অধিকার ও সত্যের পক্ষে

বন্ধ করুন আপনাদের টিয়ারসেল

 শর্মি ভৌমিক

আজকের ছাত্ররাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কিন্তু, কি আশ্চর্যজনকভাবে এই ছাত্রদের উপর প্রশাসন টিয়ারসেল ছুড়ে মারছে! তাদেরকে অত্যাচার করছে!
আজ যারা প্রশাসনের দায়িত্বে আছেন তারাও কি একসময় ছাত্র ছিলেন না? এই ছাত্ররাতো আমাদেরই সন্তান! তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতে এসেছে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে। এমন লক্ষ লক্ষ ছাত্র/ছাত্রী রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা পড়ালেখা শিখে দিনশেষে একটি কাজ বা চাকরিই প্রত্যাশা করে থাকে দেশের কাছে। আমাদের দেশের সব পরিবারইতো স্বচ্ছল নয়! সেইসব অসচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েরা কত কষ্ট করে পড়ালেখার বিষয়টি চালিয়ে থাকে তা স্বচ্ছল অবস্থায় বসে থেকে আন্দাজ করতে সমর্থ হবেন না কেউ।

এমন অনেক পরিবারের ছেলেমেয়েরা আছে যাদের ফরমফিলাপের অর্থটি যোগার করতে গিয়ে পরিবারকে তার একমাত্র সম্বল বাড়ীটিকেও বন্ধক রাখতে হয়। কেউবা আবার জমি বিক্রি করে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ যোগাড় করে থাকেন। সেই পরিবারের একটিই আশা সন্তান লেখাপড়া শিখে একটি ভালো চাকরি পাবে, চাকরি পেয়ে আবার সব ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু, তা কি পারে সব শিক্ষার্থীরা?

সমস্ত সহায় সম্বল নিলাম করে দিয়ে সন্তান যখন কিছুই দিতে পারে না তার পরিবার তথা বাবা-মাকে তখন সেই সন্তানটির নিকট পুরো পৃথিবীকেই অর্থহীন মনে হয়, বেঁচে থাকাকে মনে হয় অপ্রয়োজনীয়।

আমি এমন অনেক শিক্ষার্থীকে জানি যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে বাবা- মাকে নিঃস্ব করেছে। মেধা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকলেও পড়ালেখার খরচ চালাতে গিয়ে সেই শিক্ষার্থীরা কোন বেলা না খেয়েও দিন কাটিয়েছে। কেউ কেউ সকালে খেতে পারলেও বিকালে কি খাবে সেই ভাবনায় দুশ্চিন্তায় ডুবে থেকেছে। এতোসব প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে একজন শিক্ষার্থী যখন তার পড়ালেখা শেষ করে একটি চাকরির আশা করে এবং চাকরিটা পেতে ব্যর্থ হয় তখন দেশের বিবেকেরও কিছু অবশ্য করণীয় থাকতে হয়।

উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত বলে কথা নয়; সকল শিক্ষিতের জন্যই মেধা যাচাইয়ের দ্বার উন্মুক্ত থাকা উচিত। মেধাবীরা হতে পারে দেশের কর্ণধার। এই মেধা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যদি কোন আলাদা সুবিধাভোগের ব্যাপার থাকে তাহলে প্রকৃত মেধাবীদেরকেতো বঞ্চিতই হতে হয়!

কখনও কখনও এমনও দেখা যায়, কর্তৃপক্ষরা দুর্নীতির টাকা উপার্জন করতে গিয়ে প্রকৃত মেধাবীদেরকে বঞ্চিত করে থাকেন। ঘুষের টাকা পেয়ে অযোগ্যা লোককে যোগ্যতার আসনে অধিষ্ঠিত করে থাকেন, যা একেবারেই গর্হিত কাজ। কখনও আবার এমনটাও দেখা যায় যে, স্বজনপ্রীতি করতে গিয়ে প্রকৃত মেধাবীকে ঠকানো হয়। আজকাল একটি কথা বেশ প্রচলিত সমাজে ‘ মামা, চাচা ছাড়া কারো চাকরি হয় না’। কথাটির সত্যতা সত্যিই পীড়াদায়ক। একটি দেশের সঠিক উন্নয়নে এটি কতোবড় বাধা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এইসব সংকীর্ণ মানসিকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা মেধার শত্রুস্বরূপ। এগুলো নিপাত না গেলে দেশের সত্যিকার উন্নয়ন অসম্ভব।

বাংলাদেশে একটি সরকারী চাকরির জন্য কি কঠিন প্রতিযোগিতা করতে হয় একজন পরীক্ষার্থীকে, তা ভোক্তভূগি মাত্রই জ্ঞাত। আর সেখানে যদি এতো এতো কোটাপ্রথা বিদ্যমান থাকে সেখানে প্রকৃত মেধাবীদের স্থান কোথায়? মেধাবীদের স্থান আগে থাকা বাঞ্ছনীয়। কারণ, মেধাবীরাই সৃষ্টি করবে আরো অনেক মেধাবীর। আমাদের মনে রাখতে হবে আমড়া গাছে আমড়াই হয়, আম নয়।

শিক্ষার্থীদের চাকরির ব্যাপারে অন্যকোন প্রভাব মোটেই কাম্য নয়। কারো বিশেষ অবদানের ক্ষেত্রে তাকে যোগ্য সম্মান দেয়াই উচিত, তাই বলে মেধার জায়গাটিকে বিতর্কিত করে কেন? মেধার মূল্যায়ন করা অতীব জরুরী। এ ঘুণে ধরা সমাজকে বাঁচাতে হলে প্রকৃত মেধার মূল্য দিন, তা না হলে অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে মেধার এই সূতিকাগার।

শুধু সরকারি চাকরিতেই নয়, সরকারি, বেসরকারি সবজায়গাতেই অবাধে চলছে স্বজনপ্রীতি ও ঘুষের তান্ডব। চাকরির বাজার গিয়ে পৌঁছেছে সাধারণের নাগালের বাইরে। এভাবে কর্তৃপক্ষীয়রা যদি স্বজনপ্রীতি করে চলেন তাহলে যাদের মামা, চাচা নেই তারা যাবে কোথায়? তারা কিভাবে বেঁচে থাকবে? কিভাবে পরিবারের সহায়ক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরবে বাবা-মা ও সমাজের কাছে?

আজ যারা কোন প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ বা কর্ণধার তিনিও কি একসময় শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থী ছিলেন না? কেন তারা নিজেদের অতীত ভুলে যাবেন? কেন মেধার যথাযথ মূল্যায়ন করে বাংলাদেশকে আরোবেশি সমৃদ্ধশালী হিসেবে বিশ্বে জায়গা করে নেবার সুযোগ করে দেবেন না? এখনই সময় ক্ষুদ্র স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে বৃহৎ স্বার্থে নিজেকে কাজে লাগাবার। শুধু প্রয়োজন বিবেককে জাগ্রত করা, সক্রিয় করা।

আপনি কি জানেন, একজন চাকরিপ্রত্যাশি কতোটা আশায় বুক বেঁধে তার শিক্ষার্থী জীবন পার করে থাকে? আর কতোটা হতাশাক্লিষ্ট জীবন কাটায় যখন হাজার চেষ্টা করেও একটি চাকরি না পায়? যোগ্যতা থাকার পরেও তারা যখন বঞ্চিত হয় তখন তারা কেবলই হতাশার অনলে নিমজ্জিত হয়। জীবন তখন মিথ্যে মনে হয় তাদের কাছে।

বাংলাদেশে এতো এতো কর্ম সংস্থান তবুও হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার। ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। কিন্তু, এই অক্সফোর্ডের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও চাকরি না পেয়ে বেকার বসে আছে অগণিত শিক্ষিতেরা। কেউ কেউ উপায়ন্তর না পেয়ে চাকরির খোঁজ করছে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও, যেখানে স্কুলপাশ শিক্ষকও তার সিনিয়রের চেয়ারে বিদ্যমান। ভাগ্য প্রসন্ন হলে সেখানে কারো কারো চাকরি হয়ে যায়; তবে, সেখানেও দুর্নীতি নেই তা কিন্তু নয়!

আর, যারা সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেও বেকার জীবন কাটায় তারা নিজেদেরকে ভাগ্যবিড়ম্বিত ভেবে কষ্টের সাগরে ছেড়ে দেয় নির্দ্বিধায়। ক্রমাগত হয়ে ওঠে পরিবার ও সমাজের বোঝাস্বরূপ। কেউ কেউ হতাশায় দিন পার করতে করতে কখনওবা জড়িয়ে পড়ে নানারূপ অপরাধমূলক জটিলতায়। তখন তারা মেধা খাটায় সেইসব অপরাধগত কর্মপন্থায় । এমনকি তারাই হয়ে ওঠে দেশের জন্য ভয়ানক আশংকার আধার।

আসুন না, একবার তাদের কথা ভাবি আমরা, নিঃস্বার্থ মন নিয়ে ভেবে দেখি কিছু করা যায় কিনা ওদের জন্য! ওরাতো আমাদেরই সন্তান কিংবা ভাই-বোন, তাই না? ওদেরকে এভাবে মারবেন না, আঘাত করবেন না আপনারা। মনের দৃষ্টি মেলে দেখুন ওরা কতোটা ক্ষতবিক্ষত, নিরুপায় !

 

লেখকঃ শর্মি ভৌমিক

একই ধরনের আরও সংবাদ