অধিকার ও সত্যের পথে

গল্প -স্বপ্ন

 তামান্না স্নিগ্ধাঃ

রাইয়্যু কে আমি খুব আস্তে করে ধমক দিলাম। সারাদিন এত জ্বালাতন করে মেয়েটা যে অসহ্য হয়ে যাই। নরমালি ওকে আমি তেমন বকি না। একদমই কাঁদতে পারে না আমার মেয়েটা। কাঁদতে গেলেই নিঃশ্বাসবন্ধ হয়ে গলায় কান্না আটকে হাঁচি কাশি হয়ে একাকার অবস্থা করে। কিন্তু আজ আর না বকে পারলাম না। অর্ধেক আঁকতে আঁকতেই ছবিটা রেখে মাত্র গেছি কলিংবেল কে চাপলো তাই দেখতে। আর এসে দেখি সে আমার রঙের কৌটা নিয়ে ক্যানভাসের এক কোনা আর নিজের জামাকাপড় মুহূর্তের ভিতর তছনছ করে ফেলেছে। রাগে দুঃখে আবির কে ফোন দিয়ে বললাম, “তুমি এসে তোমার মেয়ে সামলাও, আমি আর পারছি না।” আবির যথারীতি মহা ব্যস্ত। হ্যা, হু করে একটু শুনেই বললো, “নীলা আমার বস সামনে। পরে ফোন দিই? বাসায় এসে ডিটেইলসে কথা বলি কেমন? আর রাইয়্যু কে বোকো না যেন তুমি।” এদিকে আমি ড্রইং রুমে ইলেক্ট্রিশিয়ান কে বসিয়ে রেখে এসেছি।

গ্যাসের চুলায় কি সমস্যা হইছে একগাদা ধোয়া হচ্ছে সাথে কেমন একটা শব্দ। ভয় হচ্ছে বার্স্ট না হয়। ঠিকমত রান্নায় করা যাচ্ছে না। আবার নিচতলা থেকে ময়লার ঝুড়ি নিতে ময়লাআলা আসছে। রাইয়্যু চিল্লাছে। মাঝে মাঝে মনে হয় পাগল হওয়ার আর বাকি নেই। রাইয়্যু কে ধুইয়ে মুছিয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ছবি আঁকাটা বুঝি এবার বাদ ই দিতে হলো। অথচ এক সময় কত সখ ছিলো গ্যালারী ভর্তি আমার আঁকা ছবি থাকবে, আর্ট এক্সিবেশন হবে। বিয়ের পর অবশ্য বেশ কিছু ছবি এঁকেছিলাম। তারপর রাইয়্যু পেটে এলো। ছবি আকাঁয় ভাটা পড়লো। আবীর অবশ্য সবসময়ই এ ব্যাপারে হেল্পফুল ছিলো।

কখনোই আমার আকাঁআকি বাদ দিতে বলে নাই বরং ইন্সপায়ার করতো। কিন্তু রাইয়্যুটা এত চঞ্চল যে প্রথম কয় বছর আমিই গরজ করতাম না। আর এখন তো চেষ্টা করেও পারছি না। অফিস থেকে এত ক্লান্ত হয়ে ফেরে বেচারা যে তখন আর মেয়েকে নিয়ে একগাদা অভিযোগ দিতে ইচ্ছে করে না। রাইয়্যুও ঐ সময় বাবার কোলে পিঠে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে এমন আদর নেয় যে সেই সময় ভিলেন হতে কার ই বা মন চায়। মেয়েটা ছুটির দিন ছাড়া বাবাকে পায়ও না সেভাবে।

সকালে ও ঘুম থেকে ওঠার আগেই আবির অফিসে চলে যায়, আর ফেরে তো সেই রাত দশটাই। মাঝে মাঝে ভাবি এই জীবনটাই কি আমি চেয়েছিলাম! চারুকলার টিচাররা পর্যন্ত যেখানে বিশ্বাস করতেন একদিন আমার আঁকা ছবি দেশে বিদেশে সুনাম কুঁড়াবে। সেখানে এই মূল্যায়নহীন ত্যাগ। ঘুমোতে এসে ভাবি, ভেবেই চলি, কোনটাকে দূরে সরাবো? ক্যানভাসে রঙ তুলি কাগজ আমার বুকের ভিতরের স্বপ্ন, আর বালিশে মাথা দেয়া আমার রক্ত মাংসের স্বপ্ন। মাঝরাতে আমি দ্বিধায় ভুগি।আবির আমার মাথায় হাত রাখে, কাছে টেনে বলে তুমি যে স্বপ্নই বেছে নেও না কেন, আমি পাশেই আছি। আমি মৃদু হেসে রাইয়্যুর নাকটা একটু টেনে দি। আমার স্বপ্নের নাকটা বোঁচা হয়েছে।

লেখকঃ তামান্না স্নিগ্ধা।

উৎসর্গ : পৃথিবীর সে সকল মায়েদের যারা সন্তানের জন্য নিজের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বিসর্জন দেন।

একই ধরনের আরও সংবাদ