঙ্কটে সব আপনজনকে যেন একে একে মনে হতে থাকল পরের মতো। নিজের বিবেক-আবেগের দ্বন্দ্বের একপর্যায়ে নিজেকে মনে হতে থাকল অপরাধী। আর আত্মহননই হতে পারে একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত। অতঃপর জেনেশুনে করল বিষপান। সমগ্র শরীরে বিষের জ্বালার প্রতিক্রিয়ার ফল অস্পষ্ট গোঙানির শব্দে যখন পরিবারের অন্য সদস্যরা তার এই আত্মহননের প্রয়াস সম্পর্কে অবগত হলো, তখনই তাকে নেয়া হলো নিকটবর্তী হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। পরিবার চিকিৎসক সবার শত অক্লান্ত প্রয়াস সত্ত্বেও বাঁচানো গেল না রোকেয়া বেগমকে। মানবের সম্ভাবনা নামক বৃক্ষ থেকে চ্যুত হলো এক সবুজ সম্ভাবনার।

অযুত-নিযুত সবুজ সম্ভাবনার আত্মহননের মিছিলঃ
বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা যেমন- জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি কিংবা সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পূর্বোক্ত ঘটনার মতো এক বা একাধিক ঘটনা আমাদের দেশে বিরল নয়। এ বছরেও এখন পর্যন্ত পাওয়া রিপোর্ট মোতাবেক এসএসসি পরীক্ষায় ফেল বা আশানুরূপ ফল না করতে পারায় আত্মহননে মৃতের সংখ্যা প্রায় ২০ জন। আর আত্মহননের প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে প্রায় এর দ্বিগুণ। যদিও অরিপোর্টকৃতভাবে এ সংখ্যা হবে প্রায় প্রকৃত সংখ্যার আরো কয়েক গুণ বেশি। শুধু আমাদের দেশেই নয়, পরীক্ষায় ফেল কিংবা পড়ালেখার অতিরিক্ত চাপ সইতে না পেরে বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার ঘটনা যেন দিন থেকে দিন বেড়েই চলেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতি বছর এই সংখ্যা গড়ে প্রায় ১০ হাজার। আরেক জরিপে দেখা যায় ভারতে প্রতি ঘণ্টায় একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ফেল বা পড়ালেখার অতিরিক্ত চাপ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে। বিশ্বব্যাপী একই কারণে বার্ষিক এই সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। যদিও আমাদের দেশে পরীক্ষায় ফেল বা অন্যান্য কারণে আত্মহত্যার বার্ষিক সঠিক সংখ্যা নিরূপণের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো বিশদ জরিপ পরিচালিত হয়নি। কিন্তু আত্মহত্যার মতো প্রাণঘাতী এই স্বাস্থ্য সমস্যার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য এই সম্পর্কিত দেশব্যাপী এক ব্যাপক বার্ষিক জরিপ এখন সময়ের দাবি।

কেন এই আত্মহনন?
পরীক্ষায় ফেল কিংবা পড়ালেখার অত্যধিক চাপজনিত কারণে আত্মহননের প্রধান কারণ হিসেবে বলতে গেলে প্রথমেই আসে আমাদের নীরস ও জীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সম্পর্ক আমাদের পারিবারিক, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যখন ‘নিজেকে জান’ এই দৃষ্টিভঙ্গির না হয়ে যখন তা বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ বা গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পাওয়াই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। কিংবা শিক্ষার ফল যখন একজন আদর্শ মানুষ হওয়ার পরিবর্তে যখন তা কেবল ভবিষ্যতে ভালো চাকরি আর ভোগের লালসা চরিতার্থ করার অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। অথবা জীবনের সুখকর কিংবা সঙ্কটময় মুহূর্তে যখন শিক্ষা সঠিক পথ প্রদর্শনের পরিবর্তে কেবল তা পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না করা কিংবা ফেলের মানে ব্যর্থ জীবনের গ্যারান্টি প্রদানে সচেষ্ট, তখনই তা শিক্ষার্থীদের কাছে হয়ে ওঠে নীরস। পড়াশোনার ভারকে মনে হয় যেন মাথায় রাজ্যের চাপ। শিক্ষার্থীদের অন্তর্নিহিত গুণ শক্তিকে আবিষ্কার না করে যখন আমরা আমাদের পরিবারের জীবনের অপ্রাপ্তির শূন্যতাগুলোকে পূরণের জন্য তাদের পড়াশোনার ওপর অতি চাপ প্রয়োগ করি।

আমরা অভিভাবকরা যখন বুঝতে চাই না যে, আমার সন্তান আমি নই, আমার সন্তানের রয়েছে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তখনই পড়াশোনা জীবনঘনিষ্ঠ না হয়ে পড়ে জীবন বিচ্ছিন্ন। শিক্ষার্থীদের জীবনে সামান্য ব্যর্থতাই নেমে আসে রাজ্যের হতাশা। লুপ্ত হয় তাদের সঙ্কটময় মুহূর্তে স্থির থাকার ক্ষমতা। সামান্য ব্যর্থতাতেই আমরা তাদের প্রতি সহযোগিতা ও দরদপূর্ণ আচরণ না করে হয়ে পড়ি রূঢ় ও কঠোর। তুলনা ও বিদ্রƒপের বাক্যবাণে জর্জরিত করি তাদের কচি হৃদয়। আমরা বুঝতে ব্যর্থ হই যে, পৃথিবীতে সব মানুষ সমান নয়, সব মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। অন্য দিকে পড়ালেখার অত্যধিক চাপে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও আড্ডার সময় যেন আজ এক লুপ্ত প্রায় ব্যাপার। নাই মুক্ত বাতাসের শীতল পরশ।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি হৃদয়ের একাত্মতার তান যেন আজ এক পরীক্ষা ও ভালো ফলের দুষ্ট প্রতিযোগিতার দোষে দূষিত। একাকিত্বের নীরবতার সাথী হয় কম্পিউটার আর ইন্টারনেটের বস্তুবাদী ভার্চুয়াল জগৎ। যা শুধু শেখায় যখন তুমি হাসবে তখন সবাই হাসবে। কিন্তু যখন তুমি কাঁদবে তখন নিজেই কাঁদবে। তাই পরীক্ষায় ফেলের হতাশা কিংবা পরীক্ষাভীতি প্রভৃতি সঙ্কটময় মুহূর্তে নিজেকে শিক্ষার্থী মনে করে সম্পূর্ণ দুঃখের সাগরে দিকহারা ভাসমান জাহাজের মতো। যেখানে সম্ভাবনা নেই কোনো সঠিক দিক দেখানোর মতো সৌভাগ্যের ধ্রুবতারার আবির্ভাবের। মনে হয় আত্মহননই যেন এই যাতনা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়। তাই তারা সাদরেই বেছে নেয় আত্মহননের পথ। আত্ম বিয়োগেই যেন সে খুঁজে পায় প্রশান্তি।

সমাধানে করণীয়ঃ
এই বিয়োগান্তক ঘটনায় স্রষ্টা যেহেতু আমরা তথা সমাজ ও রাষ্ট্র, তাই এর প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে আমাদের দায়িত্বই সর্বাধিক। আমাদের বুঝতে হবে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ভালো মানুষ তৈরি, পরীক্ষার শুধু ভালো ফল নয়। সেই শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়েই আমাদের জীবন। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভালো-খারাপ নির্বিশেষে সব পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে চলতে শেখা। পরিবার ও সমাজকে শিক্ষার্র্থীদের কোনো সঙ্কটময় মুহূর্তে শাসকের ভূমিকায় না গিয়ে তাকে সহযোগীর ভূমিকা পালন করতে হবে। একমাত্র সহানুভূতিই হতে পারে এর ভাষা।

উৎসাহ আর উদ্যোম হতে পারে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি। ভালো ফলে ভবিষ্যতের উন্নতি, কিন্তু তা না হলে কোনো ক্ষতি নেই। ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন গুণ এই কথাকে মনে রেখে অভিভাবকদের উচিত প্রতিটি শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত গুণকে আবিষ্কার করা। শুধু পড়ালেখা নয় একজন শিক্ষার্থীকে মানুষের মতো মানুষ হতে হলে আরো কিছু প্রয়োজন। জীবন মানে শুধু পড়ালেখাই নয়, এর চেয়েও অনেক বেশি। তাই পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা, লেখালেখি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সমাজসেবা প্রভৃতির প্রতি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে তুলতে হবে।

তাহলে প্রতিটি শিক্ষার্থী পেতে পারে গুণগত ভেদে ভিন্ন মন, ভিন্ন ঝোঁক, সেই সাথে ভিন্ন পথে উত্তরোত্তর উন্নতি। সেই সাথে দেশের অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু ভালো ফলাফলের ওপর নির্ভর ভালো চাকুরে তৈরির মাধ্যম হিসেবে না রেখে একে আরো কিভাবে সরস ও জীবনমুখী করা যায় সে ব্যাপারে রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এক জরিপে দেখা যায়, আত্মহননকারী শিক্ষার্থীদের শতকরা ৮০ ভাগ রোগী চরম হতাশা, অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিজঅর্ডার, মাদকাসক্তি প্রভৃতি মানসিক রোগে আক্রান্ত। এদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত মনোচিকিৎসক।

এ ছাড়া স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মনোস্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য প্রয়োজন কাউন্সিলর, সাইকোলজিস্ট কিংবা মনোচিকিৎসকের। কেননা সরকারের বর্তমান স্বাস্থ্য এজেন্ডা মোতাবেক মনোস্বাস্থ্যও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্তর্গত, যার মূলনীতি সবার জন্য সুস্বাস্থ্য। অথচ মনোচিকিৎসার উন্নয়ন ও গবেষণায় আমাদের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দকৃত বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ ব্যয় করা হয়। সারা বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ মনোচিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ২৩০ জন। যদিও এই জনবল দ্বারা সমগ্র দেশের মাত্র ১০ শতাংশ লোকের সঠিক মনোচিকিৎসা দেয়া সম্ভব। তাই মনোচিকিৎসার উন্নয়নে সরকারকে চিকিৎসা শিক্ষাবিদ বিশেষত মনোচিকিৎসা শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে মনোচিকিৎসার উন্নয়নে আরো নতুন নতুন পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও অভিভাবকদের মনোস্বাস্থ্য ও মনোরোগ সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যে থেকে থেকে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ কর্সসূচির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের সঙ্কটময় মুহূর্তে বিশেষত যখন আত্মহত্যার ঝুঁকি বেশি থাকে তখন প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য সব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বিশেষত মনোচিকিৎসা প্রদানকারী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বা ইউনিট কিংবা ক্রাইসিস সেন্টারে টেলিফোন হটলাইনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে একটি আত্মহত্যা সারা জীবনের কান্না। একটি সবুজের আত্মহনন, একটি সম্ভাবনার সমাপ্তি।

লেখক : মেডিসিন ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট

একই ধরনের আরও সংবাদ