অধিকার ও সত্যের পক্ষে

বেসরকারি শিক্ষকদের উপর নির্যাতন ও অন্যায় আচরন আর কতো?

 বিন-ই-আমিন
কিছুদিন আগে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের কাঠালিয়া ইসলামিয়া দারুস সুন্নাহ দাখিল মাদরাসার সুপার ও নেছারবাগ বায়তুল আমান জামে মসজিদের ইমাম আবু হানিফ(৫৫)’র মাথায় মল ঢালার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় উঠে। ২/১দিন পরই স্বাভাবিক। কেউ মনে রাখেনা বা সমবেদনাও প্রকাশ করেনা সমাজের অসহায় ও অবহেলায় দিনাতিপাত করা মহৎ পেশায় নিয়োজিত সম্মানিত শিক্ষকদের কথা। মাদরাসা সুপারিন্টেনডেন্ট এবং মসজিদের ইমাম,শিক্ষক হয়েও শিক্ষকদের চেয়ে কম সম্মানের নয়। রাস্তা আটকিয়ে ইমামের মাথায় মল ঢেলে উল্লাস! আমাদের সামাজিক অবক্ষয় কোথায় পৌছেছে,ভাবা যায়? একজন দাগী চোর কিংবা বড় অপরাধীকেও এভাবে রাস্তায় ফেলে জনসমক্ষে নিকৃষ্টতম কাজটি করা কোনো সামাজিক জীবের পক্ষে কি সম্বব? মামলা হয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। কয়েকজনকে আটকও করে পুলিশ।
কিন্তু বাদিকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে আসামী পক্ষ। মামলা তুলে না নিলে পরিনতি হবে ভয়াবহ। এ নিন্দনীয় ও ন্যাক্কারজনক ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারনে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। এরকম অনেক ঘটনা জনসমক্ষে আসেনা। নারায়নগঞ্জ বা নীলফামারীর ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই ভুলে গেছে শিক্ষক সমাজ। দেশের সম্মানী ও মহৎ পেশায় নিয়োজিত শিক্ষকদের সাথে প্রায়শই ঘটে যাওয়া এসব ঘটনাতো থেমে নেই। শিক্ষক সমাজও তো কোনো নিন্দা বা প্রতিবাদ করেনি ঐসব নির্বোধ লোকদের অন্যায় কাজের। সাধারন মানুষতো ভুলবেই। ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা যতোদিন সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্তি না ঘটবে, যতোদিন শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে শিক্ষকতা করতে না পারবে ততোদিন শিক্ষকদের উপর নির্যাতন,নিপীড়ন চলবে। আর এরকম ঘটলে ২/১ দিন আলোড়ন তুলেই আমাদের দায় শেষ। কিন্তু এভাবে চলতে থাকবে কতোদিন? কমিটির ক্ষমতা কতো হলে একজন প্রবীণ শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধানকে জনসমক্ষে কানধরে উঠ-বস করতে হয়। আবার সেই শিক্ষকের নামেই মিথ্যা মামলা হয়।
ম্যানেজিং কমিটির কাজতো শিক্ষকদের শারীরিক বা মানষিকভাবে নির্যাতন,ভীতি প্রদান নয়। উন্নয়নমূলক কাজ, শিক্ষার মানোন্নয়ন,ভর্তি,গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থিদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদান,প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় সহযোগিতা,শিক্ষকদের কাজের তদারকি সহ আরো কতো কি। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে নির্বাচনেও প্রায় অর্ধকোটি টাকা খরচ করে সভাপতি হওয়ার ঘটনা ঘটে। এতো টাকা খরচ করে সভাপতি হওয়ার পিছনে কি কারন থাকতে পারে? অনেজ জায়গায় সদস্যদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। একজন কমপক্ষে বিএবিএড পাস শিক্ষকের তদারকির জন্য মেট্রিক পাস বা নন মেট্রিক সদস্যের পক্ষে কিভাবে সম্বব? যখনই সেটা অসম্বব,তখনই নিজেদের বাহাদুরী জাহির করার জন্য সমাজের উচ্চ শিক্ষিত লোকদের অপমানিত,নির্যাতিত ও নিপীড়িত হতে হয় কমিটি নামের সদস্য কর্তৃক। আমরা বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষক নির্যাতনের পিছনে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের ব্যক্তিগত স্বার্থকে কারন হিসেবে দেখেছি। যখনই কমিটির স্বার্থের বিপক্ষে ও ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করে একজন আদর্শ শিক্ষক,তখনই নির্যাতনের শিকার হন তারা। সমাজে সকল শ্রেণি পেশার সন্তানদের সুশিক্ষা দিয়ে মানুষ করার দায়িত্ব যাদের উপর,সামান্য কারনে তাদের মাথায় মল ঢেলে,কান ধরে উঠ-বস করিয়ে,শারীরিক ভাবে লাঞ্জিত করে কতোটুকু লাভবান হচ্ছে সেসব কাপুরুষেরা।
একজন শিক্ষকের কথা এখনও সমাজে অনেক মুল্যবান।পৃথিবীর সব দেশেই শিক্ষকের সামাজিক ও আর্থিক মূল্যায়ন সবার চেয়ে বেশি। শুধু আমাদের দেশেই ব্যতিক্রম। সামান্য বেতনে চাকরি করে অবসরে গিয়ে চিকিৎসার অভাবে অন্ধ বা পঙ্গু হয়ে যায় অনেক শিক্ষক। শিক্ষকদের ন্যায্য দাবীর কথাও কেউ শুনতে চায়না। সবাই যেন স্বার্থপরের মতো আচরণ করছে শিক্ষকদের সাথে। ঢাকার রাজপথেও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীতে পুলিশের বাধা। শান্তিপুর্ণ অবস্থান কর্মসুচীর উপর দিয়ে জোরপূর্বক পুলিশের গাড়ি চালানোর হুমকি,শান্তিপুর্ণ অবস্থান কর্মসূচী ভাঙ্গতে পুলিশের লাঠিপেটা,শিক্ষক নেতাদের গভীর রাতে কোমরে দড়ি বেধে থানায় নিয়ে যাওয়া,পরে ছেড়ে দেওয়া আরো কতো কী। আসলে শিক্ষকরা সব সময়ই অসহায় ও অবহেলার শিকার।
শিক্ষকের নীতি আদর্শের কারনে কারো সাথে অসদাচরণ,মিথ্যা বলা,ঝগড়া করা অনেক কিছুই তাদের দ্বারা সম্বব হয়না। এ কারনে অন্য পেশা থেকে শিক্ষকতা আলাদা। সরকারী বেতনের যেকোনো দপ্তরের একজন পিওনের বাড়ি থাকে আর শিক্ষকের মাসের শেষে বাজার করার টাকা থাকেনা। মুল বেতনের বাহিরে মাত্র এক হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া দিয়ে সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে বাসা ভাড়া দিতে হয় কমপক্ষে চার হাজার টাকা। স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি কর্তৃক হয়রানী,বেতনের সময় ৫% বাষিক প্রবৃদ্ধি না পাওয়া,বৈশাখী ও পূর্ণাঙ্গ উৎসবভাতা না পাওয়ার ইতিহাস শুধু শিক্ষকদের বেলায়। বাড়ি-গাড়ি করার অভিলাষ শিক্ষকের নেই। সামান্য বেতনে থাকারও কথা নয়। বেতনের বাহিরে বাড়তি উপার্জন দিয়ে সরকারী যে কোনো দপ্তরের পিওন,কেরানীর পক্ষে যেটা সম্বব,কর্মকর্তার সমান যোগ্যতার একজন বেসরকারি শিক্ষকের দ্বারা সরকারী পিওন,কেরানীর সমান তালে চলা সম্ববনা।
তাদের বাড়ি থাকে,গাড়িতে চড়ে আর মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান প্রধান মাসিক ২৯ হাজার,সিনিয়র সহকারী শিক্ষকরা ২২ হাজার,সহকারী শিক্ষকদের ১৬ হাজার ও ১২ হাজার ৫শত টাকা বেতনে চাকরি করে রিকসায় চড়তে হয়,বাড়ি,গাড়ি করা যাদের কাছে শুধুই স্বপ্ন। যাদের সর্বনিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস। শিক্ষক সমাজ আশা করে শিক্ষকতা পেশায় নিজেদের প্রাপ্য সম্মানটুকু বজায় রেখে মহৎ এ পেশায় দেশ- জাতির কল্যানে কাজ করতে। স্থানীয় কমিটি কর্তৃক অযথা হয়রানি,নির্যাতন থেকে দুরে থেকে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ভালো ফলাফল উপহার দিতে কমিটি,অভিভাবক সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন ও পরিবর্তনের অগ্রদূত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জাতীয়করণ না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি,পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা,বৈশাখী ভাতা প্রদান করে শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে সহযোগিতা করবেন।
লেখক-
সিনিয়র সহকারী শিক্ষক
নলছিটি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ,ঝালকাঠী।
একই ধরনের আরও সংবাদ