অধিকার ও সত্যের পথে

আলোকময় জগৎ সাজাতে বয়ঃসন্ধিকাল

 মোসাঃ শামিমা আরা।।

মানুষের জীবনে বয়ঃসন্ধিকাল হচ্ছে একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যয়। শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রাখলেই এ বয়ঃসন্ধিকালের শুরু। এ সময়ে কিশোর-কিশোরীদের জীবনে ঘটে যায় নানামুখী পরিবর্তন। শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন তো ঘটেই। কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের অত্যন্ত শক্তিশালী ভাবতে থাকে। নানা দ্বিধাদ্বন্দ তাদের পেয়ে বসে। কাজ করতে চায় স্বাধীনভাবে। তারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে পছন্দ করে। যে কোন কাজেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। হিতাহিত জ্ঞান না মেনে প্রতি পদে পদেই ভুল করে বসে থাকে কিশোর কিশোরীরা।

এ সময়টাই হলো একটা কঠিন সময় যখন কিশোর-কিশোরীদের যদি সঠিক দিকনির্দেশনা ও কর্মপন্থা নির্ধারণে পর্যাপ্ত সহায়তা না দেয়া যায়, তাহলে সংবেদনশীলতা ও সহনশীলতার মাধ্যমে তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে অনেক বেশি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে। এটাতো সত্য যে, আজকের কিশোর-কিশোরীরাই আগামীদিনের সুনাগরিক। আর্থ সামাজিক প্রেক্ষিত ও সমাজ বাস্তবতার আলোকে কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনধারার গতিময়তায় পরিচালিত করতে অভিভাবকদের বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব দেখাতে হবে। বিশেষ করে শিশুকাল ও যুবাকালের মাঝামাঝি এই সময়কাল অর্থাৎ ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে শারীরিক পরিবর্তন ঘটার মুহূর্তটিতে তাদের সঠিক পরিচর্যা ও করণীয় নির্ধারণে সহায়তা দেয়া অত্যন্ত জরুরি।

ইদানীং জাতীয় পর্যায়ের কিছু এনজিও এ ব্যাপারে স্বউদ্যোগে কাজ করছে। এছাড়া আমাদের নিম্ন মাধ্যমিক পাঠ্যপুস্তকগুলোতে এ ব্যাপারে যথোপযুক্ত শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সময়টাতে মায়েদের সঙ্গ দেয়াটা অত্যন্ত জরুরি। সচরাচর কিশোরীরা এইসব ধারণা থেকে অজ্ঞাত থাকার কারণে প্রতিনিয়ত নানা সমস্যা ও অসুবিধার সম্মুখীন হয়। ফলে মাকে বন্ধুবাৎসল্যতার মাধ্যমে অত্যন্ত নিবিড়তায় এই স্তরটাকে পেরোতে সহায়তা প্রদান করতে হবে।

অন্যদিকে একজন কিশোরকেও পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে ধারণা দেয়ার পাশাপাশি সংযত ও সহনশীল ও আচরণ বজায় রাখার ব্যাপারে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল হতে হবে। কোন কারণে মা বাবার করণীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা না গেলে কিশোর-কিশোরীদের জীবনে সমূহ বিপদ ঘটে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। অভিভাবক মাত্রকেই ভাবতে হবে বয়ঃসন্ধিকাল এমন একটা গুরুত্ব্পূর্ণ সময় যেখানে সন্তানদের আগামীদিনের সুসন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে অবশ্যই বিশেষ যত্ববান হতে হবে।
আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় দেখা গেছে, এই সময়টাতে কেবল কঠোর অনুশাসনের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বয়ঃসন্ধিকালের ভাবনার জগৎটাকে সুন্দর ও সুনিপুণ গতি দেয়ার ব্যাপারে অভিভাবকদের ধারণা চিন্তার ক্ষেত্রটাকে অনেক বেশি সু-সংহত ও পরিশীলিত করতে হবে।

আশেপাশের পরিবেশ, প্রতিবেশ সমাজ প্রকৃতি আদর্শ ও উদ্দেশ্য সর্বোপরি মননশীলতার পরিধিটাকে জাগ্রত করে পথ চলতে হবে অভিভাবকদের। এই কঠিন সময়টাতে কোনক্রমেই ভুল করা চলবে না। মায়ের বকুনি বাবার কড়া শাসন দিয়ে আজকাল বয়ঃসন্ধিকালের মুহূর্তটিতে কিশোর-কিশোরীদের জীবনটাকে অতিষ্ঠ করা এখন আর সাজে না। অত্যন্ত কঠিন সময় বলেই বয়ঃসন্ধিকালে কিশোররাও কম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকে না। এজন্যে সমাজের নিগৃহীত পরিবেশ ও জায়গা থেকে কিশোরদের রক্ষা কল্পে মা বাবাকে সব সময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

বিশেষ করে বন্ধু নির্বাচনের ব্যাপারটা অত্যন্ত জটিল একটা বিষয়। ভালো ও সৎ বন্ধু যদি নির্বাচন করা না যায় তাহলে প্রতি পদে পদে সমূহ বিপদ অপেক্ষমাণ থাকে। আজকাল বয়ঃসন্ধিকালে মা বাবার অবহেলা ও গুরুত্বহীনতার কারণে অনেক ভালো পরিবারের ছেলেমেয়েরা মাদকাসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে। যেজন্য এই সময়টাতে প্রত্যেকটা অভিভাবকের উচিত ছেলে মেয়েরা স্কুলে ঠিকমতো গেলো কি না গেলো, পড়ার টেবিলে নিয়মিত পাঠানুশীলন করছে কিনা , কিংবা  সারাক্ষণ বন্ধু বান্ধবদের সাথে মেলা মেশায় রাতদিন সময় পার করে দিচ্ছে কিভাবে-সবগুলো কমন বিষয় নজরে আনতে হবে। নাহলে যেকোন সময় বয়ঃসন্ধিকালে বিপদ অবধারিত। সব অভিভাবকদের যার যার অবস্থান থেকে ভাবতে হবে কিশোর-কিশোরীদের আলোকময় জগৎ সাজাতে।

লেখক- নারী উন্নয়ন কর্মী।

একই ধরনের আরও সংবাদ