অধিকার ও সত্যের পক্ষে

যে কারণে শিক্ষা জাতীয়করণ জরুরি

 মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদঃ

‘শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড’ তাই মানব সম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। কেননা, জাতিকে খাড়া, সোঝা ও মজবুত রাখার দায়িত্ব পালন করেন এবং শক্তি যোগায় যারা তারাই ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ অর্থাৎ ‘শিক্ষক’। অথচ দেশের অভিন্ন সিলেবাসে পাঠদানকারী প্রায় শতভাগ বেসরকারি শিক্ষক নানান বঞ্চনা শিকার। কারিগরকে অভূক্ত, অবহেলিত রাখলে জাতি হয়ে ওঠবে দূর্বল, অবনমিত ও নিম্নগমী। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সবার সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয় হিসেবে স্বীকৃত। এ জন্যই একটি মাত্র সর্বসন্মত জাতীয় গণদাবি ‘শিক্ষা জাতীয়করণ’।

এ দাবি শুধু একজন শিক্ষকের সুখী জীবনযাপনের জন্য নয়। বরং এ দাবি হওয়া উচিত কৃষক শ্রমিক মেহনতি জনতার। শিক্ষা জাতীয়করণের জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। গ্রামে-গঞ্জে, বাজার-বন্দরে, দোকানে বা চায়ের স্টলে সর্বত্র সবাইকে সংহতি প্রকাশ করতে হবে শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিতে।
মানুষের মৌলিক প্রয়োজন অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থানের মতোই ‘শিক্ষা’ মানুষের মৌলিক অধিকার। একটি কল্যাণরাষ্ট্র মানুষের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। আমাদের সরকারও মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কাজেই, শিক্ষা জাতীয়করণ হলে:

১. গরিব-দূঃখি সবার সন্তান উন্নততর শিক্ষার সুযোগ পাবে।
২.গরিবের শিক্ষালাভের সুযোগ বাড়বে এবং ব্যয় কমবে।
৩. গ্রামের মানুষকে শহরে গিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভীড় করতে হবে না। সবার তো শহরে যাওয়ার সামর্থ্যও নেই। এ সমস্যার সমাধান হবে।
৪. বড় বড় শহরে জন-স্ফীতি হ্্রাস পেলে যানজট থাকবে না।
৫.শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন হবে।
৬. মান সম্মত শিক্ষা ও শিক্ষকের ঘাটতি দূর হবে।
৭. ভাল প্রতিষ্ঠান, খারাপ প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত ধারণা থাকবে না।
৮.সবার জন্য শিক্ষা, নারী শিক্ষা, কর্মমুখী বা কারিগরি শিক্ষা সব ক্ষেত্রে প্রভুত উন্নতি সাধিত হবে।
৯. ক্রমশ একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা সহজ হবে।
১০. মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হবে সহজতর এবং দ্রত।

অন্যদিকে, এবারও এমপিওভুক্তগণের প্রত্যাশিত ৫% প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখিভাতা মিলল না! ২০১৫ বেতনস্কেলের নিদের্শনায় রয়েছে নতুন করে পাঁচ বছর অন্তর বেতনস্কেল হবে না। বৎসরান্তে জুলাই মাসে জাতীয় বেতনস্কেলভুক্তগণ ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সুবিধা পাবেন, যা চক্রবৃদ্ধি হারে অব্যহত থাকবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে ২০% বৈশাখিভাতা চালু হয়। অথচ জাতীয় বেতনস্কেলভুক্ত সবাই সুবিধা দু’টি ইতোঃমধ্যেই পেলেও শুধু বঞ্চিত রয়ে গেছেন এমপিওভুক্তগণ।

মানুষ গড়ার কারিগরকে এমপিওভুক্তির নামে দেওয়া হয় ‘অনুদান’। এমপিওভুক্তগণ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ও উৎসবভাতা পান না। তারা পদোন্নতি, স্বেচ্ছাঅবসর, বদলি সুবিধাসহ অসংখ্য বঞ্চনার শিকার! তারা পদমর্যাদা অনুযায়ী বাড়িভাড়া পান না। ‘প্রিন্সিপাল থেকে পিওন’ সবাই বাড়িভাড়া পান ১০০০/=, চিকিৎসাভাতা ৫০০/= মাত্র। এ গুলো নিতান্তই অপ্রতুল।
এ ছাড়াও শিক্ষকদের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে: সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি বা পরিচালনা পরিষদ দলীয় রাজনীতি মুক্ত রাখা এবং তা সংস্কার করে সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ, বিচ্ছিন্ন ও খÐিতভাবে স্কুল কলেজ জাতীয়করণের চলমান প্রক্রিয়া স্থগিত করে সুনিদির্ষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করে শিক্ষা জাতীয়করণ করা, সিলেবাস অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ ও অনার্সসহ স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজের সকল স্তরের নন-এমপিও শিক্ষকদের নিঃশর্তভাবে শীঘ্রই এমপিওভুক্ত করা, শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটের ২০% বা জিডিপির ০৬% বরাদ্দ নিশ্চিত করা, কর্মরত সব শিক্ষকের চাকুরির মেয়াদকাল ৬০ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করা।

এমন বাস্তবতার মধ্যেও ‘শিক্ষা জাতীয়করণে’ এমপিওভুক্তদের অধিকারের আওয়াজে নেতৃবৃন্দ আশাবাদী হবার উপযোগি পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন নি। আকাশের লক্ষ তারার মতোই আমাদের শিক্ষক নেতৃবৃন্দের অসংখ্য ধারা! কাজেই, কেউ আমাদের ধার ধারেন না! আমাদের শিক্ষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ হয়তো এ বিষয়ে একমত যে, ‘তারা কখনো ঐক্যবদ্ধ হবেন না’! কেউ আবার নেতৃত্ব জাহির করে হঠাৎ নিরব হয়ে যান। তখন তাদের হাতের শোভা ‘এক আশ্চর্য প্রদীপ’। কথাগুলো রূঢ় মনে হলেও, আমার ২৫ বছরের পেশাগত অবস্থান বারবার বহুভাবে আমাকে এমনই তিক্ত বাস্তবতার নিরব সাক্ষী করেছে।

পরিশেষে সবার প্রত্যাশা ‘দেশের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা’ অচিরেই জাতীয়করণের যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন শিক্ষক দরদী প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা। কেননা, তাঁর উন্নয়নের মহা সড়কে বড়ই বেমানান শোনাবে যদি লাখ লাখ ‘সাদা অন্তর’ গুমড়ে কেঁদে ওঠে:

“আমি যেন সেই ভাগ্যাহত বাতিওয়ালা
পথে পথে আলো দিয়ে বেড়াই
কিন্তু নিজের জীবনেই অন্ধকার মালা”।
(‘তালেব মাস্টার’: আশরাফ সিদ্দিকী)

লেখক: সহকারী অধ্যাপক কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ কাপাসিয়া গাজীপুর- 

একই ধরনের আরও সংবাদ