অধিকার ও সত্যের পক্ষে

মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি

 এ এইচ এম সায়েদুজ্জামানঃ

লালন বলে মানুষ আকার

ভজলে তারে পাবি।।

মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি

মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি।

বাংলার বাউলের এই বিশ্বাস, বাউলের ধর্মসাধনার মূলকথাটি তাই, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি । এই মানুষ ভজার পথটি কিন্তু অত সহজ নয়, বরঞ্চ অনেকই  জটিল, প্রায় দুঃসাধ্যই বলা চলে। কেননা, দীর্ঘকালের পথ পরিক্রমায় বাউল সাধনায় এসেছে মিশেছে নানা পথ ও মত। সে কারণেই জ্ঞান, যোগ এবং বামাচারী সাধনমার্গ হয়ে উঠেছে বাউল সাধনারই অনিবার্য অঙ্গ। বামাচারী সাধনা হল কামজ সাধনা; অর্থাৎ এই সাধনায় নারীসঙ্গ অনিবার্য। বাউলের সাধনা আবার কামশূন্য জ্ঞানমার্গীয়ও বটে। অর্থাৎ বাউলের বিশ্বাস এই যে শুদ্ধজ্ঞান সাধন করেই তবে ‘অজান’ (unknown) খবর জানা যায়। এই নিগূঢ় ‘অজান’ খবর জানার তৃষ্ণায় কাতর বাউলগণ বাংলার পথে পথে ঘুরে বেড়ান এবং গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী সৎ গুরুর সন্ধানে হন্যে হয়ে ওঠেন। যে যোগসাধনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য শ্বাসপ্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রন, বাউলের সাধনায় সে যোগের অমসৃণ পথও এসে মিশেছে । এসব কারণেই বাউলের সাধনা অনায়াস লব্দ নয়। কাজেই মানুষ ভজার পথটি অত সহজ নয়, অনেকই জটিল।

 লালনের সোনার মানুষ কোথায় রয়েছেন ? দ্বিদলে মৃণালে। মৃণাল রয়েছে মানবদেহের ভিতরে। এসবই বাংলার বাউলের কল্পনা। বাউলগণ এই কল্পনাসূত্র লাভ করেছেন বাংলার তান্ত্রিক ঐতিহ্য, সুফিমত এবং ষোড়শ শতকের সহজিয়া বৈষ্ণবগণের কাছ থেকে । দেহের ভিতরে আরও রয়েছে পদ্ম এবং সে পদ্মেই আলোকিত হয়ে রয়েছেন সোনার মানুষ।

সবশেষে ছেঁউড়িয়ার সাঁইজী বলিছেন-

মানুষ ছাড়া মন রে আমার

দেখবি ভবে সব শূন্যকার।

ফকির লালন বলে মানুষ আকার

(এই রূপ) ভজলে পাবি।

 

মানুষ পলে পলে যে শূন্যতার বোধ উপলব্দি করে, তা আসলে সেই অন্তরের মানুষেরই বিহনে। ভিতরকার মানুষের উপলব্দির অভাবহেতু সবই যে শূন্য ঠেকে।বুকটা কেমন খাঁ খাঁ করে। সবই যে অসার আর নিরর্থক মনে হয়, প্রার্থনার সকল সময় শূন্য মনে হয়।  এই তিক্ত শূন্যতা মানুষ সইতে পারে না। তাই সেই নিরালম্ব শূন্যতা ভরিয়ে তুলতেই সে মানুষ ভজনে ব্রতী হয়। সেই মানুষের অলীক স্পর্শ লাভ হলে তবেই গিয়ে হৃদয়ে পরম সন্তোষ আর গভীর চিত্তসুখ লাভ হয়। সেই চিত্তসুখ লাভ করেই সোনার মানুষ ।

মানুষকে রবীন্দ্রনাথ চিরযাত্রী বলেছেন। মনুষ্যত্বের সার সত্তার দিকে তার নিয়ত অভিযাত্রা। যে-যাত্রার কথা রয়েছে এলিয়টের ‘দি জার্নি অব দি ম্যাজাই’ কবিতায়। পূর্বদেশীয় বৃদ্ধরা দীর্ঘ যাত্রার অন্তে তীর্থে পৌঁছে বলেছিল, ‘মাতা দ্বার খোলো’। শিশ যিশুখ্রিষ্টের মতো মহামানব তথা শাশ্বত মানবের আবির্ভাব ঘটে তখন। ‘শিশুতীর্থে’র যাত্রীরাও শেষ পর্যন্ত ওই চিরমানবতার তীর্থে উপনীত হয়েছিল। ‘সভ্যতার সংকটে যন্ত্রণাদীর্ণ কবিও শেষ পর্যন্ত গেয়ে উঠেছেন—‘ওই মহামানব আসে।দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে। মর্ত্যধূলির ঘাসে ঘাসে’। চিরন্তন মানুষ হওয়ার জন্যই যাত্রা সর্বমানবের।

ইসলাম ধর্ম মতে মানুষকে সুষ্টির সেবা জীব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ

“যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা।” (সূরা বাইয়্যেনাঃ ৭)

 “”আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দর থেকে সুন্দরতর আকৃতিতে”। (সুরা আত ত্বীনঃ ৪)

আল্লাহপাক বলেন, যে মানুষ তার লক্ষ্যবস্তু বোঝে না, তার সৃষ্টি রহস্য উদ্ঘাটন করতে চিন্তাভাবনা করে না, সে কোত্থেকে এসেছে, কেন এসেছে, কোথায় যাবে, তার পরিণাম কী হবে- এসব যে বোঝে না, সে দেখতে মানুষ হলেও মূলত পশুর মতো, এমনকি পশুর চেয়েও অধম। আল্লাহ প্রথমেই বলতে পারতেন, এরা পশুর চেয়েও অধম। কিন্তু এরূপ না বলে তিনি উপরোক্ত দুটি শব্দ ব্যবহার করেছেন। এর একটি কারণ হলো- পশুর চেয়ে অধম কোনো জাতি আল্লাহ পৃথিবীতে সৃষ্টি করেননি। যেমন আমরা উপমা দেই যে, এই লোকটা বাঘের মতো। বাঘ তো কল্পনা করা যায়। আরও বলি, এই লোকটা সাপের মতো দংশন করে মানুষকে। অর্থাৎ সাপ যেমন ভয়াবহ, এই মানুষটা তেমন ভয়াবহ। কিন্তু পশুর চেয়ে নিম্নস্তরের জিনিস বাস্তবে পাওয়া যায় না। তাই পশুর চেয়ে নিম্ন কোনো উদাহরণ পেশ করা সম্ভব নয়। কিন্তু কোরআনে বলা হচ্ছে, পশুর চেয়েও অধম ওই লোকটা যে তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বোঝে না।

রবীন্দ্রনাথ তুলনা করে দেখিয়েছেন—মানবদেহে যেমন অসংখ্য জীবকোষের অবস্থান এবং সেগুলি স্বতন্ত্র থেকেও দেহের সার্বিক পরিপোষণে নিয়োজিত থাকে, তেমনি স্বতন্ত্র ব্যক্তি মানুষই সমন্বিতভাবে মানবসত্তা গড়ে তোলে। সেই পূর্ণের অনুভব ব্যক্তি মানুষের উপলব্ধিতে থাকে। তাই মানুষ জানতে পারে সে ব্যক্তিমাত্র নয়, বিশ্বমানবের অন্তর্গত সত্তা। এতে জাগতিক কোনো সুবিধা নেই, কিন্তু বিরাট সত্তার সঙ্গে একাত্মতার বোধ থেকে জন্মায় অহেতুক আনন্দ। এ সবই মনুষ্যত্বধর্মের পরিচয় বহন করে। এ সবই মনুষ্যত্ব ধর্মের পরিচয় বহন করতে পারলে সোনার মানুষ হওয়া সম্ভব। নজরুল আবার ধর্মের চেয়েও বড়ো করে দেখেছেন মানুষকে, বলেছেন—‘মানুষ এনেছে ধর্ম, ধর্ম আনেনি মানুষ কোনো’ আবার বলেছেন

গাহি সা গাহি সাম্যের গান-

   মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান্  । অধর্মাচারী হিংসার কবল থেকে মুক্ত হবার জন্য মানুষকে আজ সত্যধর্ম আর যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসার ঘটাতে হবে।

আমরা আসলে যুগ যুগ ধরে মানুষ নাম নিয়ে বেঁচে থাকি তবে কতখানি সেই নামের সার্থকতা অর্জন করতে পারি বা মানুষ হতে পারি তা অনেকই জানিনা। তাহলে কি আমরা মানুষনই বা আসলেই কি আমরা মানুষ হই ? সেটার সঠিক জবাব পেতে মানুষ কাকে বলে সেই সংজ্ঞাটা জানতে হবে। মানুষ বলতে সংক্ষেপে যার মান আছে এবং যার ভালো মন্দ বিচার করার ক্ষমতা বা হুশ আছে তাকেই মানুষ বলা যেতে পারে।মানুষ হল সৃষ্ঠির সেরা জীব। একমাত্র মানুষই পারে তার মেধা, বুদ্ধি সচেতনতাবোধ ইত্যাদির মাধ্যমে যে কোন একটা কাজের সমাধান দিতে। আর মানুষের উপরোক্ত গুণগুলো যখন লোপ পায় তখন মানুষ পশুত্ব বরণ করতে সক্ষম হয়। না হলে মানুষই একমাত্র জীব যার মানটা সম্পূর্ন ডিফারেন্স। মানুষ = বিচারবোধ + বিবেকবোধ = মানুষ।

পশুঃ পশু বলতে যার ভাল-মন্দ বিচার করার কোন ক্ষমতা, বিচারবোধ, বিবেকবোধ বুদ্ধিমত্তা এ গুণগুলোর কোন গুণই কোন কাজে ব্যবহার হয় না তাকে পশু বলা যেতে পারে।

পশু = বিচারবোধ – বিবেকবোধ = পশু

এক কথায় বলতে গেলে বলা যায়, প্রান থাকলে প্রাণী হওয়া যায় কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হওয়া যায় না। একটু বিস্তারিত ভাবে বলতে গেলে বলা যায়, মানুষ হতে গেলে মন, জ্ঞান মনুষ্যত্ব, বিবেক, বিবেচনা করার বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োজন। আর এই বিষয় গুলো না থাকলে মানুষ হয়েও বিবেক, মনুষ্যত্ব হীন বর্বর পশুর চেয়ে অধম হয়ে থাকতে হবে। তাই আমি মনে করি মানুষ থেকে যেমন পশুতে পরিণত হওয়া জায়। তেমনি মানুষ থেকেও আবার মহামানবে পরিণত হওয়া যায়। আর এই বিষয়টা ধরার ক্ষমতা যার আছে সেই মানুষ।

মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার মানদণ্ডটাও আমাদের সমাজে খুব ব্যাতিক্রম। যেমন আমাদেরকে প্রথমেই বুঝানো হয় যে যদি আমরা শ্রেণীতে প্রথম হই বা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাই তবেই আমরা মানুষ হব।

 স্কুল কলেজে ভাল নম্বর পেয়ে যখন আমরা ভাবি আমরা মানুষ হয়েছি তখন আমাদের বলা হয় যদি বুয়েট বা মেডিকেলে ভর্তি হতে পারি তবে মানুষ হব। এরপর পড়াশুনা ভালোভাবে শেষ করে সরকারী কোন অফিসে উচ্চপদস্থ কোন কর্মকর্তা হলে তবেই আমরা মানুষ হব।

আমরা চিকিৎসক প্রকৌশলী আর বড় বড় সরকারী কর্মকর্তা হয়ে নামী দামি মানুষ হই। আমরা টাকার জন্য রোগীদের হাজারটা টেস্ট দেই, প্রয়োজন না থাকলেও সিজার করি , অনুমোদন ছাড়াও বড় বড় ইমারাত বানাই, রাস্তা ঘাটের ইট বালুও প্রয়োজনে খাই। ঘুস খেয়ে অযোগ্য লোককে চাকরি দেই, দেশের অবকাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে আমরা দুর্নীতির কালিমায় লেপন করি। আমরা একসময় পিতা-মাতা আর সমাজে পরিণত হই এবং নিজেদের সন্তানদের মানুষ বানানোর উদ্ভট প্রতিযোগিতা শুরু করি। সেই একি প্রক্রিয়া আবার পুনরাবৃতি হয় ঠিক যেই প্রক্রিয়ায় আমরা মানুষ হয়েছি । আমাদের ষাট বা সত্ত্বর বছরের মানব জীবনকে টাকা-পয়শা ,কিছু সারটিফিকেট আর নামদাম দিয়ে সার্থক করে তুলি। আমাদের মানুষ হবার পরও পাহাড়-সাগর, আকাশ-বাতাস ছুঁয়ে দেখার সময় হয়ে ওঠেনা। জ্ঞানীগুণীদের লিখা বইয়ে কত জ্ঞান লুকিয়ে আছে সেটা জানার সৌভাগ্য হয়না। কবিতার সুরে বলি

 ধূর্ত মানুষ  কতক মানুষ কিছু মানুষ

মানুষ মানুষ নিযুত মানুষ

 এ মানুষ ও মানুষ কেমন মানুষ

চায় যে মানুষ অবুঝ মানুষ

বক মানুষ অবাক মানুষ

অন্ধ মানুষ  সুযোগ মানুষ

শুদ্ধ মানুষ বুদ্ধ মানুষ

মনের মানুষ সনের মানুষ

রঙের মানুষ ডঙের মানুষ

জটিল মানুষ নরক মানুষ

উন-মানুষ চুন-মানুষ

বন-মানুষ  শণ-মানুষ

গোনার মানুষ  সোনার মানুষ

আসুন আমরা সোনার মানুষ হয় ।

লেখক-শিক্ষক ,সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

একই ধরনের আরও সংবাদ