অধিকার ও সত্যের পথে

শিক্ষার আসল সংকট মাধ্যমিক পর্যায়ে

 মো. মইনুল ইসলাম :

জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে শিক্ষা যে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ শিক্ষিত মানুষই উন্নয়নের চাবিকাঠি। অন্যদিকে শিক্ষা শুধু জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই সৃষ্টি করে না, তাকে সুসভ্যও করে তোলে।

এ দুইয়ের সম্মিলনে সৃষ্টি হয় সভ্যসমাজ। উন্নত-সমৃদ্ধ অর্থনীতির সঙ্গে সভ্য মানুষের মিলনের ফলে সভ্যতার জয়রথ এগিয়ে চলে। উন্নয়ন তাই বৃহৎ অর্থে সভ্যতার অগ্রগতি। সুশিক্ষিত, সভ্য এবং সৃষ্টিশীল মানুষ তৈরির কারখানা হল বিদ্যালয়। বিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল তিনটি উপাদান হল : ১. পর্যাপ্তসংখ্যক যথোপযুক্ত শিক্ষক; ২. আগ্রহী শিক্ষার্থী এবং ৩. শিক্ষাবান্ধব সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশ।

আলোচ্য নিবন্ধে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার ওপরই বিশেষভাবে আলোকপাত এবং সে পর্যায়ের শিক্ষক সংকটের বিষয়টির ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। কারণ শিক্ষকই শিক্ষাদানের মূল কারিগর।

শিক্ষাব্যবস্থাটি অনেকটা বেশ কয়েক তলাবিশিষ্ট একটি অট্টালিকা বা ইমারতের মতো, যার মধ্যে আছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক বা ডিগ্রি এবং স্নাতকোত্তর বা পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্তর। তার গোড়া বা ভিত্তি হচ্ছে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তর। ভিত্তি দুর্বল হলে যেমন গোটা ইমারতটি দুর্বল এবং নড়বড়ে হয়ে পড়ে, তেমন অবস্থা শিক্ষারও। আমাদের দেশে শিক্ষার বড় দুর্বলতা প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরে। তবে মাধ্যমিকের তুলনায় প্রাথমিকের অবস্থা অনেকটা ভালো।

এর বড় কারণ, প্রাথমিক শিক্ষাকে সরকার মোটামুটি জাতীয়করণ করে ফেলেছে। বেশ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এখানে শিক্ষক নিয়োগ করা হয় এবং তাদের ট্রেনিং দেয়া হয়। সরকারি স্কেলে বেতন-ভাতা পাওয়ার ফলে তাদের আর্থিক অভাব-অভিযোগও কম। ফলে শিক্ষাদানের কাজটি যথেষ্ট উন্নতমানের না হলেও মোটামুটি ভালোভাবেই চলছে বলা যায়। কিন্তু বড় সমস্যা হচ্ছে মাধ্যমিক বা সেকেন্ডারি পর্যায়ে। এ ধারণাটি আমার বদ্ধমূল হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে। আমাদের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি, বাংলা এবং গণিতের দুর্বলতা থেকে এটা স্পষ্টতই ধরা পড়েছে। তাদের ইংরেজিতে দুর্বলতা অত্যন্ত দুঃখজনক। শুরুতেই বলা হয়েছে, শিক্ষার মূল তিনটি উপাদানের বড় একটি হচ্ছে পর্যাপ্তসংখ্যক উপযুক্ত শিক্ষক। আমাদের মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে এ উপাদানটির প্রচণ্ড অভাব আছে।

কিছুদিন আগে একটি খবর ছিল, সরকারি হাইস্কুল এবং কলেজে আট হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য (দৈনিক সংবাদ ২৬-৪-১৮)। বেসরকারি হাইস্কুলগুলোতে এ অবস্থা আরও করুণ। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মানোন্নয়নে করণীয় নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা দফতরের (মাউশি) উদ্যোগে আয়োজিত এক সভায় রাজধানীর ৪৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকদের অভিমত এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের মতে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ। দেশজুড়ে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষকের পদ খালি রয়েছে। ফলে মানসম্মত শিক্ষাদান দূরের কথা, শিক্ষা কার্যক্রমই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে (যুগান্তর ২৭-৪-১৮)। হাইস্কুলগুলোয় উপযুক্ত দূরে থাকুক, প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষকের যে নিদারুণ অভাব, এসব তথ্য-উপাত্ত থেকে তা সহজেই অনুমেয়। উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন এবং ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের অভাবের ফলে মাধ্যমিক স্কুলগুলোর বেহাল অবস্থা দেশের শিক্ষিত সচেতন মানুষ অবগত। সরকার যে এটা জানে না তা নয়। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সরকার তাই সেকেপ (ঝঊছঊচ) বা ‘মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানবৃদ্ধি’ নামক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কিন্তু সমস্যাটি এত বিরাট যে, সেকেপের বিশেষ কোনো দৃষ্টিগ্রাহ্য ফলাফল মাঠ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না। মাধ্যমিক স্তরে পর্যাপ্তসংখ্যক উপযুক্ত শিক্ষক না পাওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ আছে।

প্রথম কারণ হচ্ছে বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের চাকরিটি যোগ্যতাসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েটদের কাছে নানা কারণে আকর্ষণীয় নয়। এর বেতন-ভাতা অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি চাকরির তুলনায় খুব কম।

এখনও বেশ কিছুসংখ্যক স্কুল সরকারি এমপিওভুক্ত নয়। এমপিওভুক্ত স্কুল শিক্ষকদের সরকারি কর্মচারীদের মতো অন্যান্য ভাতা নেই। বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা পদোন্নতির সুযোগ নেই বললেই চলে। তা ছাড়া আছে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অব্যবস্থাপনা ও খামখেয়ালিপনা।

নেহায়েত বাধ্য না হলে শিক্ষিত মেধাবীরা বেসরকারি হাইস্কুলের চাকরিতে আসে না। এমনকি সরকারি হাইস্কুলেও যারা আসে তারাও এটাকে বেকার থাকার চেয়ে ভালো বিবেচনা করে আসে। সেখানেও পদোন্নতির সুযোগ খুব কম। এমনকি সিলেকশন গ্রেড পাওয়ার সুযোগও তেমন নেই বলে অভিযোগ আছে। তাছাড়া দেশের প্রচলিত সংস্কৃতিতে সরকারি চাকরির আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে ক্ষমতা এবং অর্থ উপার্জনের সুযোগ-সুবিধা। ক্ষমতা মানেই সাধারণ মানুষের ওপর বাহাদুরি প্রদর্শন। তার সঙ্গে অনেক চাকরিতেই ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ আয়-রোজগারের সুযোগ থাকে। সে হিসাবে শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রচলিত অর্থে ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ খুব কম। অন্যদিকে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের পথ তেমন নেই, যদিও কিছুসংখ্যক শিক্ষক প্রাইভেট পড়ানোর মতো অনৈতিক কাজ করে থাকে। তাই বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে আমার ছাত্রদের কেউ কেউ চাকরি পাওয়ার পর তাদেরকে বলতে শুনেছি ‘গরিবের চাকরিটি পেয়েছি’।

আমাদের সমাজও এর জন্য কম দায়ী নয়। শিক্ষক মানে ‘গরিব মাস্টার’ জাতীয় ধারণা সমাজে শিক্ষককে অবহেলা এবং করুণার পাত্রে পরিণত করেছে। দুয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে সরকারি হাইস্কুলের একজন অ্যাসিসটেন্ট টিচারের চেয়ে পুলিশের একজন এসআই বা সাব-ইন্সপেক্টরকে বিয়ে-শাদির ব্যাপারে অনেক বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, সমাজ অবৈধ ক্ষমতাধারী এবং দুর্নীতিবাজ অর্থবিত্তসম্পন্ন মানুষকে অধিক সম্মান এবং গুরুত্ব দিচ্ছে।

যা হোক, শিক্ষককে সমাজ মার্যাদা দিক না দিক, অন্তত রাষ্ট্র তাকে ন্যায়সঙ্গত বেতন-ভাতা দিক এটা শিক্ষার স্বার্থেই দরকার। শিক্ষা চাইবেন, অথচ শিক্ষককে ন্যায্য আর্থিক সুবিধা দেবেন না- এটা হয় না। তাছাড়া মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে বড় ধরনের বেতনবৈষম্য থাকা উচিত নয়। বিষয় বিবেচনায় মাধ্যমিক স্কুলে ইংরেজি এবং অঙ্কের শিক্ষকের অভাব অতিশয় প্রকট। প্রয়োজনে অতিরিক্ত বেতন এবং যথাযথ ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে এ দুটি বিষয়ে শিক্ষকের অভাব দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলোর দিকে।

সেখানকার মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে যেমন নেই পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক, তেমনি নেই যথোপযুক্ত শিক্ষক। বিশেষ করে ইংরেজি এবং অঙ্কের শিক্ষক নেই বললেই চলে।

শিক্ষকদের বেতন-ভাতা তথা যথোপযুক্ত পারিশ্রমিকের কথা আগেই বলা হয়েছে। সেটা হবে আর্থিক প্রেষণা দেয়ার একটি উপায়। অনার্থিক প্রেষণার মধ্যে গুণী শিক্ষকদের সম্মানিত করার উদ্যোগও নিতে হবে। তাদের সম্মাননা ও সংবর্ধনা দেয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। জাতীয়, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে প্রতি বছর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ঘোষণার প্রথা চালু করা দরকার। সরকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করলে শিক্ষকরা অনুপ্রাণিত হবেন এবং সমাজেও তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।

অন্যদিকে শিক্ষকদেরও আন্তরিকতা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তাদের কাজকর্মও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরিদর্শন ও পরিবীক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্রদের দুর্বলতার একটি বড় প্রমাণ পাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া বেশকিছু শিক্ষার্থীর অকৃতকার্যতায়। একবার দেখা গেল মাত্র দু’জন ছাত্র ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। এসব থেকে এটা স্পষ্ট যে, আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগতমান খুবই দুর্বল। পরিশেষে বলব, আমাদের শিক্ষার আসল গলদ মাধ্যমিক পর্যায়ে।

মো. মইনুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

একই ধরনের আরও সংবাদ