অধিকার ও সত্যের পক্ষে

শবে বরাতের প্রমাণ্যতা, আমাদের করণীয় এবং বর্জনীয় গূরুত্বপূর্ন কিছু কথা

 মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী হাফিজাহুল্লাহঃ

পনেরোই শাবান সম্পর্কে চারটি বিষয় সঠিক এবং আমল যোগ্য । ১। এই রাতে আল্লাহ তা’আলা যে পরিমাণে তৌফিক দান করেন , সে পরিমাণে ঘরে বসে একাকি ইবাদত করা। কিন্তু, আমরা এই রাতকে হৈ-হোল্লোরের রাত বানিয়ে ফেলেছি। মসজিদ গুলোতে ও করবস্থান সমূহে ভীর করি, রকমারি খাবারের আয়োজন করি, হাক-ডাক করি, এসব অবাঞ্ছনীয় এবং বর্জনীয়, এসবের কোনো প্রমাণ্যতা নেই, বাস্তবতার সাথে কোনো প্রকার সম্পর্ক নেই। এ রাতে নফল নামাজ আদায় করা চাই, তবে পূর্ণ রাত জেগে নাফল পড়তে হবে এটি জরুরি নয়। আল্লাহ তা’আলা যতটুকু পড়ার তৌফিক দান করেন, ততটুকুই একাকি ঘরে আদায় করা, দল বেঁধে মসজিদ সমূহে সমবেত না হওয়া। কেননা, এটি ব্যক্তিগত আমল, যৌথ বা সমবেত হয়ে আদায়ের কোনো আমল নয়। ২। পর দিন রোজা রাখা, এটি একটি মুস্তাহাব আমল। ৩। এই রাতে নিজের জন্য, আপন আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যারা ইন্তেকাল করেছেন তাদের জন্য, এবং সমস্ত উম্মতে মুসলিমার জন্যে মাগফিরাতের দোয়া করা। আর এ জন্য করবস্থানে যাওয়া অবশ্যক নয় । এ রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করবস্থানে গিয়েছেন, কবরবাসীদের জন্যে দোয়া করেছেন, এটি সত্য। তবে প্রকাশ্যে নয় বরং গোপনে গিয়েছেন, আর ঘটনাক্রমে এটি হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাজিয়াল্লাহু আনহা জেনে যান। কিন্তু, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাতে করবস্থানে যাওয়ার জন্যে কোনো প্রকার হুকুম দেননি। এজন্য আমাদের সমাজে যেই তামাশা হয়, কবরস্থান সমূহে উপস্থিত হয়ে দোয়ার হিড়িক জমে, তা সম্পূর্ণরূপে ভুল ও কুসংস্কার প্রথা। ৪। যে দুজন মুসলমান ভাইয়ের মধ্যে লড়াই-ঝগড়া ও ভেদাভেদ বিদ্যমান, তারা এ রাতে পরস্পরকে ক্ষমা করে সন্ধি করে নিবে। যতক্ষণ পর্যন্ত পরস্পরকে ক্ষমা করে সন্ধিবদ্ধ না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ক্ষমা পাবে না। পনেরোই শাবানের রাতে এই চারটি আমলই যায়িফ হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত। আর যায়িফ হাদীসের উপর ততক্ষণ আমাল করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত এর বিপরীতে সহিহ হাদিস না পাওয়া যায়। কেননা, সহিহ হাদিসের বিপরীতে যায়িফ হাদিসের উপর আমল গৃহীত নয়। কিন্তু, যদি কোনো বিধান সম্পর্কে শুধু যায়িফ হাদিসই হয়, সহিহ কোনো হাদিস না থাকে। তখন যায়িফ হাদীসের উপরই আমল করা হবে। এমন বিধান একটিই নয়, বরং আরও অনেক আছে, যেগুলো সম্পর্কে শুধু যায়িফ হাদীসই বিদ্যমান। এবং যায়িফ হাদীসের মাধ্যমেই সেগুলোর আমল গৃহীত হয়েছে। যেমন, সালাতুত তাসবীহ্ সম্পর্কিত এগারোটি বর্ণনা, এগুলো সব যায়িফ হাদিস। তা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী সলফে সালেহীনদের থেকে সালাতুত্ তাসবীহ্ এর আমল প্রচলিত। তবে হ্যাঁ, যায়িফ হাদিস দ্বারা ওয়াজিব, সুন্নাত এর সমপর্যায়ের আমল প্রমাণিত হবে না। সুতরাং যে হুকুম সালাতুত্ তাসবীহ’র ক্ষেত্রে (এটি পড়া মুস্তাহাব) , ঠিক একই হুকুম শাবানের পনেরো তারিখ রাতের ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ এ রাতে একাকি ইবাদত করা মুস্তাহাব। কেননা, এব্যাপারে যে সমস্ত বর্ণনা পাওয়া যায়, সব গুলো যায়িফ বা দুর্বল। তাই এগুলোর দ্বারা মুস্তাহাব আমলই প্রমাণিত হতে পারে। সুতরাং হাদিস সমূহে বর্ণিত, উপরে উল্লেখিত চারটি আমলই মুস্তাহাব বলে গণ্য করা হবে। শবে বরাত মানা, এ সম্পর্কিত আমল গুলো করা, এবং এর প্রমাণিকতাকে একেবারেই অস্বীকার করা, আর এগুলোকে ভিত্তিহীন মনে করা কোনো ভাবেই ঠিক নয়। কেউ কেউ সূরা দুখানের তিন নং আয়াতকে এ রাতের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। যেমন উল্লেখিত হয়েছে । إِنَّآ أَنزَلْنَٰهُ فِى لَيْلَةٍ مُّبَٰرَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ অর্থঃ আমি একে নাযিল করেছি। এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। অনেকেই এই আয়াতে উল্লেখিত বরকতময় রাত দ্বারা শবে বরাতকে উদ্দেশ্য করেছেন, এটি ভুল। এই আয়াতের দ্বারা শবে বরাত নয়, বরং শবে ক্বদর উদ্দেশ্য। কেননা, কুরআনুল কারীম শবে ক্বদরে নাযিল হয়েছে ।

মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী হাফিজাহুল্লাহ।

শাইখুল হাদিস, দারুল উলুম দেওবন্দ।

অনুবাদক, তালহা বিন ওবায়েদ খাদেম: জামিয়া মাদানিয়া রওজাতুল উলূম, কুমিল্লা।

তথ্যসূত্র : ইলমী খুতুবাত, খন্ড ২. পৃষ্ঠা ২৪৭।

একই ধরনের আরও সংবাদ