অধিকার ও সত্যের পথে

আমরা কবে মানুষ হবো?

 আরাফাত শাহীন

নের পশু কখনও প্রয়োজন ছাড়া অপর কোনো পশুকে আক্রমণ করেনা। হয়ত বেঁচে থাকার তাগিদে খাদ্যের প্রয়োজনে নয়ত নিজেকে অপরের হাত থেকে বাঁচাতে তারা এই পথ ধরে। সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ হয়েও মানুষ বিনা কারণে কোনো মানুষকে আক্রমণ করে। কোনো প্রয়োজন নেই তবুও মানুষ অপরকে খোঁচা মারে। এই স্বভাবটা মানুষের বেশ ভালোভাবেই আছে। বনের কোনো পশু অন্য পশুর শারীরিক কিংবা অন্য কোনো উন্নতিতে মনে কষ্ট পায় কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু মানুষ সেই প্রাণী যে অন্যের উন্নতি দেখলে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে। একে বলা হয় পরশ্রীকাতরতা। পরের শ্রী বা উন্নতি দেখে হৃদয়ে যে কাতর মনোভাব জাগ্রত হয় তাই পরশ্রীকাতরতা। কেন মানুষ এভাবে পরশ্রীকাতর হতে পারে? এই প্রশ্নের জবাব আমাদের জানা নেই।

পাশের বাড়ির ছেলেটি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে আমাদের মনে দুঃখ হয়। অমুকের ছেলে এত ভালো করলো কী করে! আর নিজের ছেলে যদি কোনো কারণে খারাপ রেজাল্ট করে তাহলে তো কোনো কথাই নেই। আমরা উঠেপড়ে লাগি তাকে পেছনে ফেলার জন্য। আমাদের ভেতর এই ভয়ংকর ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। কেউ যদি একটা ভালো গাড়ি কেনে, ভালো একটা বাড়ি বানায়, ভালো বেতনের চাকরি করে তাহলে আমাদের এত কষ্ট হয় কেন? আমদের মানসিকতা এত নগ্ন কেন! অথচ আমাদের উচিত ছিল ভাই-ভাই হিসেবে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাজে বসবাস করা। এতে আমাদের নিজেদের যেমন উন্নতি হতো তেমনি আমাদের সমাজও সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হতো। আফসোস! আমাদের ভেতর কোনোপ্রকার অনুশোচনার লেশমাত্র নেই।

আমরা সবাই আজ নিজেদের মিথ্যা অহংকার এবং পরশ্রীকাতরতার জন্য পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছি। পরস্পরকে সাহায্য করা তো দূরে হোক, সবার সাথে ঠিকমত কথা পর্যন্ত বলিনা। আমাদের আচরণ আজ বনের পশুর মত হয়ে গিয়েছে। একই সমাজে বাস করার পরেও নিজেদের কর্মকাণ্ডের দ্বারা পরস্পরকে আমরা নিজেদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছি। যেন সবাই এক একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস করছি! বাঙ্গালীদের ভিতর পরশ্রীকাতরতার পরিমাণটা একটু বেশিই যেন। পৃথিবীর আর কোনো জাতির মধ্যে এই মনোভাব এতটা প্রকটভাবে আছে কিনা আমাদের জানা নেই। একজন ব্যক্তিকে কীভাবে টেনেহিচড়ে নিচে নামিয়ে আনা যায় সেটা আমরা খুব ভালোভাবেই পারি।

আমরা নিজেদের স্বার্থের জন্য যে কাজগুলো করে চলেছি তা কোনোমতেই যথার্থ নয়। আমাদের মানুষ হতে হবে। পরশ্রীকাতরতা কোনো সুস্থ, সুন্দর ও স্বাভাবিক মানুষের ভিতর থাকতে পারেনা। আমার প্রতিবেশী যদি আমার চেয়ে ভালো থাকতে পারে তাতে আমার অসুবিধা কোথায়? বরং আমার উচিত হবে তাকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করা। একজনের বিপদেআপদে আমি যদি এগিয়ে না গিয়ে অহংকারবশত দূরে দাঁড়িয়ে থাকি তাহলে আমার বিপদে তো সেও এগিয়ে আসবে না! আমাদের মন থেকে সকল প্রকার পরশ্রীকাতরতার বিষ ঝেড়ে ফেলতে হবে। আমাদের সকলপ্রকার আমিত্বকে বর্জন করতে হবে। আমাদের ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’তে উপনীত হতে হবে। সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আমাদের ভেতরকার পারস্পরিক বিদ্বেষ ঝেড়ে ফেলতেই হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

একই ধরনের আরও সংবাদ