অধিকার ও সত্যের পক্ষে

একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি উপাখ্যান

 হাসান হামিদ

‘DECCA BREAKS WITH PAKISTAN’ শিরোনামে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ একটি খবর প্রকাশ করে অস্ট্রেলিয়ার দি এজ পত্রিকা। ওই বছর ২৮ মার্চ নিউ ইয়র্ক টাইমস তিনটি সংবাদ প্রকাশ করে। সংবাদগুলোর শিরোনাম ছিল- ‘Army expels 35 foreign newsmen from Pakistan’, ‘Artillary used’ ও ‘Toll called high’. কী হয়েছিল সেদিন?

সেদিন ছিল শুক্রবার। সারাদিন থমথমে অজানা আশঙ্কায় কেটেছে বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) সবার। তারপর ভয়াল রাত নামলো। বাঙালি নিধনের সেই রাত অন্য সব ইতিহাস পেছনে ফেলে বর্বরতায় শীর্ষে স্থান করে নিল। বিশ্বব্যাপী উনিশ শতক থেকে নৃশংস গণহত্যার মধ্যে রয়েছে- আর্মেনীয় গণহত্যা, হলোকাস্ট ও ন্যানকিং গণহত্যা, কম্বোডীয় গণহত্যা, একাত্তরের ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের নামে বাঙালি গণহত্যা, বসনীয় গণহত্যা, বেলজিয়ামের রাজা লিওপোল্ডের গণহত্যা এবং সর্বশেষ মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা। তবে এর মধ্যে বাংলাদেশে একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যা জঘন্যতম। ওইদিন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এক রাতেই প্রায় ৫০ হাজার বাঙালিকে গুলি করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। কী ভয়াবহ!

প্রায় ৪৭ বছর আগে পাকিস্তানের চালানো সেই গণহত্যার খবর ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থেকে গেছে আন্তর্জাতিক গণমাধমে। দি টেলিগ্রাফ, দি টাইমস, দি সানডে টাইমস, নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ আরো কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সংবাদ সংস্থা বাংলাদেশে পাকিস্তানের গণহত্যার খবর প্রকাশ করে বিশ্ববাসীকে পাকিস্তানের বর্বরতা সম্পর্কে জানায়। কতটা বর্বর ছিল সেই রাতের হত্যাযজ্ঞ, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সেই সময়ে প্রকাশিত খবরে তার বিবরণ পাওয়া যায়। ২৫ মার্চে ঢাকায় অবস্থানকারী বিদেশি সাংবাদিকদের বাইরে বের হতে নিষেধ করে পাকিস্তান সরকার। তখন হোটেল কন্টিনেন্টালে আরো কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে ছিলেন দি টেলিগ্রাফের সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। নিষেধ উপেক্ষা করে হোটেলের ছাদে উঠে পেছনের দেয়াল টপকে বেরিয়ে পড়েন তিনি।

রাত ১১টা নাগাদ রাস্তায় নামে অস্ত্রে সুসজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনী। ট্যাংক ও কামানের গর্জনে প্রকম্পিত হতে থাকে ঢাকা। এ পরিস্থিতিতে বিদেশি সাংবাদিকরা বুঝতে পেরেছিলেন- ভয়াবহ কিছু ঘটতে চলেছে। তাদের আশঙ্কা সত্যি হলো। সেই কালরাতে রক্তে রঞ্জিত হলো ঢাকা। আহত-মৃত্যুমুখী মানুষের আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছিল ঢাকার আকাশ। সেই কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রেপ্তার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সারা রাত পাকিস্তানের নারকীয় তাণ্ডবে ঝরে যায় প্রায় ৭ হাজার প্রাণ। পুড়িয়ে দেওয়া হয় অসংখ্য ঘরবাড়ি। ২৬ মার্চ সকালে এক মৃত্যুপুরী ঢাকা দেখা যায়। সেই দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং

ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা নিয়ে ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ সাইমন ড্রিংয়ের খবর প্রকাশিত হয় দি টেলিগ্রাফ পত্রিকায়। খবরের শিরোনাম ছিল ‘TANKS CRUSH REVOLT IN PAKISTAN : 7,000 slaughtered, homes burned’। মূলত এই প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে পাকিস্তানের চালানো গণহত্যার খবর প্রথম জানতে পারে বিশ্ববাসী। সাইমন ড্রিং তার প্রতিবেদন শুরু করেন এভাবে: ‘ঢাকা আজ এক বিধ্বস্ত ও ভয়ার্ত শহরের নাম। পাকিস্তানি বাহিনীর ঠান্ডা মাথায় ২৪ ঘণ্টার নির্মম গুলিবর্ষণে সাত হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে বিশাল এলাকা এবং স্বাধীনতার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের সংগ্রামের নির্মম পরিণতি ঘটেছে।’

সেদিন দি টাইমসের প্রতিবেদনের শুরুতে লেখা হয়, ‘দুই দিন, দুই রাত ধরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোলাবর্ষণে শুধু ঢাকা শহরেই মারা গেছে ৭ হাজারের বেশি মানুষ। আমেরিকার সরবরাহ করা এম-২৪ ট্যাংক, আর্টিলারি ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই বৃহস্পতিবার রাতে হামলা চালায়, শহরের বিশাল অংশ ধ্বংস করে দেয়।’ ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল দি টাইমস (লন্ডন) পত্রিকায় ২৫ মার্চের গণহত্যা নিয়ে সাংবাদিক লুইস হেরেনের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর শুরুতে বলা হয়- ‘পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে। এর উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে শেষ করা, যা ভালোভাবেই সম্ভব হাসিল হয়েছিল।’ ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল সিঙ্গাপুরের দি নিউ নেশন পত্রিকায় গণহত্যা নিয়ে একটি সম্পাদকীয় ছাপা হয়। এর শিরোনাম ছিল, ‘পূর্ব পাকিস্তানে চলমান এই হত্যাযজ্ঞ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে’।

জাতিসংঘের কনভেনশন অন দ্য প্রিভেনশন অ্যান্ড পানিশমেন্ট অব দ্য ক্রাইম অব জেনোসাইডে গণহত্যার পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা রয়েছে। প্রথমত, কোনো গোষ্ঠীর মানুষকে হত্যা; দ্বিতীয়ত, তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতিসাধন; তৃতীয়ত, জীবনমানের প্রতি আঘাত ও শারীরিক ক্ষতিসাধন; চতুর্থত, জন্মদান বাধাগ্রস্ত করা এবং পঞ্চমত, শিশুদের অন্য গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া। এই পাঁচটি উপাদানের কোনো একটি থাকলেই কোনো ঘটনা গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত হবে। একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড বড় রকমের গণহত্যা। এই দিনকে জাতীয়ভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ পালন করা হলেও এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের উদ্যোগ থমকে আছে গত বছর উদ্যোগের সুযোগে কাজ না করায়।

আমরা জানি, গত বছর সংসদে গণহত্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের প্রস্তাব জাতিসংঘে উত্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারকরা। তবে তাদের সে ঘোষণা এখনও আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে এবারও দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয়ভাবে পালিত হলো গণহত্যা দিবস। গত বছরের ১১ মার্চ সংসদে সর্বসম্মতভাবে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা করা হয়। সংসদে উত্থাপিত প্রস্তাবে সেদিন বলা হয়, ‘সংসদের অভিমত এই যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যাকে স্মরণ করে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করা হোক এবং আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসের স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হোক।’ আবার, জাতিসংঘের এক ঘোষণা অনুসারে ২০১৫ সাল থেকে ৯ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালিত হয়ে আসছে। অথচ যে দিন আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসটি পালিত হয়, তার পেছনের কোনো ইতিহাস নেই।

এ জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এটা পরিবর্তন করে ২৫ মার্চে করার জন্য আমাদের যেসব যুক্তি ও তথ্য-উপাত্ত রয়েছে, সেগুলো জাতিসংঘে তুলে ধরা দরকার ছিল। কেননা ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশ ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালনের জন্য সর্বসম্মত ভোট দিয়েছিল, সেখানে বাংলাদেশও ছিল। এখন সেই বাংলাদেশ যদি তিন বছর পর ৯ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালনের জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব করে, তা কতটুকু আমলে নেওয়া হবে!
সংবাদ মাধ্যমের বরাত দিয়ে আমরা জেনেছি, গত বছর সংসদে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস পালনের পাশাপাশি জাতিসংঘে এ বিষয়ে প্রস্তাব উত্থাপনের সর্বসন্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

দুঃখের বিষয়, গত এক বছরে দৃশ্যত কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একটি দিবস (৯ ডিসেম্বর) ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। এ জন্য বাংলাদেশ সরকারের উচিত ‘একাত্তরে বাংলাদেশে ২৫ মার্চের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি’- এই এজেন্ডা নিয়ে জাতিসংঘে প্রস্তাব উত্থাপন করা এবং সেটি দ্রুত করতে হবে। নয়তো বাংলাদেশ এ বিষয়ে কূটনীতিতে আরও পিছিয়ে যাবে। তাছাড়া জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত প্রতিটি দেশকে বাংলাদেশের পক্ষে ভোটের জন্য প্রস্তাব দিতে হবে। এটি জোরালো হলে যুক্তিসঙ্গত দাবি আদায় করা যাবে। কারণ রুয়ান্ডা, আর্মেনিয়া, যুগোস্লাভিয়াসহ বিশ্বে যেসব দেশে গণহত্যা হয়েছে, তার মধ্যে একাত্তরে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা জঘন্যতম। ২৫ মার্চ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে অসংখ্য ঘুমন্ত বাঙালিকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গণহত্যাসহ ৩০ লাখ শহীদের তথ্য-উপাত্ত সঠিকভাবে জাতিসংঘে উপস্থাপন করা হলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করা অসম্ভব কিছু নয়।

সেই ১৯৭১ সালেই ২৫ মার্চের গণহত্যার খবর গুরুত্বসহকারে উঠে আসে অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের খবরে। গণহত্যা নিয়ে সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে তাকে পাকিস্তান ছাড়তে হয়। এপ্রিল মাসে পাকিস্তান থেকে আটজন সাংবাদিককে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল তারা যেন পাকিস্তানের পক্ষে যায় এমন সংবাদ তৈরি করে। এ দলে ছিলেন পাকিস্তানের মর্নিং নিউজ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক মাসকারেনহাস। পাকিস্তানে ফিরে ১৮ মে তিনি লন্ডনে চলে যান। তিনি সান ডে টাইমসের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনা তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশের আগ্রহ প্রকাশ করলে পত্রিকাটি তা গ্রহণ করে। ২৫ মার্চের গণহত্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গুরুত্বসহকারে সংবাদ প্রকাশ করে। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সাহায্য করলেও দেশটির সংবাদপত্রে বর্বরতার এই চিত্র ফুটে ওঠে। তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকায় সেই ভয়াবহ গণহত্যার ইতিহাস বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ম্লান হয়ে পড়েছে। ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃত পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। আর সেটি হওয়া এখন সময়ের দাবি।
লেখক- গবেষক ও কবি

একই ধরনের আরও সংবাদ