অধিকার ও সত্যের পথে

ফলাফলে ছেলেদের পিছিয়ে কেন?

 অলোক আচার্য্যঃ

ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় ফলাফলে পিছিয়ে পরছে। অথবা কথাটি ঘুরিয়ে বললে বলা যায়, মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ফলাফলটি আমাদের জন্য সার্বিকভাবে ইতিবাচক না নেতিবাচক তা নিয়ে মন্তব্য করার আগে কিছু বিষয়ে আলোচনার দরকার আছে। আমার ব্যক্তিগত মত হলো যদি এটা কোন একটি নির্দিষ্ট বছরের চিত্র হতো অথবা যদি এই পিছিয়ে পরার হারের পার্থক্য উনিশ-বিশ হতো তাহলে আমার কোন মাথাব্যাথা থাকতো না বা এ নিয়ে কোন প্রশ্ন ওঠার অবকাশ থাকতো না বলেই আামার বিশ^াস। কিন্তু তা হচ্ছে না। বরং গত চার পাঁচ বছর ধরেই প্রত্যেক পাবলিক পরীক্ষার পর দেখা যায় ছেলেরা ফলাফলের দিক থেকে মেয়েদের চেয়ে পিছিয়ে পরছে। এই পিছিয়ে পরার পার্থক্যও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোন ঘটনা ঘটার পেছনে অপরাপর বেশ কিছু কারণ জড়িত থাকে। এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো কয়েকদিন আগে আমি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে সিম্পোজিয়ামে অংশ গ্রহণ করেছিলাম। সেখানে আমি আলোচক ছিলাম এবং আমাদের সেদিনকার আলোচনার বিষয় ছিল ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় পিছিয়ে পরছে। মূলত সেখান থেকেই আমার মাথায় বিষয়টি ঘুরতে থাকে এবং সেদিনকার আলোচকদের আলোচনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ বের হয়ে আসে। আমার মনে হয় ছেলেদের ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রধান বাধা হচ্ছে সেই ছাত্রের পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বলতা।

নিয়ন্ত্রণ দুর্বলতা বলতে বোঝায় মূলত কোন অভিভাবক তার ছেলে সন্তানের ওপর কতটুকু নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারছে। আমার নির্ধারিত চার মিনিটের বক্তব্যে আমি মূলত এই অংশটুকুতে জোর দিয়েছিলাম। মেয়েদের ওপর সত্যিকার অর্থে অভিভাবকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে যা কোন ছেলে সন্তানের ওপর রাখা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে আজকের এই মোবাইল ফোনের যুগে। যদিও মেয়েরাও মোবাইল ব্যাবহার করে তবে সে হারও ছেলেদের তুলনায় অনেক কম। বাস্তব চিত্র হলো আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছেলেদের হাতেও দামী মোবাইল ফোন দেখতে পাওয়া যায় যা মেয়েদের ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। তাছাড়া একজন মাধ্যমিক পড়–য়া সন্তান যখন রাত আটটার সময় বাড়ি ফিরছে তখন খুব কম অভিভাবকই আজকাল তার এই সময়ে বাড়ি ফেরার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলেন। এটা মনে হয় অনেক অভিভাবক মেনেই নিয়েছেন যে ছেলে এই সময় পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকবে। বরং আড্ডা না দিলেও বন্ধু মহলে তার নাম ভীরু বা এজাতীয় কিছু একটা হয়ে যায়। আবার এর বেশি সময়ও আড্ডা দিতে দেখা যায় তাদের। কিন্তু সে তুলনায় মেয়েদের এতটা স্বাধীনতা এখনও পরিবার থেকে দেওয়া হয়নি যে রাত আটটা নয়টায় বাড়ি ফেরে।

বরং সে সময়টুকু তারা বইয়ের পেছনে কাটায়। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটাতেও ছেলেরা মেয়েদের থেকে এগিয়ে রয়েছে। সার্বিকভাবে বললে বলা যায় মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় বইয়ের সাথে অনেক বেশি সময় কাটাচ্ছে। আর যে কারণে মেয়েরা ফলাফলেও ক্রমাগতভাবে এগিয়ে চলেছে। ছেলেদের ক্রমাগত পিছিয়ে পরা আমাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে এ কারণে না যে মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে। বরং মেয়েদের এগিয়ে যাওয়াটা অত্যন্ত ইতিবাচক। কিন্তু একটি দেশের জন্য ছেলে এবং মেয়ে সমানতালে এগিয়ে যাওয়া আবশ্যক। একটা সময়ে যখন মেয়েরা লেখাপড়ার অধিকার থেকেই বঞ্চিত ছিল তখন আমরা সত্যিকার অর্থেই পিছিয়ে ছিলাম। তারপর মেয়েদের অধিকার নিশ্চিতকরণের প্রয়াস করার অংশ হিসেবে মেয়েরা আজ দুর্দম গতিতে এগিয়ে চলেছে।

ভালো থাকার জন্য শরীরের দুটো হাতের সমান গুরুত্ব রয়েছে তেমনি দেশের ভালোর জন্য ছেলে এবং মেয়ে উভয়কে সমান ভূমিকা রাখতে হবে। ছেলেদের পিছিয়ে পরার আরও কিছু কারণ রয়েছে। দেশে এখন আইপিএলের জোয়ার চলছে। একটু লক্ষ করলে দেখা যায় সব বয়সী ছেলেদের চোখ আইপিএলের দিকে। মেয়েদেও তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কে কত রান করছে, কে কত রান দিচ্ছে সব মুখস্থ করে রাখছে। আর সময়টা ঠিক তাদের পড়ালেখরা কারণে। যদি কেবল সারা বছরে এই একটা প্রতিযোগিতা হতো তাহলে কোন প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু একটু ভাবুন। ফুটবল বিশ^কাপ আসন্ন। এখন থেকেই আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকরা মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন। এর বাইরেও নানা প্রতিযোগীতার ছড়াছড়ি। বিপিএল,সিপিএল,পিসিএল,কাউন্টি ক্রিকেট,উয়েফা লীগসহ এটা সেটা। এসবেও রীতিমত চোখ মুখ গুঁজে থাকে আজকের প্রজন্ম। তাহলে এরা লেখাপড়া করবে কখন?

কতজন মা বাবা এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন। আমি জানি এসব থেকে একেবারে বিমুখ করে রাখার ক্ষমতা আমাদের অভিভাবকদের পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু একটু নিয়ন্ত্রণ না নিলে ফলাফলটাও তো হাতে নাতেই পাচ্ছি। তারপর দেখুন আমাদেও রাজনৈতিক পরিবেশও আমাদের সন্তানদের ওপর প্রভাব ফেলছে। একটু পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে আজকাল যারা মিছিল মিটিংয়ে যায় বা স্লোগান দেয় তাদের বেশিরভাগই ছাত্র।তাদেও যখন পড়ার টেবিলে থাকার কথা তখন তারা রাজপথে। নেতা বলে কথা! নেতা ডেকেছেন তাই পড়ার টেবিল ছেড়ে রাজপথে। তা আমাদের রাজনীতির দরকার আছে বৈ কি কিন্তু আগে তো পড়ালেখা তারপর রাজনীতি। অনেক সময় অভিভাবকদেরও কিছু করার থাকে না কারণ তারাও যে সেসব স্থানীয় নেতাদের চাপে থাকেন। কিন্তু পড়ালেখা শেষে চাকরির নিশ্চয়তা সেই নেতা দিতে পারেন না বা পরীক্ষায় ফেল করলে তার কোন প্রতিকার থাকে না তাদেও কাছে।

কিন্তু আমাদের মেয়েদের এতসব ঝামেলা নেই। ফলে এই পুরো সময়টাই তারা বইয়ের পেছনে দেয়। তাছাড়া স্কুল জীবন থেকেই অনেকেই সিগারেটের নেশায় জড়িয়ে যাচ্ছে। কলেজে তো রীতিমত টেনে টেনে সিগারেট খায় অনেকে। তারপর আবার হাতের কাছেই মিলে যায় ইয়াবার মত আধুনিক নেশার উপকরণ। সেখানেও অনেকেই হারিয়ে যাচ্ছে। এতসব প্রভাব ফেলছে ছেলেদের লেখাপড়ায়। যার ফলে ফলাফলেও প্রভাব দেখা যায়। তবে আমাদের ফলাফলটা সমানে সমান হওয়া দরকার। ফলাফলে ছেলে মেয়ে সমান সমান হবে এমনটা ভাবা ঠিক নয়। তবে ফলাফলের পার্থক্যটা খুব বেশি হওয়াটা চিন্তার বিষয়। সেক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকাটা বেশি হওয়া উচিত। অভিভাবক সন্তানদের বন্ধু। তার সাথে মিশতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে। ভালো মন্দ রাস্তা স্পষ্ট করতে হবে। মোট কথা সন্তানকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে। কারণ যদি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয় তাহলে এই ফলাফলের পার্থক্য কেবল বাড়তেই থাকবে যা আমাদের দেশের সার্বিকভাবে মঙ্গলজনক হবে না।

লেখক-সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

একই ধরনের আরও সংবাদ