অধিকার ও সত্যের পথে

মহাকাশের বুকে এক টুকরো বাংলাদেশ

 আরাফাত শাহীন

কিছুদিন পূর্বেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য চারটি ভূ-উপগ্রহের নাম মুখস্ত করতে হয়েছিল। বারবার পরীক্ষার আসত বলে এই নামগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই ছিলনা। চারটি ভূ-উপগ্রহ হল- রাঙামাটির বেতবুনিয়া, গাজীপুরের তালিবাবাদ, রাজধানীর মহাখালী এবং অন্যটি সিলেট। আমাদের পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে শুধু এই চারটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র নয়, কক্ষপথে থাকা নিজেদের কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট এর নামও মুখস্ত করতে হবে। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট এর সফল উৎক্ষেপণ আমাদের এই উপলক্ষ এনে দিয়েছে। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট প্রেরণের মাধ্যমে আমাদের সোনার বাংলাদেশ নিজস্ব স্যাটেলাইটের অধিকারী ৫৭তম দেশ হিসেবে বিশ্বে আত্মপ্রকাশ করল। জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য যে অত্যন্ত গর্বের বিষয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মহাকাশের বুকে আমাদের পদযাত্রা এর মাধ্যমেই শুরু হল। একটি গর্বিত জাতি হিসেবে আমরা এর মাধ্যমে বিশ্বের বুকেও আত্মপ্রকাশ করলাম।

স্যাটেলাইট আসলে কী? মার্কিন গবেষণা সংস্থা নাসার সংজ্ঞা অনুযায়ী, মহাকাশে কোনো বস্তুর চারপাশে ঘুরপাক খাওয়া অন্য কোনো বস্তুই হলো স্যাটেলাইট। পৃথিবীর অভিকর্ষ বল এড়াতে একে প্রচণ্ড গতিতে ঘুরতে হয়। এই গতি বুলেটের গতির চেয়েও বেশি। তাত্ত্বিকভাবে বুলেটের গতি ঘন্টায় প্রায় ২৮,২০০ কিলোমিটার হলে তা স্যাটেলাইটের মতই পৃথিবীর চারপাশে ঘুরবে। স্যাটেলাইটকে নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছে দিতে ব্যবহৃত রকেটের গতি ঘন্টায় প্রায় ২৮,৮০০ কিলোমিটার। ফলে স্যাটেলাইটের অর্জিত গতি অভিকর্ষ বলকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। বাংলাদেশ সময় গত ১১ মে শুক্রবার দিবাগত রাত তথা শনিবার ১২ মে প্রথম প্রহর রাত ২ টা ১৪ মিনিটে মহাকাশের পথে এগিয়ে যায় বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট।

বিগত বছরগুলোতে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি তরতর করে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। বিশ্বের অন্যান্য সমৃদ্ধ দেশের সাথে তাল মিলিয়ে আমরাও সমানতালে এগিয়ে চলেছি। এইতো কিছুদিন আগেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। সেই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই আমাদের আবার নতুন করে আনন্দের উপলক্ষ এনে দিলো মহাকাশে পাঠানো নিজস্ব স্যাটেলাইট। সার্বিক সুবিধা না থাকার জন্য হয়ত স্যাটেলাইটটি আমাদের দেশ থেকে পাঠানো সম্ভব হয়নি। তবে অদূর ভবিষ্যতে যে আমরা নিজেরাও নিজেদের স্পেস সেন্টারের মাধ্যমে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠাতে পারব না তা কে বলতে পারে!

বাঙালি জাতির প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর সর্বতোভাবে চাইতেন বাইরের পৃথিবীর সাথে আমাদের সমৃদ্ধ যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু থাকুক। তিনি সেভাবে নিজস্ব গতিতে অগ্রসরও হচ্ছিলেন। তবে ঘাতকরা তাঁকে সে লক্ষে পৌঁছুতে দেয়নি। তার আগেই ঘাতকের বুলেট তাঁর প্রাণ কেড়ে নিলো। আজ বঙ্গবন্ধুর নামে আমরা মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়ে বহির্দেশের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপ্লব ঘটাতে চলেছি। এই সুখের দিনটি যদি তিনি নিজ চোখে দেখে যেতে পারতেন! আমাদের দুর্ভাগ্য তাঁর মত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষকে আমরা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের একটা কথা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধুর প্রচেষ্টাতেই ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (আইটিইউ) সদস্য হয় বাংলাদেশ। সুতরাং আজকের এই সাফল্যের সূচনা যে তাঁর হাত ধরেই হয়েছিল তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

মহাকাশে নিজেদের স্যাটেলাইট থাকার ফলে অনেকগুলো সুবিধা পাবে বাংলাদেশ, কিছুদিন পূর্বেও যেসব সুবিধার কথা কল্পনা করাও যায়নি। আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যে বিপ্লব ঘটবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। রেডিও এবং টেলিভিশন সম্প্রচারের ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে। এর আগে আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিদেশি স্যাটেলাইট ব্রান্ড ব্যবহার করত। ফলে আমাদের বিপুল সংখ্যক অর্থ বিদেশে চলে যেত। এখন থেকে আমাদের এক্ষেত্রে শুধু যে আর্থিক সাশ্রয় হবে তাই নয়, চাইলে আমরা প্রয়োজন মিটিয়ে যেটুকু বাকি থাকে তা ভাড়াও দিতে পারব। আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানাতেও সাহায্য করবে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট। মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট পাঠানোর আরো সুবিধা আছে। আমাদের আগামী প্রজন্ম মহাকাশ বিষয়ে গবেষণার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে। ফলে আমরা মহাকাশ গবেষণায় আরো এগিয়ে যেতে পারি।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট আমাদের দেশের বিরাট বড় এক সম্পদ। মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করেছি, ইচ্ছা করলে আমরা অনেক কিছুই করে দেখাতে পারি। একসময় যারা বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুঁড়ি’ বলে উপহাস করত তারাও বাংলাদেশের এমন সাফল্যকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। মহাকাশে আমাদের পদযাত্রা মাত্রই শুরু হলো। তবে এটাকে শেষ বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। আমাদের অগ্রযাত্রা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। নতুন নতুন গবেষণা এবং আবিষ্কারে দেশ এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। আগামী প্রজন্ম একদিন আমাদের কৃতকর্ম নিয়ে গর্ব করবে। হয়ত সেই সুদিন আর খুব বেশি দূরে নয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

একই ধরনের আরও সংবাদ