অধিকার ও সত্যের পক্ষে

শিশুদের ব্যাগের ভার কমাতে হবে

 অলোক আচার্য্য

শিশু শিক্ষার্থীদের ভারী ভারী ব্যাগ বহন করা স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু ক্ষতিকর হওয়া সত্তেও বহু বছর আগে থেকে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ভারী ব্যাগ বহন করে চলেছে। আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু অনেক নির্দেশনার মতই এই নির্দেশনাও অনেকেই মানছে না। আবার না মানার জন্য যে কোন শাস্তি সেটাও চোখে পড়েনি। মূলত বাণিজ্যিক ভাবনা থেকেই শিশুদের কাধে অতিরিক্ত বোঝা চাপে। আমরা যখন লেখাপড়া করেছি তখন আজকের ছেলেমেয়েদের মত সবার কাছে স্কুল ব্যাগ ছিল না। কারণ স্কুল ব্যাগ কেনার মতো সামর্থ্য সবার ছিল না। সামর্থ্যবান লোকেদের ছেলেমেয়েরাই স্কুলে ব্যাগ আনতো। আমরা হাতে করে ক’খানা বই বগলে চাপিয়ে স্কুলে যেতাম। প্রয়োজনে আবার টিফিন পিরিয়ডে বই বদলে আনতাম। এইভাবে চলতো আমাদের বই নেওয়া। অনেককে দেখেছি পলিথিনে ভরে বই নিয়ে যেতে। যাদের ব্যাগ আছে আমরা কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে হা পিত্যেশ করতাম। এক সময় ফ্যাশন মনে হলেও এখন স্কুল ব্যাগ শিক্ষার্থীদের একটি প্রয়োজনীয় উপকরণ। কারণ ব্যাগের ভেতর বইগুলো অনেক বেশি নিরাপদ থাকে। একসাথে সব পিরিয়ডের বই নেওয়া যায়। তাছাড়া প্রয়োজনীয় খাতা কলম, জ্যামিতি বক্স এসব নেওয়া যায়। হাতে বই নিলে ধীরে ধীরে বই নষ্ট হয়ে যায়। আবার অনেক সময় হারিয়েও যেতে পারে। আজকাল কম দামে সুন্দর সুন্দর ব্যাগ পাওয়াও যায়। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা ক্রমেই যে পরিমাণ বই নিয়ে স্কুলে যাচ্ছিল তা রীতিমত তার স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ছিল। দীর্ঘ সময় এত ওজন বহন করতে করতে তার ক্লান্তি ও বিরক্তির উদ্রেগ করত। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মতামত এসেছে। তার থেকেও বড় হলো বইয়ের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। সবগুলো বই খাতা আবার সাথে অনেকে গাইড বই ঢুকিয়ে নেয়। ফলে বিশাল একটা ওজন দাড়ায়। আমার এক পরিচিত অভিভাবক তো বলল তার মেয়ের নাকি ব্যাগ নিতে নিতে কেমন বাকা হয়ে হাঁটার অভ্যাস হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে কি অনেক কচিকাচা ছেলেমেয়েরা সামনের দিকে একটু ঝুঁকে পরেই রাস্তায় হাঁটে।
আমার ধারণা প্রতিদিন সকালে উঠে বই ভর্তি ব্যাগের দিকে তাকিয়ে অনেক ছাত্রছাত্রী নিতান্তই অনিচ্ছার সাথে ব্যাগটি কাধে তুলে নেয়। এবং দীর্ঘ সময় ইচ্ছা না থাকলেও সেটা কাধে ঝুঁিলয়ে হাটে। রাস্তায় বের হলেই এই চিত্র চোখে পরে। আমরা অভিভাবকরা সবসময়ই চাই আমাদের সন্তানরা আনন্দে থাক। এমনকি লেখাপড়ার কাজটিও তারা আনন্দের সাথে করুক। আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে ব্যাগ বহনের ওজনের একটা নিয়ম আগে থেকেই ছিল। আমাদের দেশেও মহামান্য হাইকোর্ট এ সংক্রান্ত রায় দিয়েছে। শিশুর ওজনের দশ শতাংশ ব্যাগ বহন করতে হবে। আমরা এই সিদ্ধান্তে আনন্দিত। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ব্যাগের বোঝা কমার সাথে সাথে বইয়ের চাপ থেকে তারা মুক্তি পাচ্ছে কি। কারণ ব্যাগটা তো বই খাতায় ভরে থাকে। তাই বইয়ের চাপ কমলে ব্যাগ এমনিতেই হালকা হবে। স¤প্রতি এসএসসি পরীক্ষায় চারটি বিষয় কামনোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কারণ আমরা চাই না বই ওদের কাছে বোঝা হোক। ব্যাগের ওজন দৃশ্যমান হলেও বইয়ের ওজন কিন্তু দৃশ্যমান নয়। এটা যাচাইগত প্রক্রিয়া। কারণ লক্ষ্যণীয় আমাদের সারাদেশে অলিতে গলিতে কিন্ডারগার্টেন গড়ে উঠেছে। এসব কিন্ডারগার্টেনগুলোতে বোর্ড নির্ধারিত বইয়ের পাশাপাশি আরও অতিরিক্ত বই পড়তে হচ্ছে। সরকারি স্কুল থেকে এখানে একটা পার্থক্য করে দিচ্ছে। অনেক অভিভাবকও মনে করছেন যে তার সন্তান বেশি পড়লেই বেশি শিখবে। কিন্তু এটা মনে করছে না বেশি পড়াতে গিয়ে পড়ার ইচ্ছাটাই চিরতরে নষ্ট করে দিচ্ছে তারা। এসব শিক্ষার্থীরা কিন্তু এমনিতেই বেশি বই ব্যাগে ভরছে।
এনসিটিবি আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করে থাকে। বছরের শুরুতেই ছাত্রছাত্রীরা নতুন বই হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরে। আমাদের দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সেইসব বই পাঠদান করে থাকে। কিন্তু দেশে অলিতে গলিতে হাজা হাজার কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। সেসব কিন্ডারগার্টেনে লাখ লাখ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। অবাক করার বিষয় হলো বছরের শুরুতে এসব কিন্ডারগার্টেনগুলো সরকারি বই গ্রহণ করলেও তারা সেসব বইয়ের থেকে বেশি আগ্রহী থাকে সহায়ক বই নিয়ে। দ্বিতীয়,তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণিতে সরকার প্রদত্ত বইয়ের সাথে সাথে আরও চার পাঁচটি বই পড়ানো হয়ে থাকে। সরকার প্রদত্ত নির্ধারিত বই যদি ব্যাগের ভেতর থাকে তাহলে ব্যাগ ওজনে ভারী হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এই বইয়ের পাশাপাশি তথা কথিত সহায়ক বই এবং আপাতদৃষ্টিতে মহামূল্যবান গাইড বইও থাকে! তারপর আবার টিফিন,গোটা কতক খাতা এসব মিলিয়ে বিশাল এক বোঝা কাঁধে নিয়ে প্রতিদিন বহু ছাত্রছাত্রী বিরস মুখে স্কুলে যায়।

লেখক- সাংবাদিক ও কলাম লেখক,পাবনা।

একই ধরনের আরও সংবাদ