অধিকার ও সত্যের পক্ষে

উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষাদানের এই চিত্র?

 হাসান হামিদ

শুরুতেই হোয়াইট হিডের একটি কথা। তিনি বলেছেন,  শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞানার্জন এবং সুষ্ঠু প্রয়োগের একটি পরিকল্পনা ও কৌশল মাত্র। পরিকল্পনা ও কৌশল বিষয়টি শিক্ষার প্রয়োগের শর্ত হিসেবে এখানে জোর দেয়া হয়েছে। মূল আলোচনায় যাবার আগে কিছু মন খারাপ করা পরিসংখ্যান দেব আর একটি মন ভালো করা খবর। আমি বাসার বারান্দায় বসে যখন উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতির আনন্দ র‍্যালি দেখছিলাম, তখন আমার চোখে আরেকটি দৃশ্য ভেসে ওঠছিলো বারবার। সেই দৃশ্যটি কিছু ছেলে-মেয়ের খোলা আকাশে বসে পাঠ্যবই মেলে যারা বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। অবশ্য এটা ভাবতে খুব আনন্দ লাগে যে, বাংলাদেশে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ভর্তির হার এখন প্রায় শতভাগ। এর সাথে খারাপ লাগার কথটি হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো ঘাটতি এখনো প্রবল। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন ‘বাংলাদেশ প্রাইমারি এডুকেশন: অ্যানুয়াল সেক্টর পারফরম্যান্স রিপোর্ট ২০১৭’ অনুযায়ী, একটিমাত্র শ্রেণিকক্ষ দিয়ে চলছে দেশের ৬ হাজার ৫৪৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আর মাত্র দুইটি শ্রেণিকক্ষ আছে ২ হাজার ৮০৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। নদীভাঙনসহ বিভিন্ন কারণে বিদ্যালয় ভবনে ধস, পরিত্যক্ত কিংবা বিলীন হয়ে যাওয়ায় কিছু বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ আছে।

কয়েক দিন আগে (২৯ মার্চ, ২০১৮) এক অনুষ্ঠানে আমাদের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, ‘আগামী ৬ মাসের মধ্যে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সংযোগ চালু করা হবে। একটা সময় আসবে কাগজ কলমের যুগ শেষ হয়ে যাবে এবং শুধু ইন্টারনেটের যুগ থাকবে।’ খুব ভালো কথা, কিন্তু যারা খোলা মাঠে বা গাছ তলায় বসে শিক্ষার কাজটি করছে তাদের বিষয়ে তিনি কি জানেন? আমাদের মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীদের মধ্যে আন্তঃসংযোগ বা সম্পর্ক বোধ হয় একেবারেই সত্যিকার অর্থে নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তো এসব জানে, কোনো ঘর ছাড়া এদেশে নতুন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আছে (রাঙ্গামাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস চলছে স্কুলের দুই রুমে, দৈনিক ইত্তেফাক, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭) সেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কীভাবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চলন্ত সিঁড়ি স্থাপনের। হায়রে টাকা চুরির ধান্দা!

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য করা দরকার, আমাদের দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৬৩ সহস্রাধিক। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রতি ৪০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একটি শ্রেণিকক্ষ রাখিবার নীতি অনুসরণ করিতে বলা হয়েছে। অথচ, প্রাথমিক বিদ্যালয়শুমারি অনুযায়ী, এই নীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে। সেই হিসাবে দেশের ৬৫ শতাংশের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ সংকট রয়েছে। ভবন সংকট ছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষায় ঘাটতি আছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আসবাবপত্রেরও। পানি ও স্যানিটেশনেরও অপ্রতুলতা রয়েছে। আর এসব সংকট নিয়ে চলছে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। যদিও, ইউনেস্কোর নির্দেশনা অনুযায়ী, শিক্ষাখাতে জিডিপির কমপক্ষে ৪ শতাংশ ব্যয় করতে বলা হয়েছে।

এবার সারাদেশের সংকটে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এমন সামান্য কিছু খবরের দিকে লক্ষ করি। কারণ সব খবর একসাথে করলে দিস্তা দিস্তা কাগজেও হবে না।

১। পাবনার গাজনার বিল অধ্যুষিত দুড়িয়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান পর্যাপ্ত বেঞ্চের অভাবে মাটিতে বসে চলছে। সেখানে এভাবেই পাঠ নিতে হচ্ছে তিন গ্রামের শতাধিক কোমলমতি শিশুকে। আর বর্ষা এলেই পানিতে তলিয়ে লেখাপড়া বন্ধ থাকে কয়েক মাস। তাছাড়া তিনটি টিনের ঘরের দু’টি ঘরেই বেড়া নেই। অন্যটির একপাশে বেড়া থাকলেও নাজুক অবস্থা। একটি ঘরের সামনে উড়ছে জাতীয় পতাকা। যা খুবই বেমানান। দেখে বোঝার উপায় নেই এটি বিদ্যালয়।

২। নোয়াখালী সদর উপজেলার নোয়ান্নই ইউনিয়নের সালেহ্পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। তাই পরিত্যক্ত ঘোষিত পুরোনো টিনশেড ভবনের বারান্দায় পাঠদান চলছে শিশুদের। সরেজমিনে দেখা যায়, টিনশেড একটি ভবনের সামনের বারান্দায় চলছে একাধিক শ্রেণীর পাঠদান কার্যক্রম। ভবনের পিলারগুলোর ইট-সুরকির ঢালাই খসে পড়ে ভেতরের রড দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি পিলার সংস্কারের পরও ফাটল ধরেছে। ভেতরের ফাঁকা কক্ষগুলোর দেয়ালের অনেক স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ছে। ওপরের সিলিং ও টিনের চালাও জরাজীর্ণ।

৩। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার নিজ বাহাদুরপুর ইউনিয়নের সুফিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটির ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। ভবনের তিনটি কক্ষের ছাদের বেশ কিছু জায়গা থেকে পলেস্তারা খসে লোহার রড বেরিয়ে আছে। খুঁটি ও বিমে দেখা দিয়েছে ফাটল। বৃষ্টিতে ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে। এ অবস্থায় ভবনটি যেকোনো সময় ধসে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে লেখাপড়া করছে ১২৫ জন খুদে শিক্ষার্থী।

৪। জামালপুর সদর উপজেলার দড়িহামিদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন পরিত্যক্ত। পাঠদানের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। ওই বিদ্যালয়ের তিন কক্ষবিশিষ্ট ভবনটি জরাজীর্ণ। ভবনের বিমগুলোতে ফাটল। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। দরজা, জানালা ও তিনটি শ্রেণিকক্ষের আসবাব ভাঙাচোরা। পাশের ডাক্তার হানিফ উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু শ্রেণিকক্ষগুলো ছোট হওয়ায় এবং বেঞ্চ বেশি না থাকায় শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে বসে ও দাঁড়িয়ে থেকে ক্লাস করতে হচ্ছে। পাশের একটি  উচ্চবিদ্যালয়ে তিনটি শ্রেণিকক্ষে মাত্র চার ঘণ্টার জন্য পাঠদান করা হচ্ছে। অথচ অন্যান্য বিদ্যালয়ে আট ঘণ্টা পাঠদান করা হয়। এতে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সিরাজদিখান উপজেলার গুয়াখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ভবনে ২০ বছর ধরে ঝুঁকি নিয়ে চলছে পাঠদান। বর্তমানে ভবনটির পিলার ওয়ালে বড় বড় ফাটল ধরে ইট খসে পড়ছে। পিলার ও ছাদের পলেস্তারা খসে রড বেরিয়ে মরিচা ধরে ক্ষয় হয়ে গেছে, ফ্লোরে বড় বড় গর্ত, জানালা-দরজা ভেঙে পড়েছে, বৃষ্টির পানি ছাদ চুইয়ে ক্লাস রুমে পরে। প্রায় ৫০ বছরের পুরনো বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি ২০ বছর আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। বিদ্যালয়টি দুরবস্থার চিত্র বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিকবার প্রকাশিতও হয়েছে।

৫। খুলনার রূপসা উপজেলার আনন্দনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোলা আকাশের নিচে পাঠদান চলছে। স্কুল ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করায় শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়েই খোলা আকাশের নিচে শিক্ষাগ্রহণ করছে। শুধু আনন্দনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ৫৪৫টি স্কুল ভবন পরিত্যক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিদ্যালয় ভবনগুলোকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। যার মধ্যে খুলনায় ১০৫, বাগেরহাট ৮১, যশোর ৪৯, মাগুড়া ৩১, কুষ্টিয়া ৩৫, চুয়াডাঙ্গা ৩২, নড়াইল ৭৮, ঝিনাইদহ ৪৪, সাতক্ষীরা ৭৬ ও মেহেরপুরে ১৪টি বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের ৯০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে স্কুলের পাঠদান চলছে খোলা আকাশের নিচে।

৬। সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগরের চামরদানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে শিশু শিক্ষার্থীরা। গত ৪ বছর ধরে পরিত্যক্ত ভবনের দু’টি রুমে পাঠদান হচ্ছে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের। এই অবস্থায় দুর্ঘটনার আশংকা করছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। পরিত্যক্ত ভবনের তিনটি রুমের মধ্যে দুটি রুমের ছাদের ঢালাই ভেঙে রডের উপর টিন ও বোর্ড দিয়ে কোন রকমে চলছে পাঠদান। ভাঙা ছাদের নিচেই চলছে বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষেরও কার্যক্রম।

৭। বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করার পর শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয় বিদ্যালয়ের পাশের একটি বাড়িতে। দুই বছর পর বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবন ভেঙে শুরু হয় নতুন ভবন নির্মাণের কাজ। কেটে যায় আরও দুই বছর। ভবন নির্মাণ-সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি। চলতি বছরের শুরু থেকে এ বিদ্যালয়ের পাঠদান চলছে গ্রামের একটি মন্দিরে। ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর থানার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নে চার বছর ধরে বিদ্যালয়ের বাইরে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে দক্ষিণউড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।  এদিকে, ভবন নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই ভবনের বিভিন্ন অংশে ত্রুটি দেখা দিয়েছে।

৮। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সাদকপুর সরকারি  প্রাথমিক বিদ্যালয়ের   পরপর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান করা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন শিক্ষকরা। জানা যায়, সাদকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি ভবন ১৯৬৮ সালে করা হয়েছিল। ভবনটি ২০১০ সাল থেকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এর পাশে অন্য ভবনটি ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে নির্মাণ করা হলেও এটিও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মাইজবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটি ১৯৯৯ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৫ বছরের মাথায় এই ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

৯। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ৩০৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক বিদ্যালয়ের ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অথচ এসব ভবন অপসারণ না হওয়ায় বছরের পর বছর ঝুঁকি নিয়েই ক্লাস করতে বাধ্য হচ্ছে প্রায় ১২ হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থী। উপজেলার শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, ৩৬টি বিদ্যালয় ভবন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিদ্যালয়গুলো হলো কৃষ্ণপুর, ঘোড়াশাল (উত্তর), কৃষ্ণপুর (দক্ষিন), রামপুর (দক্ষিণ), কুড়ারপাড়, সোনারামপুর, কাজিয়াতল (উত্তর), কাজিয়াতল (দক্ষিণ), খাপুড়া, হিরাকাশী, রাজাবাড়ী, হায়দরাবাদ, ইসলামপুর, বল্লভদী, সাতমোড়া, জানঘর, বৃষ্ণপুর, পূর্বধৈইর, কামাল্লা (পশ্চিম), সাহেবনগর, বড়ইয়াকুড়ি, নরসিংহপুর, গাংগাটিয়া, রহিমপুর, নবীপুর, রামপুর উত্তর, হারপাকনা, মোকলেশপুর, কামারচর, দেওড়া দক্ষিণ, ফুলঘর, গনিপুর, করিমপুর, পূর্ব জাঙ্গাল, পাহাড়পুর উত্তর ও জাঙ্গাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

১০। পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নের অধ্যক্ষ মাহাতাব বিশ্বাসের বাড়ী সংলগ্ন ২২ নং টাটিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণী কক্ষের অভাবে পুরাতন জরাজীর্ন টিনের ঘরের বারান্দায় দীর্ঘদিন যাবত ক্লাসের পাঠদান চলছে। দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য ২টি মাত্র শ্রেণী কক্ষ রয়েছে।

আমরা জানি, শিক্ষা ও সৌন্দর্য উভয় শব্দই বোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সুশিক্ষার প্রসার মানুষের সৌন্দর্য বোধকেও জাগ্রত করে, তবে এই সৌন্দর্য বোধের অর্থ বাহ্যিক দিক থেকে সৌন্দর্য বিচার নয়; বরং চিত্তের পরিশুদ্ধি, মানবিকতা ও প্রকৃতির সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করা বোঝায়। যেকোনো স্থানে পাঠাগার স্থাপন বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে এর চর্চা হতে পারে তবে সৌন্দর্য চর্চার জন্য ছাত্রী হোস্টেলে বিউটি পার্লার ও লন্ড্রি স্থাপন বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দেওয়া সত্যিই কিছুটা বেমানান। অথচ গত বছর চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে সম্মানিত শিক্ষা সচিব এন আই খান এমনটাই বলেছিলেন।

আমরা সবাই জানি, আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষার হাল এতই নাজুক যে গ্রামাঞ্চলের অনেক শিশুই উপযুক্ত পোশাক ও বই খাতার অভাবে স্কুলে যেতে পারে না। তাছাড়া এখন পর্যন্ত দেশে শতভাগ শিক্ষার হারও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষার পর ঝরে পড়ে, আর তার থেকেও বেশি শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার করতে ব্যর্থ হয়। যাদের কাছে শিক্ষালাভ করাটাই দুরূহ, তাদের জন্য মূল্যবান ট্যাব দিয়ে লেখাপড়া করা আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। শিক্ষাসচিব বলেছেন, ‘আমরা মাল্টিমিডিয়া বই তৈরি করেছি যেন শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনে শুয়েবসে পড়তে পারে। সব শিক্ষার্থীর হাতে ট্যাবলেট পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি।’ খুব ভালো। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি দারিদ্র্যপীড়িত উন্নয়নশীল দেশে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো সবার জন্য পরিপূর্ণ করা আজও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এখনো প্রতিবছর চিকিৎসার অভাবে মারা যায় হাজার হাজার প্রসূতি ও শিশু। অগণিত শিশু অধিকারবঞ্চিত হয়ে, শিক্ষার আলো থেকে দূরে সরে গিয়ে পথে পথে ঘোরে, নির্যাতনের শিকার হয় হাজারো অসহায় নারী। চাকরির অভাবে অসংখ্য বেকার যুবক অপরাধের পথ বেছে নেয়। মানসম্মত শিক্ষার অভাবে সুশিক্ষার পথ থেকে সরে যায় লক্ষাধিক শিক্ষার্থী আবার দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার আলো থেকেই সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয় অনেক শিশু। আর এজন্য ভালো মানের বিদ্যালয় স্থাপন করার প্রতি যেমন সচেতন হওয়া উচিত, তেমনি যত্নবান হওয়া উচিত অতি প্রয়োজনীয় শিক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি হ্রাস করে তার সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতি। তাহলেই জাতি যেমন শিক্ষিত হবে, তেমনি জাগ্রত হবে তাদের সৌন্দর্য বোধ। এর জন্য কোনো ট্যাবলেট বা বিউটি পার্লারের প্রয়োজন পড়বে না।

কিছু দিন আগে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে এস্কেলেটর (চলন্ত সিঁড়ি) স্থাপনের উদ্যোগ নিতে  চেয়েছিল সরকার। এ প্রকল্পের আওতায় এক হাজার একশ’ ষোল কোটি টাকার বিশাল ব্যয়ে  দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৬৩টি স্কুলে এই এস্কেলেটর স্থাপন করার প্রস্তাব দিয়েছিল মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর। প্রতি জোড়া এস্কেলেটরের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। আর দেশের মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতরের এমন প্রস্তাবে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছিল সচেতন মহলে। দেশের শিক্ষার মান, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা ও সক্ষমতা নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন রয়েছে, তখন অবকাঠামো উন্নয়নের নামে ‘এস্কেলেটর’ নামক বিলাসী প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল খোদ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনও। এ ছাড়া এ ধরনের অদ্ভুত প্রস্তাবকে বিশাল আকারের লুটপাটের পরিকল্পনা হিসেবে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যেখানে দেশের বেশিরভাগ সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের অবকাঠামো খুবই দুর্বল, রয়েছে ভবন ও ক্লাসরুমের সংকট, বৈদ্যুতিক পাখা ও বাতির সংকট, টয়লেটগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী, লাইব্রেরি-ল্যাব ও কম্পিউটার কক্ষ নেই বললেই চলে; সেখানে এস্কেলেটরের মতো ব্যয়বহুল যান্ত্রিক সিঁড়ি স্থাপন শুধু গরিবের ঘোড়া রোগই নয়, বিপজ্জনকও বটে। এ ব্যাপারে হেনরিক পেস্তলোজীর একটি কথা স্মরণ করছি। তিনি বলেছেন,  শিক্ষা হচ্ছে মানুষের শক্তি ও সামর্থ্যের স্বাভাবিক, প্রগতিশীল ও নিয়মানুগ বর্ধন ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশ।

আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজে মৌলিক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে শিক্ষাই মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী (উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তর) বিগত ৪৫ বছরে সামগ্রিক শিক্ষার হার ১৬.৮% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৪ সালে তা ৬৩%এ উন্নীত হয়েছে। ২০১৩ সালে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৭৮.৮৬%, যা পুরুষ শিক্ষার হার (৭৮.৬৭%) থেকেও বেশী। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ সাফল্য ইতিবাচক হলেও শিক্ষার গুণগত মান অর্জনে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে এবং পরিতাপের বিষয় হলো শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে তেমন কোনো বলিষ্ঠ পদক্ষেপ অদ্যবধি নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের শিক্ষা বাজেটের গতি প্রকৃতি লক্ষ্য করলেই তা সকলের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। বিগত সাত বছরের শিক্ষা বাজেটে গড় বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ১৩.৭%, যা ২০১০ সালে ছিল সর্বোচ্চ (১৬.৩%)। অন্যদিকে গত দুই দশকে জিডিপি’র মাত্র ২% শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে। অথচ ইউনেস্ক’র পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের নূন্যতম ২০ শতাংশ হওয়া ব্যঞ্চনীয় এবং শিক্ষা খাতে ব্যয় মোট জিডিপি’র নূন্যতম ৬ শতাংশ হওয়া উচিত।

তবে একথা সত্য যে, মানব উন্নয়নের প্রায় সকল সূচকেই বাংলাদেশের অগ্রগতি বৈশ্বিক পর্যায়ে সকলের দৃষ্টি কেড়েছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী,  অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রসহ প্রধান ১২টি উন্নয়ন সূচকের মধ্যে ১০টিতেই বাংলাদেশ আজ তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোসহ দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো রাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। সহশ্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে শিক্ষাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোতে অভুতপূর্ব সাফল্য বাংলাদেশকে আজ দারিদ্র্য বিমোচন, বৈষম্য নিরসন ও অন্তভূক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে অপরাপর দেশেরগুলোর সামনে। শিক্ষাবান্ধব এ সরকারের আমলে শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক উন্নতি হয়েছে, অনেক পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়ন জনগণের কল্যাণে লাগাতে হলে কোয়ালিটি শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু যারা সেই নির্দেশনা পালন করবেন, আদেশ বাস্তবায়িত করবেন তারা সে কাজটি সঠিকভাবে করতে পারেননি; ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থতা এসেছে। শিক্ষার বিভিন্ন খাত আছে, আর্মি শিক্ষাখাত, কারিগরি শিক্ষাখাত, স্বাস্থ্য শিক্ষাখাত, মাদ্রাসা শিক্ষা, শিশুশিক্ষা, নারীশিক্ষা, উচ্চশিক্ষা সব শিক্ষার বিষয়ই একই জায়গায় এসে জড় হয়। এরমধ্যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সবার জন্য শিক্ষা, এ বিষয়টির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মক্ষম যুবসমাজের অনেকেই কর্মহীন, এদের জন্য কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে দেশকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়া সম্ভব এটি অনেকেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ মানবিক গুণাবলি অর্জন করতে পারে, শান্তি-সৌহার্দ্য-ভালোবাসার দেশ গড়ে তোলা সম্ভব। মানুষ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে, দয়াশীল হবে, সুখ-দুঃখ সবার সাথে ভাগ করে নেবে; তাহলে সন্ত্রাস-হানাহানি-জাতিবিদ্বেষের বিষবাষ্প থেকে মানুষ রক্ষা পাবে। আর শিক্ষার মান বাড়াতে হলে শিক্ষকদের মান বাড়াতে হবে সবার আগে। সম্মানিত শিক্ষকদের যেন আর কোথাও, কোনো অবস্থাতেই সম্মানহানির মতো কিছু না ঘটে এ ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। ভালো থাকুন শিক্ষক, ভালো থাকুক শিক্ষা।

লেখক- তরুণ কবি ও কলামিস্ট।

একই ধরনের আরও সংবাদ