অধিকার ও সত্যের পথে

এমসিকিউ প্রশ্নের ভালো মন্দ দিক

 অলোক আচার্য্য

এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় কতৃপক্ষের সব ধরনের পদক্ষেপ মূলত ব্যর্থ হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে প্রশ্ন ফাঁসকারীরা সব ধরনের পদক্ষেপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক প্রশ্ন পূর্ব ঘোষণা দিয়ে ফাঁস করেছে। অতীতেও প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে তবে এবছরের মত এত নগ্ন এবং দম্ভ নিয়ে কোন চক্র প্রশ্ন ফাঁস করেনি। আবার এত ব্যর্থতাও চোখে পড়েনি। মুড়ি মুড়কির মত প্রশ্ন বিক্রি হয়েছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সেসব প্রশ্ন কিনতে রীতিমত হুড়মুড়িয়ে পরেছে অভিভাবকরা। এবং এই প্রবণতা খুব স্বাভাবিক। এই ঘটনার পর এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে কতৃপক্ষের যে চোখে ঘুম ছিল না তা বলাই যায়। কেবল কতৃপক্ষের নয় বরং পরীক্ষার্থী এবং তার অভিভাবকদেরও চোখে ঘুম ছিল না। এরকম একটা অনিশ্চয়তায় ঘুম হওয়ারও কথা নয়। এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর সেই শংকা কাটতে শুরু করেছে। প্রশ্ন ফাঁস হয়নি এবং অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে প্রশ্নফাঁসের হাত থেকে জাতি মুক্তি পেতে চলেছে।
প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানোর স্থায়ী পরামর্শ হিসেবে পরীক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন ঘটানোর চিন্তাভাবনা চলছে। পরিবর্তন জরুরী কিন্তু সেই পরিবর্তন কতটা মঙ্গলজনক তা বোঝার জন্য আরও একটু সময় দরকার। মূলত আগামীতে দুইটি বিষয়ে পরিবর্তন করার চিন্তাভাবনা চলছে। প্রথমত. ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র প্রনয়ণ এবং দ্বিতীয়ত প্রশ্নপত্র থেকে এমসিকিউ অংশ বাদ দিয়ে পুরো অংশই সৃজনশীল করা। ইতিমধ্যেই প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় বহুনির্বাচনী অংশ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তন ছাত্রছাত্রীদের ভালো এবং শিক্ষাব্যবস্থার ভালোর জন্য করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা কতটুকু ভালো করবে তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে যেকোন পদ্ধতি পরিবর্তনের পেছনে যেমন কোন ইতিবাচক কারণ থাকে তেমনি অনেকসময় তা হিতে বিপরীত হয়ে দাড়ায়।
মাধ্যমিক পর্যায়ে এমনকি প্রাথমিক পর্যায়েও এমসিকিউ পদ্ধতির প্রশ্ন বদলে লিখিত প্রশ্ন করার চিন্তাভাবনা করছে। এটি করার আগে অবশ্যই চিন্তা করতে হবে যাদের জন্য এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে তারা এটা নিয়ে কোন সমস্যার মুখোমুকি হবে কি না তা গভীরভাবে ভাবতে হবে। কারণ কোন সমস্যা সমাধানে পদ্ধতির প্রয়োগ করা হলে তার সুবিধা অসুবিধা উভয় দিক বিবেচনা করতে হবে। এ কথা সত্যি যে কোন পদ্ধতির পরিবর্তন করা হলে তা কিছুটা সমস্যার জন্ম দিতে পারে এবং এটুকু সবাইকে স্বীকার করতে হয়। প্রশ্ন ফাঁস রোধ করার জন্য এমসিকিউ পদ্ধতি তুলে দেওয়ার চিন্তায় যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। কারণ চলতি বছর এই এমসিকিউ অংশই বেশি ফাঁস হয়েছে। এবং তুলনামুলকভাবে এই অংশটি থেকে দ্রæত সময়ে উত্তর করা সম্ভব। কিন্তু সৃজনশীল অংশ থেকে এত দ্রæত উত্তর সমাধান করা সম্ভব না। ফলে ফাঁস হলেও তার সমাধান বের করে পরীক্ষায় লেখা অনেকটাই দুরহ হয়ে যাবে। তাই ফাঁস হওয়ার ঘটনাও কমে আসার কথা। কিন্তু এটা একটা সম্ভাবনামাত্র। এর প্রয়োগের পরই দেখা যাবে এই পদ্ধতি কতটুকু সফল হয়।
এমসিকিউ অংশের একটা সুবিধা আছে। তা হলো অভীক্ষা মূল্যায়নে পরীক্ষকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গী প্রয়োগের ক্ষমতা। উত্তরপত্র মূল্যায়নে যতই নির্দিষ্ট মানদন্ড থাকুক না কেন প্রকৃতপক্ষে উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় অনেকেই এই মানদন্ড অনুসরণ করেন না। চলচি বছর পিইসি পরীক্ষায় উত্তরপত্র পুর্নমূল্যায়নে প্রায় ৮০০০০ ছাত্রছাত্রী আবেদন করেছিল। এই বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী মনে করেছে যে তাদের উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয়নি। এই সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। এমসিকিউ প্রশ্নে আরও একটা সুবিধা ছিল। বর্তমানে সৃজনশীল পদ্ধতিতে অনেক দুর্বল ছাত্রছাত্রী প্রশ্ন লিখতে সমস্যায় ভোগে। এমনকি অনেক শিক্ষকও সৃজনশীল প্রশ্ন প্রনয়ণ সঠিকভাবে করতে পারে না। কিন্তু এমসিকিউ প্রশ্নে অনেক দুর্বল ছাত্রছাত্রীই এই এমসিকিউ অংশে ভালো উত্তর করতে পারতো। এখন বছরের মাঝামাঝি সময় চলছে। প্রাথমিক সমাপণী পরীক্ষা নভেম্বরে। সেক্ষেত্রে হাতে মাত্র ছ’মাস রয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুতিও অনেকটা এগিয়ে গেছে। বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। এ সময় তাদের জানাতে হচ্ছে যে তাদের বহুনির্বাচনী প্রশ্ন আসবে না। এটা নিশ্চিত প্রথমে এটা শুনে তারা একটু চমকাবে। কারণ একটাই বহুনির্বাচনী প্রশ্ন থেকে সবল বা দুর্বল সব শ্রেণির ছাত্রছাত্রীর নম্বর বেশি তোলার সুযোগ থাকে। তাই হঠাৎ এই পরিবর্তন এবং পরবর্তী মানবন্টন সমাপণী পরীক্ষার্থীদের জন্য কতটা ফলপ্রসু হবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখে যায়।

 লেখক-সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

একই ধরনের আরও সংবাদ